ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত : ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট ও বার্মা প্লেট। এই প্লেটগুলোর সংঘর্ষে দেশের ভেতরে একাধিক ফল্ট জোন তৈরি হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : ডাউকি ফল্ট(মেঘালয়-আসাম), যমুনা ফল্ট, বগুড়া ফল্ট, মধুপুর ফল্ট, হালুয়াঘাট ফল্ট ও সিলেট-চট্টগ্রাম-বার্মা ফল্ট। গবেষকরা ধারণা করছেন এর বাইরেও দেশে আরও অনাবিস্কৃত ফল্ট জোন রয়েছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট-চট্টগ্রাম সাবডাকশন জোন। সাবডাকশন জোন হলো এমন একটি অঞ্চল যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেট একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় এবং একটি প্লেট অন্য প্লেটের নীচে ঢুকে যায়। এই প্রক্রিয়ায় ঘন টেকটোনিক প্লেটটি কম ঘন প্লেটের নীচে চলে যায় এবং ম্যান্টলে ফিরে যায়। সহজ ভাষায়, সাধারণত ভারী শিলাখন্ডটি হালকা শিলাখন্ডের নীচে প্রবেশ করে ও যে সীমানা বরাবর প্রবেশ করে তাকে সাবডাকশন জোন বলে। যেমন-প্রশান্ত মহাসাগরীয় শিলাখন্ড আমেরিকান বিশালার শিলাখন্ডের নীচে প্রবেশ করেছে।
২০১৬ সালে প্রকাশিত কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় একটি গোপন ফল্ট রয়েছে, যা বাংলাদেশে ৯ মাত্রার মতো ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রতিবেদনে গোপন এ ফল্টকে ‘মেগাথার্স্ট ফল্ট’ নামে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পললের নিচে এটি অবস্থিত। দুই প্লেটের সাবডাকশন জোন বা দুই প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই মেগাথার্স্ট। মেগাথার্স্ট হলো পৃথিবীর বড় প্লেটগুলো একে অপরের নিচে চাপ দেওয়ার কারণে তৈরি হওয়া বড় ভূমিকম্প–সৃষ্ট ফল্ট বা চ্যুতি।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেকডকৃর্ত মেগাথার্স্ট ভূমিকম্প ছিল ১৯৬০ সালের গ্রেট চিলিয়ান ভূমিকম্প, যার মাত্রা ছিল ৯.৫। এই ভূমিকম্পের ফলে স্থানীয় সুনামি সুষ্টি হয় যা চিলির উপকূলে মারাত্মকভাবে আঘাত হানে, যার ঢেউ ৮২ ফুট পর্যন্ত উঁচু ছিল। এই ভূমিকম্প ও সুনামিতে প্রায় ৬ হাজার লোক নিহত হয়েছিল। ২০১১ সালের জাপানে এধরনের আরও একটি মেগাথার্স্ট ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল, যার মাত্রা ছিল ৯.১। এই ভূমিকমম্পের ফলে সৃষ্ট সুনামিতে জাপানের উত্তর–পূর্ব উপকূলে বড় ধরনের আঘাত হানে, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায় এবং ফুকুশিমা পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি চুল্লি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই দুর্যোগে কমপক্ষে ২০ হাজার লোক মারা যায়।
বিশিষ্ট ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আক্তারের মতে, বাংলাদেশে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত দুই প্লেটের সংযোগস্থল। এ অঞ্চলে গত ৭০০ থেকে ৮০০ বছরের মধ্যে জমে থাকা শক্তিটা বের হয়নি। এ কারণে অঞ্চলটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি আরো বলেন, মেঘালয়-আসাম-সিলেট এবং সিলেট-টেকনাফ-আরাকান এলাকা নিয়ে গঠিত ‘সাবডাকশন জোন’ এলাকায় ইন্ডিয়ান প্লেট বার্মা প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রায় ৮.২-৯.০ ম্যাগনিচ্যুড শক্তি জমা হয়ে আছে। এই জোনে প্লেট দুটো লক হয়ে আছে যা যে কোন সময় স্লিপ করে খুলে যাবে, এটাই হলো সবচাইতে ভয়ের কারণ।
এই সাবডাকশন জোনে অথার্ৎ মেঘালয়-আসাম-সিলেট অঞ্চলে এবং চট্টগ্রাম-টেকনাফ-আরাকান অঞ্চলে দুটি ভয়াবহ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল। এতে জানমালের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। প্রথমটি হয়েছিল ১৭৬২ সালে, যা ‘আরকান ভূমিকম্প’ নামে পরিচিত। এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল বর্তমান বার্মার আরাকান অঞ্চলে, যার মাত্রা ছিল প্রায় ৮.৫ থেকে ৮.৮। এই ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন হয়েছিল। আজকের নয়নাভিরাম ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপ’ এই ভূমিকম্পের কারণে রাতারাতি জেগে প্রায় ১০ ফুট উপরে উঠে এসেছিল! এছাড়াও টেকনাফের একটি বিশাল উপকূলীয় অংশ, যা পূর্বে সমুদ্রের নিচে ডুবোচর হিসেবে পরিচিত ছিল, তা সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে স্থায়ী ভূখন্ড হিসেবে জেগে ওঠে!
দ্বিতীয় বিধ্বংস ভূমিকম্পটি হয়েছিল ১৮৯৭ সালে, যা ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েন’ নামে পরিচিত। এর কেন্দ্রস্থল ছিল ঢাকা থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে।এই ভূমিকম্পের ফলে চেরাপুঞ্জি পাহাড়, মেঘালয়ের শিলং ও সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮.১ থেকে ৮.৭।
বস্তুত, ভূমিকম্পের রিটার্ন পিরিয়ড ধরা হয় ১৫০-২৫০ বছর। সেই হিসেবে ২৬৩ বছর আগে ১৭৬২ সালে চট্টগ্রাম-টেকনাফ-আরাকান অঞ্চলে ৮.৫ মাত্রার যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল, সাইকেল হিসেবে সেটি এখনো ফিরে আসেনি। এরপর ১২৮ বছর আগে ১৮৯৭ সালে মেঘালয়-আসাম-সিলেট অঞ্চলে ৮.১ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয়েছিল, সেটা হয়তো আরও ২০-৫০ বছর পর হতে পারে। এরকম ১৫০-২৫০ বছরের যে সাইকেল আছে, সেটি কখন হবে কেউ জানে না। আসলে ভূমিকম্পের পূর্বানুমান সম্ভব না। তবে ক্রামাগত ছোট ছোট ভূকম্পন বড় বিপদের পূর্বাভাস। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে দেশে ছোট ছোট ভূকস্পন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা এই প্রসঙ্গে বলছেন, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, প্লেটগুলোর ‘লকড জোন’ ভাঙ্গতে শুরু করেছে। সুতরাং শত শত বছর ধরে জমা শক্তি বেরিয়ে আসার মময় খুব কাছেই। অতএব, এই প্রকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সবাইকে আগাম প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
