বৃহস্পতিবার রাত ৯:০০, ৭ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ. ২২শে অক্টোবর, ২০২০ ইং
প্রতিবেদন
বিতর্কিত মুফতি ফয়জুল্লার বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেই বিক্ষোভের ভিডিও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনিয়ম-দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র ‘আঁরা টোকাই ন’, সী-বিচের দুই খেটে-খাওয়া শিশু সামাজিক আন্দোলন নিয়ে তারা রাজনীতি করছে: তথ্যমন্ত্রী নোয়াখালীতে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন: বিক্ষুব্ধ সারাদেশ শিমরাইলকান্দি খাদ্যগুদামের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ আবুল কাসেম ফজলুল হকের আটাশ দফা নিয়ে ভার্চুয়াল আলোচনা সরকারি রোষে ভারত ছাড়ল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জিয়াকে নিয়ে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে তারানা-সাজুর বিরুদ্ধে মামলা করোনাক্রান্তের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মৃত্যু শিমরাইলকান্দি রাস্তার সংস্কার দাবিতে মানববন্ধন: মেয়রের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ কাজীপাড়া মৌলভীহাটি মসজিদের পুকুর এখন কচুক্ষেত

জয়পুরহাট আদিবাসী‌দের সামাজিক-ধর্মীয় ক্ষেত্রে সংগীতের প্রভাব (পর্ব-১)

৮৯ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এ প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর এ দেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই বৈচিত্র্যময় এদেশের জাতীয় সত্তা। এদেশের বৃহৎ বাঙালি জাতিসত্তার সংগে জড়িত অনেকগুলো ছোট জাতিসত্তা। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যেমন জড়িয়ে আছে গুহাবাসী ও অরণ্যচারী আদিম মানুষের ইতিহাস, তেমনই বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐহিহ্যের সাথে অবিচ্ছিন্ন ভাবে জড়িয়ে আছে জয়পুরহাট জেলার তথা এতদঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস।

মূলত ১৮৮৪ সালে কলকাতা থেকে জলপাইগুড়ী পর্যন্ত ২৯৬ মাইল রেললাইন বসানোর কাজ করা হয়। সেই সময় বর্তমানের তিলকপুর, আক্কেলপুর, জামালগঞ্জ, জয়পুরহাট রেল স্টেশন স্থাপন করা হয় । এসব স্থান দিয়ে রেললাইন বসানোর কাজ করার জন্য ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে দরিদ্র পীড়িত বেশ কিছু সংখ্যক আদিবাসি এই অঞ্চলে আসে জীবিকার তাগিদে। তারা বিশেষ করে পঁচবিবির মহীপুর, উঁচাই-পাথরঘাটা অঞ্চল এবং জয়পুরহাটের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্থান করে নেয়। বর্তমানে জেলার পাঁচবিবি, জয়পুরহাটের বিভিন্ন গ্রাম সংখ্যাধিক্যসহ আক্কেলপুর, কালাই, ক্ষেতলাল উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কম-বেশী আদিবাসি সম্প্রদায়ের লোক বাস করে।

বর্তমানে জয়পুরহাট জেলায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার উরাওঁ, মুন্ডা, মালো, মাহাতো, সাঁওতাল, সিং, মাহলী প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের ধারায় বসবাস করে আসছে। এদের জীবনধারা বৈচিত্র্যময় এবং সামাজিক উৎসবাদি বেশ উপভোগ্য। সম্প্রদায়গুলো ভাষাগত দিক দিয়ে পৃথক হলেও সামাজিক অনুষ্ঠানাদি প্রায় একই ধরনের।

আদিবাসীরা স্বভাবতই প্রকৃতির পূজারী। প্রকৃতির সঙ্গেই এদের জীবনধারা বহুদিন ধরে চলে আসছে। প্রতিটি সম্প্রদায় নিজ নিজ সামাজিক প্রথা অনুযায়ী বিবাহ, অন্নপ্রাশন, সামাজিক উৎসবাদি, নৃত্য-গীত ও বাদ্য যন্ত্রের মাধ্যমে অনাবিল আনন্দে শিশু, নারী-পুরুষ সবাই উপভোগ করে।

সাঁওতালী ও কুডুক ভাষার তুলনায় সাদৃভাষা সহজ হওয়ায় এবং বাংলা ও হিন্দির সংগে মিল থাকায় অধিকাংশ আদিবাসী সম্প্রদায় সাদৃভাষাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আবার প্রতিটা সম্প্রদায়ের মধ্যে সাদৃভাষা ব্যবহারের বিশেষত্ব আছে। নিচে বাংলা ভাষায় প্রচলিত একটি বাক্যের সাথে অন্যান্য ভাষার একটি তুলনা উপস্থাপন করা হলো।

বাংলা: তোমার বাড়ি কোথায় ?

সাদৃভাষা: তর ঘর কাঁহা ?

সাঁওতালি: আমা উড়াও কারে ?

উড়াওঁ: নিংহাই এ্যারমা একশান ?

আবার উড়াওদের ভাষার একটি মজার বিষয় উল্লেখযোগ্য । আর তা হলো; কেউ একটি কথা পুরুষকে না মহিলাকে বলছে তা তাদের ভাষা থেকেই বোঝা যায় । যেমন- বাংলা ভাষায় কেউ যদি একজনকে বলে, তুমি কোথায় যাচ্ছ? এক্ষেত্রে যদি শ্রোতা এই দৃশ্যপট থেকে আড়ালে থাকে, তাহলে তা থেকে বোঝা কঠিন যে কথাটি পুরুষকে না মহিলাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে । অর্থাৎ উদাহরণ স্বরূপ, প্রশ্নকর্তা যদি বারান্দায় থেকে বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া কোন ব্যক্তিকে এই প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করে, আর তৃতীয় কোন ব্যক্তি ঘরের ভেতরে থাকে, তবে তার পক্ষে বোঝা অসম্ভব হবে যে কথাটি পুরুষ না মহিলাকে করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে উড়াওঁদের ভাষায় তা সহজেই বোঝা সম্ভব।

যেমনঃ নিন এ্যাকশান কা দাই? বলতে একজন পুরুষকে বলা হচ্ছে যে, তুমি কোথায় যাচ্ছ ? আবার যদি বলা হয় ; নিন এ্যাকশন কা দী ? তবে এই প্রশ্নটি একটি মহিলাকে করা হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে ।

মুন্ডা বা পাহান সম্প্রদায়: মুন্ডারা নামের শেষে পাহান লিখে থাকে। এটা তাদের বংশ পরিচয়। তবে তারা আসলে সনাতন বা হিন্দুধর্মে বিশ্বাস করে। যতদূর জানা যায় যে, ভারতের রাচী এলাকায় বীরেন মুন্ডা নামে একজন রাজা ছিলেন। পাল বংশের রাজারা বীরেন মুন্ডার রাজ্য আক্রমণ এবং বীরেনমুন্ডাকে পরাজিত করে। বীরেন মুন্ডা পালিয়ে গভীর বনে অবস্থান করেন। তাঁরই বংশধর মুন্ডা বা পাহান নামে পরিচিত। এঁরা বনে বাস করতেন বলে অনেকে ‘বুনা’ নামেও অভিহিত করে থাকেন। বনে জঙ্গলে থাকার কারণে তাঁরা ফল-মূল, পশু-পাখির গোশত খেতেন এবং গাছের পাতা ও মহুয়া ফলের রস (নেশা জাতীয়) পান করতেন। পরে বন-জঙ্গল কেটে জমি তৈরি এবং চাষাবাদ শুরু করেন। এ সম্প্রদায়ের লোকেরা শিক্ষার আলো পায়নি। তবে বর্তমানে কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। মুন্ডারা খুবই পরিশ্রমী। নারী ও পুরুষ সবাই মিলে ঘর সংসারের কাজ করে।

ধর্মীয় অনুষ্ঠান: পাহানরা সনাতন বা হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। তবুও তাঁদের নিজস্ব কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান রয়েছে। এসবের একটি করম বা কারম পূজা। মনসাদেবীর পূজাও তাঁরা আনন্দ ও উৎসবের সাথে করে থাকেন। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের চাঁন্দের শুক্ল পক্ষের একাদশী তিথিতে করম পূজার নির্দিষ্ট দিন তারিখ। এ তিথির এক সপ্তাহ পূর্ব থেকে পূজার উপকরণাদি সংগ্রহের প্রস্তুতি চলে। গ্রামের কুমারী মেয়েরা ও যুবক ছেলেরা পূজার দিন উপবাস থাকে। পূজারী পঞ্চশস্য সংগ্রহ করে (যেমন গম, যব, সরিষা, কলাই ও তিল)। এছাড়া তিনজন কুমারী মেয়ে বাছাই করে তাদেরকে তিনটি বাঁশ বা বেঁতের ডালা দেয়া হয়। ওই ডালা গুলোতে মাটি/বালি দিয়ে তাতে সংগ্রহ করা শস্যাদি রেখে নিজ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সেগুলোর যত্ন নেয়। সেই সাথে পুরোহিত নির্দেশ দেয় যে, যারা সৎ কাজে যুক্ত থাকবে, কুচিন্তা করবে না, মিথ্যা কথা বলবে না, সদাচারি ও সদালাপি হবে তাদের ডালার চারাগুলো সতেজ থাকবে। আর এর ব্যতিক্রম হলে তার ডালার চারাগুলো নিস্তেজ হয়ে যাবে। পূজার দিনে সূর্য অস্ত যাবার মুহূর্তে নারী, পুরুষ দলবদ্ধভাবে নৃত্য-গীত সহযোগে বন থেকে করম গাছের তিনটি ডাল আনে। তারপর তিনটি ডাল বিশেষ নিয়মে একটি গর্তে পুঁতে রেখে পূজা অর্চনা করা হয়। তিনটি চারার ডালাসহ উপবাসি ছেলে, মেয়েরা বৃত্তাকারে বসে। পূজারী কেচ্ছা-কাহিনী শোনায়। ছেলে- মেয়েরা পুষ্পাদি নিবেদন করে এবং করম গাছের ডালটি সবাই ধরে। পুরোহিত বলে- করম ডাল ধরে তোমরা কী পেলে? তখন সকলেই বলে- কদুর (মোটাতাজা, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী) মতো ছেলে পেলাম। পরে, কীভাবে ধনজন পাওয়া যাবে তার ওপরে উপদেশ দেয়া হয়। আরো উপদেশ দেয়া হয় যে, ধারমার মতো ধর্ম অর্থাৎ করম পূজা করলে সংসারে উন্নতি হবে। আর করম পূজা না করলে কারমার মতো গরীব হয়ে পরবে। এরপর তারা সারারাত ধরে নাচ-গান করে। তাড়ি, হাড়ি, মদ এ অনুষ্ঠানের প্রধান উপকরণ হলেও আধুনিক কালে মাদক জাতীয় জিনিসের ব্যবহার অনেক কমে এসেছে। এ পূজা উপলক্ষে বাড়ি বাড়ি চালের আটা দিয়ে মিষ্টান্ন তৈরী করা হয়। তিনটি কাঁঠাল পাতায় তৈরী করা মিষ্টান্ন রেখে তা আদি পুরুষকে নিবেদন না করা পর্যন্ত একজন শিশুও তা মুখে দেয় না। মূলত: করম ডাল বস্তুগত হলেও একে আদি পুরুষ বা ব্রহ্ম্রাকেই বোঝানো হয়, যার মূল মন্ত্র আধ্যাত্মিক চেতনায় উজ্জীবিত।

করম পূজার প্রথম গান হলো-

( ১ )

আখেড়া বন্দনা করি

স্বরস্বতী মায়ে ।

তবে রে বন্দনা ব্রজনারী

মদমে ঝুমার লাগার ভারী ।

উড়ে গেলা পংখী রাজ

পড়ে রহীন বাসারে ।

কোন বনে নাহিয়ার গায়ারে চারাওয়ায়

ভেজলী তরে লয়ে গায়া যে বিরনায়

বাঘা যে ধাম সায়

ভেচলী তরে লয়ে ।

 ( ২ )

পখরি খড়িলেন রাজা বানশির

সাজানী…

চারো কোনা কদমের গাছ

এ বল সাজানী

চারো কোনা কদমের গাছ ।।

চারো কোনা কদমের গাছ

এ মন সাজানী

ডহরি ফেকালাঞ কাছনার

এ বল সাজানী

পোঁহলা ফুটালাঞ লালে নীলে ।।

পোঁহলা ফুটালাঞ লালে নীল

এ বল সাজানী —–

রাজা লেঞ ঢুকালাঞ মান্দির ।।

পখরি খড়িলেন রাজা বানশির

সাজানী —–

চারো কোনা কদমের গাছ

এ বল সাজানী

চারো কোনা কদমের গাছ ।।

( ৩ )

রমে চললাই মইনো নমরী মইয়া গোরি গে

দেওয়ারা আনাল বাইদেরী

মইয়া গোরি গে

দেওয়ারা আনালাঞ বাইদেরী ।।

দেওয়ারা আনালাঞ বাই — দেরী

মাইয়া গোরি গে

দুয়ারি বৈশালাঞ মন মারি

মাইয়া গোরি গে

দুয়ারি বৈশালাঞ মন মারি ।।

দুয়ারি বৈশালাঞ মন মারি

মাইয়া গোরি গে

কিনি দেঁলাই কুটুমেত শাড়ি

মাইয়া গোরি গে

কিনি দেঁলাই কুটমেত শাড়ি ।।

রশে চল্ লাই মইনো নমরী

মাইয়া গোরি গে

দেওয়ারা আঁনালাঞ বাইদেরি

মইয়া গোরি গে

দেওয়ারা আঁনালাঞ বাইদেরি ।।

সহরাই পূজাঃ যেহেতু পাহানরা সনাতন ধর্মালম্বী, তাই তারা কালিপূজা করে থাকে। এই কালী পূজাই সোহরাই পূজা নামে পরিচিত। পুজার অংশ হিসেবে সোহরাই পূজায় লাল, কালো কিংবা সাদা মোরগ উৎসর্গ করা হয়। লাল মোরগ ব্রহ্ম্রা বা স্রষ্টার সূচক, কালো মোরগ বিষ্ণু বা স্থিতির সূচক এবং সাদা মোরগ শিব বা প্রলয় সূচক ।

(সহরাইয়ের গান)

আরে খঁজা খঁজাতে আলি

পুছা পুছাতে আলি

ফালনা ( নির্দিষ্ট মানুষের নাম ) বাবুগের ঘারা কেতেই দূরা রে

এ হাইরে দেইয়া

ফালনা বাবুগের ঘারা কেতেই দূরা রে ।।

কেতেই হামি নাচবেই রে

কেতেই হামি ঢেগবেই

ফালনা গের ঘারা কেতেই দূরা রে

হাইরে দেইয়া

ফালনা গের ঘারা কেতেই দূরা রে ।।

কেতেই হামি নাচবেই রে

কেতেই হামি ঢেগবেই

আঙ্গনাহে ধুরা উড়ি গেলই রে

হাইরে দেইয়া

আঙ্গনাহে ধুরা উড়ি গেলই রে

ফালনা গের ঘারা কেতেই দূরা রে ।।

গোয়াল পূজাঃ কালী পূজার পরের দিন গোয়াল পূজা হয়ে থাকে। পূজার আগের দিন গোয়াল ঘরসহ বাড়ি ঘর পরিষ্কার করা হয়। উঠান, বারান্দায় আলপনা আঁকা হয়। গরুর অত্যন্ত যত্ন নেয়া হয়। মাসকলাইয়ের সহযোগে তৈরী খিঁচুরি রান্না করে গরুকে খাওয়ানো হয়। গরুর মাথায় তেল, সিঁদুর দেয়া হয় এবং ভক্তি সহকারে প্রণাম করা হয় ।

(গোয়াল পূজার গান)

আনাদিনা রে গোরুয়া– য়া —-

মারহলিও পিটহলিও

আজতো করবোও দুলারোরে

এ হাই রে দেইয়া

আজো তো কারবোও দুলারোরে ।।

আনাদিনা রে বারতা

মারহলিও পিটহলিও

আজতো করবোও দুলারোরে

এ হাই রে দেইয়া

আজো তো কারবোও দুলারো রে ।।

মাইয়া গুয়া রহলাঞ লটাপানি দেওয়া হালাঞ

বাহিন তো গেলাঞ শ্বশুর বাড়ি রে

আনা দিনা রে গোরুয়া –য়া —

মারহলিও পিটহলিও

আজো তো করবোত দুলারোরে ।।

বিবাহঃ পাহানরা খুব আনন্দের সাথে বিয়ের অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। একই গোত্রের মধ্যে তাঁদের বিয়ে হয় না। এর কারণ, মানব গোষ্ঠির সভ্যতার উন্মেষকালে তাদের মধ্যে যাঁরা জ্ঞানি ছিলেন তারা ভেবেছিলেন একই বংশের মধ্যে বিয়ে হলে সন্তান বিকলাঙ্গ হয়ে থাকে। এই বিষয়টি থেকে এড়িয়ে থাকার জন্য ওই সময়ে বিদ্যমান গোষ্ঠিগুলোকে কয়েকটি গোত্রে বিভক্ত করা হয়। আর তাই তারা একই গোত্রের মধ্যে কখনোই বিয়ে দেয় না। তাদের বিশ্বাসটি আজ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেও স্বীকৃতি পেয়েছে। যাই হোক এদের বিয়ের সময় প্রথমে ছেলে পক্ষের লোক মেয়ের বাড়িতে যাবে এবং মেয়ে, মেয়ের ঘর-বাড়ি ইত্যাদি দেখবে তারপর মেয়ের অভিভাবক ছেলের যাবতীয় খোঁজ খবর নিবেন ও বিয়ের প্রস্তাব দিবেন। ছেলে ও মেয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হলে ছেলে পক্ষের কম পক্ষে পাঁচজন আত্নীয় বা প্রতিবেশী সহ মেয়ের বাড়িতে যাবেন এবং নিরীক্ষণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। পাহানদের বিয়ে দুই প্রকারের- (এক) চৌড় এবং (দুই) বেনকেরী। বর পক্ষ মেয়ের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান করলে তাকে চৌড় বলে এবং মেয়েকে বরের বাড়িতে নিয়ে এসে অনুষ্ঠান করলে তাকে বেনকেরী বলে। বিয়েতে বাজনা, গান, গীত এর আয়োজন থাকে। কয়েকটি বিয়ের গীত নিচে উল্লেখ করা হলো-

পাহানদের বিয়ের গীত ( ১ )

মাড়ুয়া ছাড়ু বাবা

মাড়ুয়া ছাড়ু বাÑবা, ওরে বা-বা

হায়রে ,

মাড়ুয়া ছাড়ু বা -বা, ওরে বা-বা ।।

চাইরো কোনা রেশম ঝবরোলই ভারি

চাইরো কোনা রেশম ঝবরোলই ভারি ।।

(অর্থ: বিয়ের মঞ্চটার ওপরে ছামিয়ানা দিয়ে ছেয়ে দাও । বাবা , বিয়ের মঞ্চটার ওপরে ছামিয়ানা দিয়ে ছেয়ে দাও। চার কোনে রেশমের মতো ঝালরগুলো ভারি সুন্দর লাগছে। বাবা, বিয়ের মঞ্চটার ওপরে ছামিয়ানা দিয়ে ছেয়ে দাও।)

পাহানদের বিয়ের গীত ( ২ )

ছোটে মোটে পখেরী নাইওন বকলি ঘেরী বৈশাই

নাইওন বকলি ঘেরী বৈশাই ।।

বেটিকা লোভে নাইওন বকলি বাঁহি ধরাই

নাইওন বকলি বাঁহি ধরাই

ছোটে মোটে পখেরী নাইওন বকলি ঘেরী বৈশাই ।

পাহানদের বিয়ের গীত ( ৩ )

মাই তোরা পোষলাই রে খুদি চুনি দিয়ে পোষলাই

মাই তোরা পোষলাই রে খুদি চুনি দিয়ে পোষলাই ।।

বাপ তোরা রাখলাই বত্রিশ বান্ধনকা ভিতরে

মাও তোরা রাখলাই বত্রিশ বান্ধনকা ভিতরে

মাই তোরা পোষলাই রে খুদি চুনি দিয়ে পোষলাই ।।

ভাই তোরা এতোঁই বুদ্ধিমান , এতোই শুদ্ধিমান

বহিনকে কোন কুলনে ডুবাইলান

ভাই তোরা এতোঁই বুদ্ধিমান , এতোই শুদ্ধিমান

বহিনকে কোন কুলনে ডুবাইলান ।।

পাহানদের বিয়ের গীত ( ৪ )

হেঁঠে তো পাঁচ ভাইয়া

উপরে তো পরমেশ্বর রে

উপরে পরমেশ্বর ।।

ওরে হায়রে ভালে ভাই পরমেশ্বর কালে কালে

ভালে ভাই পরমেশ্বর যুগে যুগ জুমালই

হেঁঠে তো পাঁচ ভাইয়া

উপরে তো পরমেশ্বর রে

উপরে পরমেশ্বর ।।

পাহানদের বিয়ের গীত ( ৫ )

হারিয়ারা ধানা আইও

চোঁ চোঁ যে লুজ পাড়ায়।

(অর্থ : ধান পেকে হরিদ্রা বরণ ধারণ করলে চোঁ চোঁ অর্থাৎ বাবুই পাখি সেখানে তথন ভীড় করে)

যে কারে ঘারে আইও

বাড় আলা বেটিরে

সে কারা ঘারে আইও মানোয়া যে লুজ পাড়ায়।

(অর্থ : যার ঘরে বড় মেয়ে আছে, তার ঘরে বা বাড়িতে মানুষ এসে ভীড় করে)

(চলবে)

(লেখক: শফিউল বারী রাসেল, গীতিকার, সাংবাদিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক)

Some text

ক্যাটাগরি: নাগরিক সাংবাদিকতা, মতামত, সমকালীন ভাবনা

  • 45
    Shares

Leave a Reply

কুপ্রথার বেড়াজালে বিয়ে [১]