বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে বিশ্বব্যাপী মূলত ‘ফুটবল জ্বর’ নামক সর্বব্যাপী উম্মাদনা সৃষ্টি হয়। খেলার মাসগুলোতে ধর্ম-বর্ণ ও ভৌগোলিক সীমারেখা ভুলে পুরো বিশ্ব একটিমাত্র উৎসবের মঞ্চে পরিণত হয়।
বিশ্বকাপে মাঠে যখন ফুটবলাররা লড়াই করেন, তখন গ্যালারিতে ও টিভির সমানে বসে কোটি কোটি সমর্থক সেই আবেগের সাথে একাত্ম হয়ে যান, যা বিশ্ব ঐক্যের এক অদ্ভূত মেলবন্ধন তৈরি করে।
বিশ্বকাপ নিয়ে মানুষের আগ্রহ এতটাই বেশি থাকে যে, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিনোদন কেন্দ্রগুলো পযর্ন্ত বিশেষ ছাড় বা আয়োজন করে থাকে। এমনকি বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
৭০-এর দশকে আমাদের দেশের দর্শকরা সরাসরি টিভিতে বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ পেতেন না, তখন বিটিভি বাদে কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল না। তাই খেলা উপভোগের প্রধান মাধ্যম ছিল বিদেশী রেডিওর ধারাভাষ্য শোনা, খবরের কাগজের পরদিন প্রকাশিত রির্পোট পড়া এবং পাড়ার বড়দের কাছ থেকে গল্প শোনা। তখন গভীর রাতে কিংবা দিনের বেলায় রেডিওর নব ঘুরিয়ে বিদেশী রেডিও স্টেশন-বিশেষ করে বিবিসি এবং ভয়েস অব আমেরিকার ধারাভাষ্যের ওপর নির্ভর করতে হতো। ধারাভাষ্য শুনেই দর্শকরা মাঠের খেলার দৃশ্য মনে কল্পনা করে নিতেন। গোল হওয়া বা বিপজ্জনক কোনো মুভমেন্টের সময় ধারাভাষ্যকারের উত্তেজনা শ্রোতাদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ত। রেডিওতে খেলা শোনা ব্যক্তিরা পরদিন পাড়ার চায়ের দোকানে বা বন্ধুদের আড্ডায় ফুটবল ম্যাচের ঘটনাপ্রবাহ বিস্তারিত আলোচনা করতেন। এভাবেই একজনের মাধ্যমে খবরটি অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ত এবং মুখে মুখে তৈরি হতো বিশ্বকাপের উম্মাদনা।
প্রসঙ্গত, ১৯৮০ সালের ১ ডিসেম্বর আমাদের দেশে রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচার চালু হয়। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয় আর তখন থেকেই আমাদের দেশের ফুটবলপ্রেমিদের মাঝে বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনা ও উম্মাদনার সূচনার ঘটে।
এটা বলবার অপেক্ষা রাখে না যে,১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবল ছিল নান্দনিক ফুটবলের এক দারুন প্রদর্শনী। জিকো-ফ্যালকাও ও সক্রেটিসকে নিয়ে গড়া ব্রাজিল দল; মিশেল প্লাটিনি-মানুয়েল অ্যামরোস ও জেন টিগানাকে নিয়ে গড়া ফ্রান্স দল; লোথার ম্যাথাউস-হাইনেঞ্জ রুমেনিগো-পিটার মুলারকে নিয়ে গড়া পশ্চিম জামার্নী দল; পাওলোরসি-ফ্রাকো বারোসি ও আনতেচেল্লিকে নিয়ে গড়া ইতালি দল এবং ড্যানিয়েল প্যাসারেলা-সান্তামারিয়া ও জর্জ ভালদানোকে নিয়ে গড়া আর্জেন্টিনা দল। এসব-কিংবদন্তিতুল্য তারকাদের চোখ ধাঁধানো ছন্দময় খেলা ফুটবলপ্রেমিদের মন জয় করেছিল। এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে পশ্চিম জামার্নীকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল এবং পাওলোরসি ইতালির পক্ষে ৬টি গোল করে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল লাভ করেছিলো। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে প্রতিটি দলের তারকাদের ওয়ান-টাচ পাস, ড্রিবলিং, পাঁয়ের নিঁখুত কারুকাজ ও ছন্দময় ফুটবল খেলা আজও ফুটবলপ্রেমিদের মনে দোলা দেয়।
১৯৮৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ছিল ফুটবলের ১৩তম আসর, যা ১৯৮৬ সালের ৩১ মে থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফুটবলকে অনেকেই ইতিহাসের সেরা ও নান্দনিক আসর মনে করেন। এর মূল কারণ ছিল ডিয়াগো ম্যারাডোনার একক জাদু, তার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ এবং একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের ব্রায়ান রবসন-গ্যারি নিলেকার, পশ্চিম জামার্নীর হ্যারান্ড শুমাখার-রুডি ভোলার, আর্জেন্টিনার জর্জ বুরুচাগা-সার্জিও বাতিস্তা, ব্রাজিলের কারেকা-জোসিমা, ফ্রান্সের লুইস ফার্নান্দেজ-থিয়েরি বোসিস, ইতালির ওয়াল্টার জেঙ্গা-জানলুকা ভিয়াল্লি, পোল্যান্ডের বনিয়েক, প্যারাগুয়ের হোসে লুইস চিলাভার্ট, বেলজিয়ামের এনজো সিফো, উরুগুয়ের ফ্রান্সেস কোলি, মরক্কোর মোহাম্মদ তিমুমি, হাঙ্গেরীর মার্টন এস্তোরহাজি, মেক্সিকোর হুগো সানচেজ, বুলগেরিয়ার জর্জি দিমিএভ, স্পেনের এমিলিও বুত্রাগেনিয়ো, ডেনমার্কের মাইকেল লাউড্রপ এবং ক্যামেরুনের রজার মিলার মতো তৎকালীন তারকাদের অসামান্য নৈপুর্ণ। এছাড়াও ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের অনেক খ্যাতিমান খেলোয়াড় ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপকে অংশগ্রহণ করে প্রতিটি ম্যাচকে আরো ছন্দময় ও সমৃদ্ধ করে ছিল। এছাড়াও গ্যালারিতে দর্শকদের তৈরি করা ‘মেক্সিকান ওয়েভ’ পুরো টুর্নামেন্টে আলাদা এক উৎসবের আমেজ ও নান্দনিক মাত্রা যোগ করেছিল।
বস্তুত, সেসময়কার ফুটবল ছিল শারীরিক সক্ষমতা ও টেকনিকের নিখুঁত সমন্বয়। অতিরিক্ত রক্ষনাত্মক কৌশলের বাইরে বেরিয়ে দলগুলো আক্রমনাত্মক ও দর্শনীয় ফুটবল খেলতে বেশি আগ্রহী ছিল। টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বগুলোতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং রোমাঞ্চকর ম্যাচ দেখা গিয়েছিল, যা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। গ্লোবাল কালার টেলিভিশনের কল্যাণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শক প্রথমবারের মতো এত পরিস্কারভাবে বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি বা তার পরবর্তী সময় থেকে বিশ্বকাপে ছন্দময় ও নান্দনিক ফুটবলের বিলুপ্তি ঘটতে থাকে। ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ছিল নান্দনিক ফুটবলের বড় ধরনের পরিবর্তনের একটি অন্যতম মাইনফলক। এই বিশ্বকাপে আক্রমণাত্মক ও দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের চেয়ে রক্ষণাত্মক কৌশল, শারীরিক ফাউল এবং গোল সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এরপর ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ড্র ও গোলশূন্য ম্যাচ এবং ট্যাকটিক্যাল বা কৌশলগত ফুটবল আরও প্রাধান্য পায়। এমতাবস্থায় ফুটবল ধীরে ধীরে শিল্প থেকে পুরোপুরি পেশাদার ফুটবল ও ব্যবসায়িক রূপ নিতে শুরু করে। ফলে দলগুলো সুন্দর ও ছন্দময় ফুটবলের চেয়ে ম্যাচ জয় বা টুর্নামেন্টে টিকে থাকাকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে।
অপ্রিয় হলেও সত্যি যে, বিশ্বকাপ ফুটবল এখন আগের মতো বিনোদন ও আবেগের জায়গায় নেই, বরং এটি এখন একটি বিশাল বাণিজ্যিক পণ্যে পরিনত হয়েছে। সম্প্রচার স্বত্ব,স্পেনসারশিপ ও টিকিটের আকাশছোঁয়া দামের কারণে সাধারণ ফুটবলপ্রেমিদের চেয়ে কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। এক হিসেবে দেখা গেছে, ফিফার বাৎসরিক গড় আয় প্রায় ২.৭৫ বিলিয়ন(২৭৫ কোটি) ডলার। সাধারণত টিভি ও ডিজিটাল মাধ্যমে খেলা দেখানোর স্বত্ব থেকে ফিফার সবচেয়ে বেশি আয় আসে। বিভিন্ন বৈশ্বিক ব্যান্ডের সাথে চুক্তি ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশাল অংকের অর্থ জমা হয়। এছাড়াে স্টেডিয়ামের টিকিট বিক্রি এবং টুর্নামেন্ট চলাকালীন আতিথিয়তা থেকেও আসে কোটি কোটি ডলার। তবে ৭০ ও ৮০ এর দশকে আয়ের এত উৎস ছিল না।তখন আয় ও মুনাফার চেয়ে নান্দনিক ও ছন্দময় খেলার প্রতিই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বকাপ ফুটবলে এখন নান্দনিকতা ও বিনোদনের চেয়ে মুনাফার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে ফুটবল মাঠে ম্যাচ হারার ভয়ে দলগুলো আক্রমণাত্ম খেলার চেয়ে রক্ষণাত্মক খেলার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে আগের মতো শিল্পিত ড্রিবলিং, নিঁখুত পাসিং ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের প্রদর্শনী ক্রামাগত কমে যাচ্ছে। এছাড়া আধুনিক ক্লাব ফুটবলের প্রচন্ড চাপের কারণে খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপের আগে অনেক বেশি ক্লান্ত থাকেন। এই অবস্থায় জাতীয় দলের জার্সিতে সেই প্রাণবন্ততা ও ঝলক অনেক সময়ই খেলোয়াড়রা প্রর্দশন করতে পারেন না। এছাড়াও ভিএআর এবং সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির কারণে গোল উদযাপনের সেই তাৎক্ষণিত স্বতঃস্ফূর্ততা ও আবেগে কিছুটা ভাটা পড়ে পড়েছে। অনেক সূক্ষ্ণ মুহূর্তও প্রযুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এতে খেলার সৌন্দর্য, শৈল্পিকতা ও সৃজনশীলতার প্রধান্য হ্রাস পাচ্ছে এবং পাশাপাশি দর্শকদের আনন্দও ফিকে হয়ে আসছে।
সুতরাং ফুটবলে আশির দশকের সেই নান্দনিকতা বা ‘বিউটিফুল গেম’ ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন যান্ত্রিক ট্যাকটিকস ও ফলাফলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ব্যক্তিগত দক্ষতা, ড্রিবলিং, নির্ভুল পাসিং, ক্ষিপ্রতা এবং আক্রমণাত্মক খেলার স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা। তবে এটা তৃণমুল পর্যায় থেকেই শুরু করতে হবে। ফুটবলের নিয়মকানুন এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যা সব সময় আক্রণাত্মক ও ছন্দময় খেলাকে উৎসাহিত করে এবং অহেতুক সময়ক্ষেপন, খারাপ আচরণ ও ফাউল কঠোরভাবে দমন করে। প্রতিটি খেলোয়াড়কে শুধু শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে বল নিয়ন্ত্রণ, নিখুুঁত পাসিং, ড্রিবলিং, ক্ষিপ্রতা এবং ওয়ান-টু পাস ইত্যাদি শেখতে হবে। পাশাপাশি ডিফেন্স-নির্ভর বা ‘পার্ক দ্য বাস'(বাস পার্কিং) কৌশলের পরির্বতে বল পজিশন বা দখলে রেখে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার মাসসিকতা গড়ে তোলতে হবে।
যদি এর ব্যত্যয় ঘটে এবং বর্তমানের মতো ফুটবলে অতিরিক্ত যান্ত্রিক কৌশলগত নির্ভরতা ও অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরনের ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে এক পর্যায়ে ফুটবলের মতো জনপ্রিয় ও নান্দনিক খেলা সাধারণ জনগণের না হয়ে অভিজাত শ্রেণির বিনোদনে পরিণত হবে।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ :deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
