বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা যা এক বিশিষ্ট এবং ৩৫০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ৩০০ জন প্রত্যক্ষ ভোটে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হন এবং বাকি ৫০ জন সদস্য সংরক্ষিত নারী আসন থেকে এমপিদের ভোটে নির্বাচিত হন।
নির্বাচিত সদস্যরা জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন, সরকারের কাজের তদারকি এবং নিজ এলাকার উন্নয়নে মূলভূমিকা পালন করেন। তারা জনগণের কন্ঠস্বর হিসেবে সংসদে জনস্বার্থ তুলে ধরেন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রাণকেন্দ্র। তাই আমাদের সকলেরই উচিত সাংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত যোগ্য লোককে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা অনেকেই জানিনা প্রার্থীর সদস্য হওয়ার যোগ্যতা–অযোগ্যতা সম্পর্কে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চম ভাগের প্রথম পরিচ্ছদে জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা সম্পর্কে বিস্তারী বর্ণনা দেওয়া আছে। যেমন: (১) প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, বয়স ২৫ পূর্ণ হতে হবে। তবে আদালত কাউকে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পাবেন না। (২) কেউ আদালতের দ্বারা দেউলিয়া ঘোষিত হলে সে দায় মুক্ত হতে হবে, অন্যথায় তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না। (৩) প্রার্থী যদি অন্য কোনও দেশের নাগরিকত্ব অর্জন বা গ্রহণ করেন বা অন্য কোনও বিদেশী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করেন, তবেও তিনি অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। (৪) প্রার্থী যদি কোনও ফৌজদারি মামলায় দোষী হয়ে কমপক্ষে দুই বছর কারাদন্ড ভোগ করেন, তবে নির্বাচিত হতে হলে তাকে কমপক্ষে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। (৫) প্রার্থী যদি বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রকারী বা আঁতাতকারী হিসেবে বিশেষ আদালত (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭২) কর্তৃক অপরাধের জন্য দন্ডিত হয়ে থাকলে, তবেও তিনি অযোগ্য বিবেচিত হবেন। (৬) ব্যক্তি যদি প্রজাতন্ত্রের কোনও লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন ; যা আইন দ্বারা তাকে নির্বাচনে যোগ্য ঘোষণা না করে, তবেও তিনি নির্বাচনে লড়াই করতে পারবেন না। (৭) প্রার্থী ঋণখেলাপি, বিলখেলাপি বা টাকা পাচারকারী হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তবে ঋণ বা বিল বাবদ দেনা সম্পূর্ণ পরিশোধ করার পর তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। (৮) বাংলাদেশের বিদ্যমান কোনো আইন দ্বারা যদি প্রার্থী অযোগ্য বিবেচিত হন, তবেও তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। (৯) ব্যক্তি যদি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন, তবে তিনি বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। তবে তাকে অবশ্যই নির্বাচনে যোগ্য হওয়ার জন্য বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চলের ভোটার তালিকাভুক্ত হতে হবে। (১০) নির্বাচনের পরেও যদি কখনও কোনো সদস্য কোনো আইন দ্বারা অপরাধী বা অযোগ্য প্রমাণিত হন, তবে সে আসন শূন্য হবে কি না তা শুনানি ও নিস্পত্তির মাধ্যমে মীমাংসা করা হবে এবং এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
অথচ, চলিত বছরের ১৮ জানুয়ারি এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের সময় সংবিধানের উল্লেখিত নিয়ম-নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে আসল তথ্য–উপাত্ত গোপন করে ভুয়া তথ্য দিয়ে এবং আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে অনেক ঋণখেলাপি–বিলখেলাপি–টাকা পাচারকারী ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী প্রার্থী নির্বাচন কমিশন থেকে বৈধতা নিয়েছেন! এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল এদেরকে ভোটের বাইরে রাখার। তবে এধরনের নির্বাচন জুলাই বিপ্লবের সাথে সাংঘর্ষিক।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশ(টিআইবি)-র তথ্যানুযায়ী, আসন্ন এয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১ টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে, যাতে চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৯৮১ জন। তাদের প্রায় ১৩ শতাংশ স্বতন্ত্র। এবারের নির্বাচনে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বর্তমান দামের ভিত্তিতে কোটিপতি প্রার্থী ৮৯১ জন আর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্যের ভিত্তিতে শতকোটি মালিক ২৭ জন প্রার্থী। এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় আছে। প্রার্থীদের সর্বমোট ঋণের পরিমান ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ব্যাংকঋণের পরিমান প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে এবার ঋণ বা দায়গ্রস্ত প্রার্থী সবচেয়ে কম, তবে মোট ঋণের পরিমানে তা সবচেয়ে বেশি। আর দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় থাকায় ২৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ২০ জন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বলাবাহুল, দ্বৈত নাগরিক হওয়াটা অপরাধ নয়, কোনো বেআইনি কাজও নয়। অপরাধ হলো, দ্বৈত নাগরিক হয়ে সেটা লুকিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের মিথ্যা হলফনামা পেশ করা। কারণ, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে এধরনের লোক সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। তবে আমাদের দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিক এনিয়ম মানতে চায় না, তারা এসব তথ্য সব সময় গোপন রাখার চেষ্টা করেন।
টিআইবির তথ্যসূত্র অনুযায়ী আরো জানা যায়, ৫৩০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে, যা মোট প্রার্থীর ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর অতীতে মামলা ছিল ৭৪০ জন বা ৩১ দশমিক ৬৪ শাতাং প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এবার সব দলের প্রার্থীদের ঘোষিত সর্বমোট নির্বাচন ব্যয় ৪৬৩ দশমিক ৭ কোটি টাকা, প্রার্থীপ্রতি গড় ব্যয় সাড়ে ২২ লাখ টাকা।
আশ্চর্যজনক হলো ঋণ শোধ না করার পরও খেলাপিদের বিভিন্ন সুবিধা প্রদান, যেমন, সুদ হ্রাস, মেয়াদ বৃদ্ধি প্রভৃতি সুযোগ দেয় হচ্ছে। আর এধরনের সুযোগ নিয়েই ঋণখেলাপি-বিলখেলাপিরা নির্বাচনী বৈতরণী পার হচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষের দিকে খেলাপি ঋণের পরিমান ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা; ২০২৫ সালে সেই ঋণের পরিমান দাঁড়ায় ৬ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে ৩৬ % টাকা অনাদায়ী। এই অবস্থায় আমাদের মাথাপিছু ঋণের পরিমান প্রায় ৪০ হাজার টাকা, অর্থাৎ আমাদের প্রত্যেককে ৪০ হাজার করে টাকা পরিশোধ করতে হবে! বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশ খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ।
মূলত লোভী, অসৎ, ঋণখেলাপি ও লুটেরাদের কারণে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন কুলষিত হচ্ছে, ব্যাংক খাত ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে, ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ঋণের নামে জনগণের টাকা লুন্ঠন করা হচ্ছে।আমাদের দেশে বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকরে ঋণখেলাপিদের পার পাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। দেশের বিরাজমান আইন অনুযায়ী কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন সাধারণত অবৈধ বলা যায় না! কারণ, শিল্প বা ব্যবসাপ্রাতিষ্ঠানের ঋণ সাধারণত ব্যক্তির নামে নয়, প্রতিষ্ঠানের নামে মঞ্জুর হয়। তাই ঋণের দায় কেবল প্রতিষ্ঠানের, মালিকের নয়! এমন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকের মনোনয়ন বৈধ হতে কোনো বাঁধা নেই। এধরনের অদ্ভূত আইন বাতিল হওয়া অতিব জরুরি। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এধরনের সাংঘর্ষিক আইন বাতিল আদৌ সম্ভব নয়।
আমাদের দেশে একদিকে ঋণের ভারে খেটেখাওয়া মানুষ আত্মহত্যা করে, অপরদিকে ঋণখেলাপিরা সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। এধরনের পরিস্থিতির অবসান হওয়া প্রয়োজন।
বস্তুত, জুলাই বিপ্লব হয়েছিল এধরনের অর্থনৈতিক ও সামজিক বৈষম্য দূর করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। এয়োদশ সাধারণ নির্বাচনে ঋণখেলাপি, লুটেরা ও দ্বৈত্ব নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বৈধতা দিয়ে নির্বাচন কমিশন অনৈতিক ও অমানবিক কাজ করেছে। এধরনের নির্বাচন জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনার সাথে সংঘাতপূর্ণ। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কালোটাকা মুক্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। যদি এসব ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকরা নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে যান, তাহলে তো ফ্যাসিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে ; তারা আইন প্রণয়ন করবে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য, দেশ ও জনগণের স্বার্থে নয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এটা হবে জুলাই শহীদদের রক্তের সাথে চরম বেঈমানী।
প্রসঙ্গত, এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা তাদের হলফনামায় নিজেদের অর্জিত সম্পদ কতটা দেখিয়েছেন, পুরোটা দেখিয়েছেন কি না কিংবা দেশে বা বিদেশে সম্পদ আহরণের তথ্য গোপন করেছেন কি না, তা যাচাই যেমন অনিবার্য, তেমনি যে আয় ও সম্পদ অর্জনের তথ্য হলফনামা বিশ্লেষণে পাওয়া যাচ্ছে, তা বৈধ আয়ের সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ , এ বিষয়গুলো যাচাইসাপেক্ষে জবাবদিহি নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য অবশ্যই নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও রাজস্ব বিভাগকে উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থলোভী হিংস্র দানবরূপী এসব ঋণখেলাপি রাজনীতিকরা সবাই যার যার নির্বাচনি এলাকায় একজন বিরাট দানবীর। সরকার ও ব্যাংকের টাকা মেরে তারা ওই টাকা দিয়ে এলাকার লোকজনকে বেশ উদার হাতেই সাহায্য করে থাকেন। কেউ কেউ আবার মসজিদ-মন্দির-মাদ্রাসা-স্কুল-কলেজ ও দাতব্যচিকিৎসালয় নিমার্ণে প্রচুর টাকা খরচ করে থাকেন। এসব কাজের মাধ্যমে তাদের আসল চরিত্র আড়ালে চলে যাচ্ছে ! প্রার্থীর এসব ব্যয়ের টাকা যে আসলে জনগণের এবং ভোটররা সেই জনগণেরই অংশ সেটা আজ পর্যন্ত বেশির ভাগ মানুষের বোধগম্য নয় ! এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিৎ অতি দ্রুত ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের আগে এসব ঋণখেলাপি, বিলখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের তালিকা পত্রিকায় প্রকাশ করা ; তাতে দুর্ভাগা জনগণ এদের কুৎসিত চরিত্র সম্পর্কে যৎসামান্য অবহিত হবে, সমাদরের বিপরীতে সমাজ এদের ঘৃণার চোখে দেখলে কিছুটা হলেও এর প্রতিকার হতে পারে।
সুতরাং আসুন, আমরা সবাই এবারের এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সৎ-নিষ্ঠাবান-নির্লোভ ও দেশপ্রেমীক লোককে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করি ; ঋনখেলাপি, বিলখেলাপি, লুন্ঠনকারী, ফৌজদারী অপরাধী এবং দ্বৈত নাগরিকদের বয়কট করি এবং তাদের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
