গণভোট এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে জনগণ সরাসরি ভোট দেওয়ার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের মতামত দেয়। এটি মূলত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমত যাচাইয়ের জন্য গণভোটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়। যেমন, সংবিধান সংশোধন, আইন তৈরি, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা, এমনকি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও গণভোটের আয়োজন করা হয়। সাধারণত ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে গণভোট নেওয়া হয়।
গণভোটের ধারণাটি সুইজারল্যান্ডে ১৬ শতকে প্রথম চালু হয় বলে ধারণা করা হয়। তবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এর ব্যবহার কমে আসে, কিন্তু ১৯৭০-এর দশক থেকে এটি আবার জনপ্রিয়তা লাভ করে, কারণ জনগণ রাজনৈতিক দলগলোর চেয়ে নির্দিষ্ট নীতিগত বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রশাসনিক গণভোট এবং একটি সাংবিধানীক গণভোট।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে দেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। উদ্দেশ্য ছিল সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া জিয়াউর রহমানের শাসনকাজের বৈধতা দেওয়া। রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তার নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আমজনতার আস্থা আছে কি না, সে বিষয়ে দেশের জনগণের মতামত জানতে ওই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল।
১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ দেশে দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচি এবং স্থগিত সংবিধান নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ওই গণভোটের আয়োজন হয়েছিল।
১৯৯০ সালে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ওই নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়। অতঃপর ওই বছরের ৬ আগস্ট মধ্যরাতে জাতীয় সংসদে সর্বসস্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার বিল পাস হয়। সুতরাং ওই বিলের বৈধতা নেওয়ার জন্য ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে তৃতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সাথে দেশে চতুর্থ গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মূলত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্যই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
বস্তুত, বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে একটি টেকসই
গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার প্রেক্ষাপটে বিগত ১৫ বছর দেশে গেড়ে বসেছিল এক ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা। তাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকার হয়ে দাড়ায় বিচার, সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচন।
রাষ্ট্র সংস্কার মেরামরতর জনআকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্ট ড. মুহাস্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর গঠন করেন ১১ টি সংস্কার কমিশন। এর মধ্যে প্রথম গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে তিন দফা আলোচান করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, যার ভিত্তিতে প্রণীত হয় আগামীর বাংলাদেশের পথরেখা ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। এরই মধ্যে সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ(সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করেছে এবং ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে।
মূলত জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪ টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৪৮ টি প্রস্তাব নিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট হবে। বাকি ৩৬ টি সংস্কার প্রস্তাব অধ্যাদেশ ও বিধি প্রণয়ন কিংবা নিবার্হী আদেশে বাস্তবায়ন করা হবে।
একথা সন্দেহাতীতভাবে বলা যেতে পারে যে, ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে দলমত নির্বিশেষে ‘হ্যা’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষন আর নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ। গণভোটে ‘হ্যা’ মানে তত্ত্বাবধায়ক, নিবার্চন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন,পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠনে ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করবে। সরকার ইচ্ছামতো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না। গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য জনগণের সম্মতি বা গণভোট নিতে হবে। গণভোটের প্রস্তাবে উল্লেখ আছে, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদের গুরুপূর্ণ কমিটির সভাপতিরা নির্বাচিত হবেন। একজন সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে। মামলারজট কমানোর জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের বেঞ্চ এবং উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপিত হবে। সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় জাতীয় সংসদে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। আমজনতার মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত হবে। আরো উল্লেখ আছে, রাষ্ট্রভাষা বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষাও সাংবিধানীকভাবে স্বীকৃতি পাবে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি নিজ ইচ্ছামতো ক্ষমা করতে পারবেন না। সব ক্ষমতাই শুধু প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে না। এরকরম আরো প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এর মধ্যে রয়েছে।
সুতরাং, আসুন দলমত নির্বিশেষে আমরা ২০২৬ সালের চতুর্থ গণভোটে অংশ নেই এবং স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য নিঃসংশয়ে ‘হ্যাঁ’ তে ভোট দেই। স্বৈরাচারমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও স্থিতীশীল নতুন বাংলাদেশ গঠন করার পূর্ণ ক্ষমতা এখন আমাদের হাতে। আসুস আমার সবাই এর যথাযথ প্রয়োগ করে নতুন বাংলাদেশ বিনিমার্ণের পথ উন্মুক্ত করি এবং ফ্যাসিবাদকে পুরোপুরি নিমূর্ল করি। এই অনন্য ভোট অন্যকে দিতে উৎসাহীত করি এবং এর বিরোধীতাকারীদের বয়কট করি।
অতএব, দৃঢ়ভাবে আশা করা যায়, ২০২৬ এর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হবে এবং এই সনদ কার্যকরের দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃক্ষমতায়িত হবে। নিশ্চিতভাবে স্বৈরতন্ত্রের মূলোৎপাটন হবে ; দেশে স্থিতিশীলতা আসবে। এছাড়াও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
