বাংলাদেশে রিখটার স্কেলে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে সিলেট-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঢাকা ও ময়মনসিংহ শহরের পরিণতি হতে পারে ভয়ংকর। এসব এলাকা ভূমিকস্পপ্রবণ ও ঘনবসতিপূর্ণ। যদি এমন পরিস্থিতি কখনো হয়, তাহলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো–অপরিকল্পিত এসব মহানগরে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটলে, সে সময় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা কি এ সংস্থার আছে? সংস্থাটির জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং লজিস্টিক সাপোর্টের সক্ষমতা আসলে কতটুকু?
বাস্তবে প্রস্তুতিতে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনো অপ্রতুল। এছাড়াও রয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দলের সল্পতা, আমলাতান্ত্রিক, কাঠামোগত ও অবকাঠামোগত জটিলতা।
চলিত ২০২৫ সালের নভেম্বরের ২১ ও ২২ তারিখে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় চারবার মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। রিখটার স্কেলে প্রথমটির মাত্রা ছিল ৫.৫ এবং দ্বিতীয়টির মাত্রা ছিল ৪.৩। কম্পন দুটির স্থায়ীত্ব ছিল কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু আতঙ্ক ছিল বেশি। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক এই ভূকম্পন দুটি দেখিয়ে দিয়েছে আমরা কতটা ভঙ্গুর। ভূমিকম্প–সহনশীল নয় এমন ভবন, নজরদারিহীন নিমার্ণ, সংকীর্ণ সিঁড়ি, জটলা গলি, দুর্বল অবকাঠামো–সব মিলিয়ে লাখো মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হলে। গবেষকদের মতে, সিলেট-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঢা কা ও ময়মরসিংহ অঞ্চলে রয়েছে পর্যটনকেন্দ্র, শহর, বাজার, বহুতল ভবন। এছাড়াও এসব এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ার কারণে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও অনেক বেশি। তাই এসব শহর ও এর আশপাশ এলাকায় বড় ভূমিকম্প হলে হাইতির ২০১০ সালের বিপর্যয়ের চেয়েও বড় ধরণের মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটতে পারে আমাদের দেশে।
সরকার, গবেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বারবার সর্তকবার্তা থাকা সত্ত্বেও রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম এখনো একটি অপরিকল্পিত নগরীর প্রতিচ্ছবি। গবেষকদের মতে, সিলেট-চট্টগ্রাম- কক্সবাজার-ঢাকা ও ময়মনসিংহের প্রায় ৭০ শতাংশ ভবনই বিল্ডিং কোড না মেনে নিমার্ণ করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা(সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপ অনুযায়ী সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার প্রায় ৭২ হাজার ভবন ঙেগে পড়বে এবং এক লাখ ৩৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, পাশাপাশি লাখো মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে। এগুলো অবশ্যই সম্ভাব্য চিত্র, কিন্তু ঝুঁকির গভীরতা বুঝতে তা যথেষ্ট।
এই সংখ্যাগুলো ভয়াবহ। কিন্তু এসব আমাদের প্রিয় শহরগুলোর প্রতিদিনকার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। কে কোথায় কিভাবে বিল্ডিং বানাচ্ছে, কোন ডিজাইনে তৈরি হচ্ছে, ফাউন্ডেশন কতটা শক্ত–এসব উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই নেই। ‘কোথাও নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই’–এই পরিচিত বাস্তবতাই সিলেট-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঢা কা-ময়মনসিংহ ও এর আশাপাশ এলাকার ভূকম্পন ঝুঁকিকে আরো বিপজ্জনক করে তুলছে।
অপ্রিয় হলেও সত্যিই যে, অপরিকল্পিত পুরান ঢাকা, মিরপুর কিংবা চট্টগ্রামের অনেক এলাকার রাস্তা এতটাই সরু যে, ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়লে সেই রাস্তাগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়াও চট্টগ্রাম ও ঢাকার ফ্লাইওভারগুলো ধসে পড়লে প্রধান সড়কগুলোও অচল হয়ে পরবে, রাস্তায় রাস্তায় যানজট তৈরি হবে, উদ্ধার তৎপরতা বাধাগ্রস্ত হবে, আর মানুষ আটকে পড়বে অসংখ্য ভগ্নস্তুূপে। জাপান, তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান বা চিলির মতো দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেখানে রাষ্ট্র দুর্যোগকে একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখে ; কিন্তু আমাদের দেশে বিষয়টিকে এখনো তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।
বিশেজ্ঞদের ভাষায়, যেসব এলাকায় ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি বেশি, সেসব এলাকায় সতকর্তা ও পূর্বপ্রস্তুতি থাকা বাধ্যতামূলক। আমাদের প্রিয় শহর সিলেট-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঢাকামহ দেশের বেশির ভাগ শহরই অধিক ঘনবসতিপূর্ণ। আমাদের দেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১১১৬ থেকে ১২৬৫ জনের মতো মানুষ বসবাস করছেন। সেই দৃষ্টিকোন থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনগণকে বধ্যতামূলকভাবে ভূমিকস্প ঝুঁকি মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি রাখা জরুরি। কিন্তু হতবাক হওয়ার বিষয়, ভূমিকম্পের ঝুঁকি সম্পর্কে আমাদের কিছুটা ধারণা থাকলেও প্রস্তুতির দিক থেকে এখনো যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে! এখন প্রসঙ্গক্রমে প্রশ্ন আসে–বড় ধরনের ভূকম্পন মোকাবেলায় আমাদের দেশ কি আদৌ প্রস্তুত?
অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ গুলোতে ভূমিকম্প-সম্পর্কিত ঝুঁকি মোকাবিলায় মহড়া খুবই অপ্রতুল। প্রতিটি কর্মস্থলেও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অনুশীলন নেই বললেই চলে। পরিবারে শিশু বা অন্য সদস্যদের ভূমিকম্পের সময় কি ভূমিকা পালন করতে হবে, তা শেখানোর সংস্কৃতিও নেই। আমাদের মধ্যে ভয় আছে, কিন্তু প্রস্তুতি নেই। ফলে সামান্য দোলনেও মানুষ অফিস থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসে, কেউ সিঁড়ি না দেখে লাফিয়ে নামতে গিয়ে আহত হয়, কেউ ঘুম থেকে উঠে আতঙ্কে অস্থির হয়ে পড়ে। এগুলো কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং সার্বিক সামাজিক আচরণ।
ভূমিকম্পের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, ভয়ের খবর শেয়ার করা–এসব আতঙ্ক বাড়ায়, প্রস্তুতি নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই সংকট আরো জটিল হয়ে উঠেছে, যার প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের সময়েও। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমে বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রচার বাড়লেও তা এখনো যথেষ্ট নয়।
বিশেজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৩৪৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে জিডিপির ৭৭ শতাংশের সমতুল্য খরচ ভবন প্রতিস্থাপনে লাগতে পারে, যা অবকাঠামো, যোগযোগ ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। এর পরিণতি হতে পারে ভয়ংকর।
বস্তুত, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, কারণ এটি পৃথিবীর অভ্যন্তরীন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফলে তৈরি হয়; এখানে মানুষের কোনো হাত নেই। তবে ভূমিকম্প-প্রতিরোধী ভবন তৈরি এবং সঠিক প্রস্তুতি ও সর্তকতা অবলম্বনের মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি ও প্রভাব উল্লেখযোগ্য কমানো সম্ভব। এই জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
যেমন : প্রথমেই প্রয়োজন, বিল্ডিং কোড মেনে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাগুলো ভূমিকম্প-প্রতিরোধী কাঠামো দিয়ে তৈরি করা, যা ভূমিকম্পের ধাক্কা সহ্য করতে পারে। এছাড়াও জনগণের জানমাল রক্ষার স্বার্থেই সিটি করপোরেশ, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের ভূমিকম্প প্রস্তুতি শেখানো বাধ্যতামূলক করা উচিত। স্কুল, কলেজ, অফিস, বাজার–সব জায়গায় বছরে অন্তত দু’বার ভূমিকম্প-সম্পর্কিত মহড়া হওয়া উচিত। তৃতীয়ত, রেডিও-টেলিভিশ-সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া সংবাদ প্রচার বন্ধ করে তথ্যভিত্তিক সংবাদ ও আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব আলোচনা ও সংবাদের মাধ্যমে জনগণের মন থেকে ভূকম্পন-সংক্রান্ত ভয়-আতঙ্ক দূর করতে হবে। চতুর্থত, ভূমিকম্প পরর্বতী উদ্ধার কার্যের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি দিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দলকেও উন্নত প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। পঞ্চমত, ভূতত্ব জরিপ অধিদপ্তর, আবহাওয়া অধিদপ্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক গবেষণগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত ভূকম্পন মানচিত্র এবং ডেটা বিশ্লেষণ সুবিধা দিতে হবে। পাশাপাশি ভারত-মিয়ানমারের সঙ্গে সার্বক্ষনিক তথ্যবিনিময়ের সুন্দর ব্যবস্থা করতে হবে। এতে ভূমিকম্প পূর্বাভাস ও ঝুঁকি-বিশ্লেষণে অনেক সুবিধা হবে। ষষ্ঠত, কম্পনের সময় আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, যেমন- টেবিলের নিচে বা ভেতরের দেয়ালের কোণে, খোলা জায়গায় এবং পরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে সর্তক থাকা ও জরুরি সেবার জন্য প্রস্তুত থাকা।
এসব প্রস্তুতি, পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাকে নিম্নপর্যায়ে রাখা সম্ভব। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে প্রকৃতির কাঁপানো থামানো যায় না, কিন্তু ক্ষতির মাত্রা কমানো সম্পূর্ণ আমাদের হাতে।
বস্তুত, ভূমিকম্পের মতো বিশাল প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু রাষ্ট্রের ভূমিকা নয়, একটি সার্বিক ও সমন্বিত পদ্ধতি অপরিহার্য। শুধু রাষ্ট্রকে দোষরোপ না করে আমাদের প্রতিটি নাগরিককেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। (সমাপ্ত)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
