গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন উভয়ই সরাসরি জনগণের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটি হলেও এদের মধ্যে বেশ পাথর্ক্য রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন হলো প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া, যেখানে দল বা প্রার্থীর মাধ্যমে শাসনভার নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে, গণভোট হলো সংবিধান সংশোধন, পরিবর্তন,বাতিল বা নির্দিষ্ট কোনো নীতিগত ইস্যুতে ‘হ্যা’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে সরাসরি মতামত দেওয়ার প্রক্রিয়া।
মূলত, জাতীয় নির্বাচন প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে। আর গণভোট একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে জনগণের সরাসরি মতামত বা সম্মতি গ্রহণ করে। উভয়ের মধ্যেই উদ্দেশ্যগত ও মৌলিক পাথার্ক্য রয়েছে। একটির দ্বারা শাসকগোষ্ঠী ঠিক করা হয়, অপরটির দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম–নীতি ঠিক করা হয়। গবেষকদের মতে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ নিজেরা সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নেওয়া সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও বৈধ। গণভোটের রায় বাতিল, স্থগিত বা রহিত করার ক্ষমতা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেই। তাই বিনাবাক্যে ও কোনো ধরনের বির্তক ছাড়াই গণভোটের রায়কে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নির্দ্বিধায় শাসকদলকে মেনে নিতে হয়।
অথচ, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) ২০২৬ সালের চতুর্থ গণভোটে ‘হ্যা’ বিজয়ী ফলাফলকে সরাসরি বাতিল করতে চাচ্ছে!! শাসকদল বিএনপির এহেন আচরণ সত্যিই দুঃজনক,অনৈতিক, অমানবিক, অসাংবিধানিক ও সাংঘর্ষিক!! ব্যাপরটি আপামর জনগণকে হতবাক করেছে। সরকারী দলের এধরনের দ্বিচারিতা জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল।
উল্লেখ্য, বিগত ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বতী সরকার সব প্রধান রাজনৈতিক দল, বিশেষত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের(বিএনপি) সাথে পরামর্শক্রমে সংস্কার কমিশন গঠন করে। লক্ষ্য ছিল পতিত শাসনামলের সৃষ্ট কাঠামোগত দুর্বলতা ও দুর্নীতির উৎসগুলো চিহিৃত ও সংশোধন করা। এসব সুপারিশ সমন্বিত হয়ে ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার রূপরেখা গঠিত হয়। সব প্রধান রাজনৈতিক দল এতে সম্মতি দেয়।
সনদ কার্যকর করতে গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারিত হয়। বিএনপি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের দাবি তোলে। অন্তর্বর্তী সরকার তা মেনে নেয়। অতঃপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ ভোট দেন। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুলভাবে জয়ী হয়।
কিন্তু এরপর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। বিএনপি সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও প্রস্তাবিত গণপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। গণভোট বাতিল ঘোষণার জন্য বিএনপি পন্থী আইনজীবী কর্তৃক হাইকোর্টে রিট আবেদনও দাখিল হয়েছে। তাই দেশ আজ এক সাংবিধানিক সংকটের সন্ধিক্ষণে।
এই অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন আসে–প্রয়োজনের ভিত্তিতে বৈধ ঘোষিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে একই কর্তৃত্বে একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোট কি প্রত্যাখান করা যেতে পারে?
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের যে ধরনের গড়িমসি বা দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে এই সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে প্রচলিত সংবিধানের গন্ডিতে আটকে রাখার চেষ্টা জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
