ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশ শুরু হয়েছে চলিত বছরের ১২ মার্চ। এরপর ১৫ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৩ দিনের বিরতি ছিল। গত ২৯ মার্চ থেকে আবার সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে এবং আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই অধিবেশন চলার কথা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, দেড় সহস্রাধিক জীবন ও অপরিমেয় রক্তের বিনিময়ে প্রায় দু-দশক পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও চতুর্থ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে চলিত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই সরকার জনপ্রত্যাশার সংস্কার ইস্যুতে যেন তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। গত ২ এপ্রিল বিশিষ্ট আইনজ্ঞ অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি জুলাই সনদ ও গণভোটকে অবজ্ঞা ও অবহেলা করে জাতীয় সংসদে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত বিল উত্থাপন কেরেছে। এই অবাঞ্ছিত বিল আমজনতাকে বেশ হতাশ করেছে। এই অপ্রত্যাশিত বিলের মাধ্যমে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন কমিটি বিরোধী দলের মতামত ছাড়াই সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে যাচাই–বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশ করেছে, এটা অবশ্য ভালো বার্তা দেয় না। সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার, মানুষের সমান অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে বিচারক নিয়োগ, স্বাধীন বিচার সচিবালয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে করা অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধে করা অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকারকমিশনসহ ১৬ টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি। এই সুপারিশ সংসদে গৃহীত হলে এ অধ্যাদেশগুলো আপাতত বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। অবশ্য ১০ এপ্রিলের পর এগুলো কার্যকারিতা হারাবে। সব মিলিয়ে ২০ টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এর মধ্যে অধিকাংশ অধ্যাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র–জনতার প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিফল ছিল।
বাকি ১১৩ টি অধ্যাদেশের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে করা জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ)অধ্যাদেশসহ ৯৮ টি অনুমোদনের জন্য হুবহু বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আর সন্ত্রাসবিরোধী আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৫ টি সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি।
সুপারিশ অনুযায়ী যে ২০ টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগের শুধু হোঁচটই খাবে না, গুম-খুন, মানবাধিকার হরণ, লাগামহীন দুর্নীতর পথ সুগমসহ শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তির সুযোগ তৈরি করবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন বুনছিল মানুষ, তা ফিকে হয়ে যাবে।
এরই মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়েও রাজনৈতিক বির্তক তুঙ্গে উঠেছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু্ই তারা মানেন না। জুলাই সনদ আদেশকে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল হিসেবে বর্ণনা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে দ্রুত রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারের দাবি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, জুলাই সনদ যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো প্রথাগতভাবে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের এ অবস্থাকে কেন্দ্র করে সামনের দিনে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে। ১১–দলীয় বিরোধী জোট ইতিমধ্যে রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের এই গড়িমসি ও দীর্ঘসূত্রিতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক বিশাল অন্তরায়। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে দেশ এক ভয়াবহ শাসনতান্ত্রিক শূন্যতায় পড়বে, যা প্রকান্তরে ২০২৪–এর বিপ্লবের অর্জনকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
তবে এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। সংসদে বাতিলের প্রস্তাব করা অধ্যাদ্গেুলো পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ আছে। যেগুলো ঝুলিয়ে দিয়ে ‘অধিকতর শক্তিশালী’ করে উপস্থাপনার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো নিয়েও ছলচাতুরী করা ঠিক হচ্ছে না। সরকার যদি সংস্কার ইস্যুগুলো সংসদে সমাধান না করে, তা সংসদ থেকে রাজপথের দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে নিশ্চিত, সরকারের স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়ার শঙ্কার পথ সুপ্রস্ত হবে। সরকারবাহাদুরকে এই বিষয় নিয়ে আরো গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
অতএব, জুলাই সনদ থেকে সরে আসা কিংবা আদালতের আশ্রয় নিয়ে তা বাতিল করার কোনো প্রচেষ্টা কেবল একটি দলিলকে অস্বীকার করা নয়; বরং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। এমনপদক্ষেপ ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা ও সঙ্ঘাতের সৃষ্টি করতে পারে। তাই জাতীয় স্বার্থে, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী জনগণের প্রত্যাশা পূরণে জুলাই সনদের যথাযথ বাস্তবায়ন এখন বাংলাদেশের আমজনতার প্রাণের দাবি। (সমাপ্ত)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
