আমার সাংবাদিকতার সময় ৩০ বছর চলছে। এ অল্প সময়ে দেশের বহু বিপর্যয়, রাজনৈতিক ঘাতপ্রতিঘাত দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সৌভাগ্য হয়েছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর দেশে ফিরছেন। তিনি দেশের বড় দলের নেতা। তাই তাকে নিয়ে নিউজ মিডিয়ায় খবরাখবর হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে তার দেশে ফেরা নিয়ে অতি মাতামাতি, চাটুকারী, তোষামোদী ও তেলমর্দনের আতিশ্য দেখে সাংবাদিকতার এথিক্স নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে।
সাংবাদিকতার এথিক্স (নীতিশাস্ত্র) হলো এমন কিছু নৈতিক নীতিমালা যা সাংবাদিকদের সত্যনিষ্ঠা, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা, পক্ষপাতহীনতা, জনস্বার্থ রক্ষা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে দিক নির্নির্দেশনা দেয়। যার মূল ভিত্তি হলো সত্য অনুসন্ধান ও প্রকাশ করা, ক্ষতি কমানো, স্বাধীন থাকা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন কালে তথ্য বিকৃতি না করা, গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং ভুল স্বীকার করে সংশোধন করার প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন। যা পাঠক ও জনগণের আস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

সাংবাদিকতার মূল নৈতিক নীতি:
১. সত্যকে অনুসন্ধান ও প্রকাশ করা (Seek Truth and Report It): একাধিক উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা, ভুল বা বিকৃত তথ্য এড়িয়ে চলা এবং स्रोতের পরিচয় প্রকাশ করা (যদি সম্ভব হয়)।
২. ক্ষতি কমানো (Minimize Harm): সংবাদের বিষয়বস্তুর প্রতি সংবেদনশীল হওয়া, বিশেষত দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, এবং তাদের গোপনীয়তা ও মর্যাদাকে সম্মান করা।
৩. স্বাধীন থাকা (Act Independently): স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এড়িয়ে চলা, উপহার বা সুবিধা গ্রহণ না করা এবং বিজ্ঞাপনদাতা বা বিশেষ গোষ্ঠীর চাপ থেকে মুক্ত থাকা।
৪. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা (Be Accountable): ভুল হলে তা স্বীকার করা ও সংশোধন করা, সমালোচনার মুখোমুখি হওয়া এবং নিজেদের কাজের জন্য দায়বদ্ধ থাকা।

এথিক্সের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক:
১. বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা (Objectivity and Impartiality): তথ্যকে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা যাতে পাঠক নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এবং নিজস্ব মতামত চাপিয়ে না দেওয়া।
২. জনস্বার্থ (Public Interest): খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহার উন্মোচন করা।
৩. পক্ষপাতহীনতা (Fairness): কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্যায় পক্ষপাতিত্ব না করা।
৪. গোপনীয়তা (Privacy): ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে সম্মান করা।
৭১ এর পর থেকে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার এথিক্স বহুক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। কারণ ইন্ডিয়া প্রেমিক তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীলদের হাতেই রয়ে গেছে দেশের নিউজ মিডিয়ার পুরো নিয়ন্ত্রণ। এরা নিজস্ব রীতি-নীতি অনুযায়ী মত প্রকাশ ও সংবাপত্রের স্বাধীনতার এথিক্স নির্ধারণ করেছে। এদের কাছে নীতি, আদর্শ ও সাংবাদিকতার এথিক্সের কোনো মূল্য নেই।
১/১১ সরকার নিয়ে আমাদের প্রায়ই আলোচনা করতে হয়। কারণ সে সরকারই অঘোষিত ভাবে দেশকে ইন্ডিয়ার পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। সে সরকারের আমলে জিয়া পরিবার নিষ্ঠুর জুলুমের শিকার হয়েছেন।
জুলুমের ব্যাপকতা ও জুলুমকারীদের খুঁটির জোর কোথায় সেটা বুঝতে পেরে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, দেশের জন্য আমি আমার ২ ছেলেকে কুরবানী দিলাম। ১/১১ সরকারের নিষ্ঠুর নির্যাতনে গুরুতর জখম হয়ে তার এক ছেলে আরাফাত রহমান ইতিমধ্যে কুরবানী হয়েছে।
১/১১ সরকার দেশের সব মিডিয়া ও সাংবাদিককে বলতে গেলে কিনে ফেলেছিল। সে সরকার ক্রীতদাস মিডিয়াকে ব্যবহার করে বিএনপি ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সাঁড়াশি প্রচার-প্রচারণা চালায়। এসব প্রচারণার নেতৃত্বে ছিল প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার।

তবে সে সরকার হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিককে কিনতে পারেনি। স্রোতের বিপরিতে গিয়ে বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক উপ-প্রধান সিরাজুর রহমান (মৃত), মাহমুদুর রহমান (বর্তমানে দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক), সিনিয়র সাংবাদিক সাদেক খান (মৃত), আজিজুল হক বান্না (মৃত), যায় যায় দিন সম্পাদক শফিক রেহমান ও আরো বেশ কয়েকজন সাংবাদিক সত্য তুলে ধরার জন্য কঠিন সংগ্রাম করেছেন।
তখন তরুণদের মধ্যে আমিও দৈনিক যায় যায় দিন ও দৈনিক দিনকালে প্রচুর লেখালেখি করেছি। সে সময়ে বর্তমান সময়ের মতো সোশ্যাল মিডিয়া জনপ্রিয় হয়নি। তখন হাতেগোনা কিছু মানুষ ফেসবুক ইউজার ছিল। আমাদের লেখালেখির মাধ্যমে ছিল শুধু সংবাদপত্র।
১/১১ সরকারের আমলে যারা সাংবাদিকতার এথিক্স মেনে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করেছেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবার পর তাদের প্রত্যেককেই নিষ্ঠুর জুলুম করেছে। বামধারার সাংবাদিক ও ইংরেজী দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির জুলুমের শিকার হননি। তবে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা তাকে বেশ কয়েকবার হামলা করার চেষ্টা করেছিল।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে চাটুকারী, তোষামোদী ও তেলমর্দন সাংবাদিকতার অতিশয় প্রতিযোগিতা দেখে বিস্মিত হতে হচ্ছে। সময় ভিন্ন, দৃশ্যপট ভিন্ন। তবে মুখগুলো একই। প্রতিকূল সময়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে তথ্যসন্ত্রাস চালানোর হোতারাই আবার রূপবদল করে তেলের বাটি হাতে নিয়ে তারেক রহমানের সামনে দাঁড়িয়েছে। ফুলে-ফুলে ভরা চাটুকারীতে সিক্ত হয়ে ধন্য হচ্ছেন তারেক রহমান! পেশাদার সাংবাদিকরা কিভাবে এতো নোংরা ভাবে নিজেদের রূপ বদল করেন তা ভাবতেও অবাক লাগে! তাও আবার তথাকথিত মেইনস্ট্রীম নিউজ মিডিয়ার এলিট সাংবাদিকরা! তাদের রূপবদলের আতিশ্য দেখে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “দুই বিঘা জমি” কবিতার একটি পঙতি মনে পড়লো!
বাবু কহে হেসে, “বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়।’
আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে–
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!
এ যদি হয় আমাদের তথাকথিত মেইনস্ট্রীম মিডিয়া ও এলিট সাংবাদিকদের নৈতিক অবস্থান ও সাংবাদিকতার স্ট্যান্ডার্ড তাহলে সামনের দিনগুলোতে এ দেশের সাধারণ মানুষের কপালে আরো অনেক দুঃখ অপেক্ষা করছে।
লেখক: গল্পকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
E-mail: s.iquram03@gmail.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
