অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তৃত্ব প্রয়োজনের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত। যদি বিএনপি যুক্তি দেয়, অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী সংবিধানের সৃষ্ট সত্তা নয় বিধায় গণভোটটি সংবিধানসম্মত বৈধতা পায়নি, তবে একই আপত্তি সংসদীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হবে। একই বিষয়ে একই সঙ্গে গ্রহণ ও বর্জন করা যায় না।
বলাবাহুল্য যে, প্রয়োজনের ভিত্তিতে বৈধতা প্রাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তৃত্বই সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উভয় প্রক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাই বিএনপি একটিকে গ্রহণ করে অন্যটিকে প্রত্যাখান করতে পারে না। জনগণ একই দিনে দুবার তাদের মতামত ভোটের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। গণতান্ত্রিক ম্যানডেটকে অর্ধেক ভাগে কখনো বিভক্ত করা যায় না। পাশাপাশি জনগণের প্রতি সদিচ্ছার ভিত্তিতে প্রদত্ত প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দলটি নৈতিকভাবেও দায়বদ্ধ হয়েছে।
আইনজ্ঞদের মতে, একই পক্ষ একই দলিলকে একদিকে গ্রহণ এবং অন্যদিকে প্রত্যাখান করতে পারে না। নির্বাচন ও গণভোট আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে অবিচ্ছেদ্য যমজের মতো। একটিকে অকার্যকর ঘোষণা করা মানে অপরটির বৈধতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা।
অতএব, বিএনপির সামনে এখন দুটি বিকল্পই উন্মুক্ত রয়েছে–প্রয়োজনে উভয় প্রক্রিয়াকেই বৈধ হিসেবে বিনাবাক্যে ও সংশয় ছাড়াই স্বীকার করা, অথবা উভয় প্রক্রিয়াকেই প্রত্যাখান করা ; বেছে বেছে নিজের পছন্দ মতো গ্রহণের এই প্রবণতা আইনগত সামঞ্জস্য ও জনআস্থাকে ক্ষুন্ন করে।
জুলাই সনদ ছিল সর্বদলীয় ঐকমত্যের ফল। বিএনপি এর শর্তাবলিতে সম্মতি প্রদান করেছিল এবং একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিল এবং এর পক্ষে জোরালোভাবে মত দিয়েছিল।
সুতরাং, বিএনপিকে যেকোনো মূল্যে এই চুক্তি বা অঙ্গীকার বিনাসংকোচে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। এখানে কোনো ধরনের অজুহাত ও ব্যতিক্রম চলবে না। এটি হলো আইনের একটি মৌলিক নীতি।
সুবিধাজনক অবস্থায় এসে বিএনপি যদি এখন দাবি করে, তারা কেবল কৌশলগত কারণে উভয় ভোটের আগে সম্মতি দিয়েছিল এবং ফলাফল মেনে নেওয়ার প্রকৃত অভিপ্রায় ও ইচ্ছা ছিল না, তবে তা হবে মিথ্যা ও ভ্রান্ত উপস্থাপনার শামিল। এককথায় বলা চলে প্রতারণা। কিন্তু আইনের শাসন এধনের কৌশলগত দ্বিচারিতাকে কখনো সমর্থন করে না বরং, প্রত্যাখান করে।
নির্বাচনী ময়দানে বিএনপি প্রকাশ্যে জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটকে সমর্থন করেছিল। আর ভোটাররা সেই আশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বিএনপি নেতাদের অকৃতিম আহ্বানে অনেকেই ধানের শীষের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করেছে। রাষ্ট্রও এই দ্বৈত প্রক্রিয়ার আয়োজনের জন্য প্রচুর টাকা ব্যয় করেছে। এই অবস্থায় এখন গণভোটকে অস্বীকার করলে,তা প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক ক্ষতির অন্যতম কারণ হবে। নীতি ও নৈতিকতা অনুযায়ী সমূহ সুযোগ থাকার পরও সদিচ্ছার অভাবে এমন আকস্মিক অবস্থার পরিবর্তন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সদিচ্ছা ও ওয়াদা কেবলমাত্র ধর্মীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের একটি নীতি নয় ; এটি আমাদের দেশের সাংবিধানিক শাসনেরও অন্তর্নিহিত একটি নৈতিক ভিত্তি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনসমক্ষে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ও ওয়াদা বাস্তবায়ন করা শাসকের সততার ওপর নির্ভর করে। মূলত, শাসকগোষ্ঠীর সদিচ্ছার অনুপস্থিতিতে একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনও একটি আনুষ্ঠানিক নাটকে পরিণত হয়, যার প্রকৃত গণতান্ত্রিক কোনো মূল্য থাকে না–এবারের ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয়ী বিএনপিকে একথা গভীরভাবে ভাবতে হবে।
এবারের নির্বাচনে ভোটাররা বিএনপির দলীয় প্রতীকের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ব্যালটের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণার সময়, তাদের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং প্রায় চার কোটি লোক গণভোটে ‘হ্যা’ ব্যালটে ভোট দিয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল থেকে সুবিধা গ্রহণ করার পর গণভোটকে প্রত্যাখান করা জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল, যা অনৈতিক ও অসাংবিধানিক। মূলত, গণতান্ত্রিক বৈধতা দাবি করে যে, নির্বাচনের পূর্ববর্তী বক্তব্য ও নির্বাচনের পরবর্তী আচরণের ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্যতা,উপযুক্ততা ও সমীচীনতা থাকতে হবে।
নীতি ও নৈতিবকতা আইনের অন্যতম ভিত্তি। যদি আইন নীতি ও নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন জবরদস্তি, কূটকৌশল, চালাকি আইনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে। নির্বাচনি প্রচারণার সময় বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধানের শীষে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ব্যালটে ভোট প্রদানের জন্য জনগণের প্রতি প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার এধরনের আহ্বানে গণভোটে বিপুল সমর্থন অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
এই অবস্থায় এখন গণভোটের ফলাফল প্রত্যাখান করা কেবল আইনি অসামঞ্জস্য ও অসঙ্গতি নয়, এটি একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক লঙ্ঘনও বটে। এটি এখন একটি মৌলিক প্রশ্নও উত্থাপন করে এবং তা হলো–জনগণের সুস্পষ্ট প্রকাশিত তীব্র ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে কোনো সরকার বাস্তবায়ন করতে অস্বীকার করলে সেই জনগণের কাছ থেকে কি সেই সরকারের নৈতিক কর্তৃত্ব অর্জিত হতে পারে?
বস্তুত, রাজনৈতিক নৈতিকতা সাংবিধানিক বৈধতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে রাজনৈতিক দল সংস্কারমূলক ম্যানডেট সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছে,
সে দল যদি ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই ম্যানডেট অস্বীকার করে, তবে তার শাসনের নৈতিক ভিত্তি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখন সুস্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে যে, গণভোট বিষয়ে শাসকদল বিএনপির অবস্থান আইনগত ও নৈতিকভাবে টেকসই নয়। তবে বর্তমান অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে এবং গণভোটের ফলাফল অকার্যকর ঘোষিত হলে জুলাই বিপ্লব–পূর্ব সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামোগত ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বস্তুত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সফল গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে যে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণে ৮ আগস্ট জনগণের পরম অভিব্যক্তি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী জনগণের ইচ্ছাই হচ্ছে এই সরকারের বৈধতার স্বীকৃত উৎস। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের ৬৯ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়ে এর প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন, তাই এই গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized