আমার প্রাণের বিদ্যাপীঠ–‘বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চা বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। বিংশ শতাব্দী থেকে নীরবচ্ছিন্নভাবে জ্ঞানের আলো বিলিয়ে যাচ্ছে বিদ্যানিকেতনটি। এই স্কুলেই আমার শিক্ষার হাতেখড়ি। ১৯৬৯ সালের মাঝামাঝিতে এখানে প্রাথমিকে ভর্তি হই। তখন দেশব্যাপী বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলন তুঙ্গে। বাবার চাকরির সুবাদে আমরা সপরিবারে শ্রীমঙ্গল থেকে বদলী হয়ে ময়মনসিংহ শহরে আসি। আমাদের বাবা মোহাম্মদ শমসের খান সাহেব রেলওয়ে প্রকৌশ বিভাগে চাকরি করতেন। আমাদের বাসা ছিল ব্রহ্মপুত্র নদীর পশ্চিম পারে কেওয়াটখালী রেলওয়ে কলোনীতে। এই বিদ্যামন্দিরে আমি ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি পযর্ন্ত অধ্যয়ন করেছি। তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন নূর মোহাম্মদ স্যার। স্যার ছিলেন নিষ্ঠাবান, সৎ, সাহসী ও রাশভারি প্রকৃতির।
এই বিদ্যালয়ে ভর্তির প্রারম্ভিক পর্যায়ে সহপাঠি হিসেবে পাই–এনামুল, ইকবাল, জুয়েল, বাবু, মান্নান, গৌতম, সাদেক, বখতিয়ার, মশিউর, আলমগীর, ফিরোজ, নাসরিন, পারভিন, আসমা, রোজীসহ আরো অনেকে। ক্রমেই তাদের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। দুঃখজনক বিষয় হলো দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে অনেক সহপাঠির নাম এই মহূর্তে মনে করতে পারছি না।
আমাদের ক্লাস হতো স্কুলের আদাপাকা টিনসেড ঘরে। আমরা সহপাঠিরা পাশাপাশি বসতাম। একসাথে খেলা, পড়া এবং কখনো কখনো দুষ্টমি করার জন্য শাস্তিও ভাগ করে নেওয়া হতো। আমাদের ক্লাস টিচার ছিলেন সামছুন নেহার আপা-ভীষণ রাগি প্রকৃতির। ছাত্ররা পড়া না পারলে, বেত মারার পাশাপাশি কানও মলে দিতেন। মনোয়ারা আপা আমাদের বাংলা পড়াতেন। তবে তিনি সামছুন নেহার আপার মতো এতো রাগি ছিলেন না। আব্দুল মজিদ স্যার আমাদের অংক ও বিজ্ঞানের ক্লাস নিতে। পড়া না পারলে স্যার বেত মারার পাশাপাশি নীলডাউনও করাতেন। স্যার ছিলেন আমাদের নিকট সাক্ষাৎ যমদূত। স্যারের পড়ার ভয়ে মাঝেমধ্যে সহপাঠিরা মিলেমিশে স্কুল ফাঁকি দিয়ে বয়রা খেয়াঘাট দিয়ে শম্ভুগঞ্জচড়ে চলে যেতাম। সেখানে বনবাদাড়ে ঘুড়তাম। স্কুল ছুটির সঙ্গে সঙ্গে অন্যসহপাঠিদের সাথে মিলেমিশে সুবোধ বালকের মতো বাসায় চলে আসতাম।
দিলীপ কুমার ভৌমিক স্যার ইংরেজী ও সমাজবিজ্ঞান পড়াতেন। স্যার কখনো ছাত্রদের সাথে রাগারাগি করতেন না। শ্রেণি কক্ষে ভৌমিক ছিলেন জনপ্রিয় ও প্রাণবন্ত। মওলানা আব্দুস সাত্তার স্যার আমাদের আরবী-উর্দু ও ইসলাম ধর্মশিক্ষা পড়াতেন। স্যার ছিলেন রসিক ও প্রাণবন্ত। স্যার নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন। স্যার সুরেলা কন্ঠে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত পাঠ করতেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শোনতাম। মোহাম্মদ আলী স্যার মাঝেমধ্যে আমাদের ইংরেজী পড়াতেন। স্যার চমৎকার কবিতা আবৃত্তি করতেন। হাসিঠাট্টার মাধ্যমে স্যার শ্রেণিকক্ষ মাতিয়ে রাখতেন। মাঝেমধ্যে কাজী আব্দুর রশিদ স্যার ধর্মশিক্ষা ও সমাজবিজ্ঞান পড়াতেন। স্যারকে কখনো রাগারাগি করতে দেখিনি।
এখনকার মত তখন স্কুলের নির্দিষ্ট কোনো ড্রেস ছিল না, স্কুলব্যাগও ছিল না, এমনকি বাড়ি থেকে কোনো ধরনের টিফিনও দেওয়া হতো না। তখন আমরা সাধারণ পোশাক পরে বই গাদাগাদী করে কাধে বহন করে স্কুলে নিয়ে যেতাম। টিফিনের সময় বন্ধুরা মিলে স্কুলের সামনের টংঘর বা টিনসেডের চাদোকান থেকে বুট-বাদাম-মুড়ির মোয়া-পিয়াজু বা সিংগারা কিনে খেতাম। তবে মাঝেমধ্যে আশপাশের কারো গাছ থেকে পিয়ারা-জাম্বুরা বা আম পেরে খেতাম। আবার অনেক সময় টিফিনের দীর্ঘ সময় পার করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নং গেইট দিয়ে চলে যেতাম বেশ ভিতরে। সেখানে দেখতাম বিশালাকার গরু-মহিষ-ঘোড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ-পাখি ও গাছগাছালি। এসব দেখার পর আমাদের মনটা ভড়ে যেতো।
স্কুল ছুুুটির পর বন্ধুরা মিলে ব্রহ্মপুত্র নদীতে মনের আনন্দে গোসল করতাম। গোসলের সময় চলতো-লাইখেলা, ডুবসাঁতার, উল্টাসাঁতার, বাটারফ্লাই সাঁতারসহ আরো কতকি। তখন নদীতে সুশক বা ডনফিন দেখা যেতো। বর্ষাকালে নদীটি খরস্রোতায় পরিনত হতো।
বিকাল দিকে সহপাঠিদের সাথে কলোনীর মাঠে ডাংগুলি-দাঁড়িয়াবান্দা-কবা ডি খেলা খেলতাম। এছাড়াও জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলতাম। তখন চামড়ার ফুটবল ছিল আমাদের নিকট স্বপ্নের মতো ব্যাপার!! তখন আমরা অল্পতেই তুষ্ট থাকতাম। এভাবেই আমাদের দিনগুলো অতিবাহিত হতো।
আমাদের সময় যেসকল সম্মানীত শিক্ষক মহোদয়গন বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ–এ শিক্ষকতা করতেন, তারা হলেন–ওমর আলী স্যার, তাজুল ইসলাম স্যার, আব্দুর রাজ্জাক স্যার, সিরাজুল ইসলাস স্যার, আনসার আলী স্যার, ললিত মোহন স্যার, মওলানা শহিদুল্লাহ স্যার, আব্দুল লতিফ স্যার, বিমল বড়ুয়া স্যারসহ আরো অনেকে। তারা জুনিয়র ও হাইস্কুল সেকশনে শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। তবে প্রাইমারী সেকশনের কোনো শিক্ষক ছুটি গেলে
তদস্থলেও পড়াতেন। এসব সম্মানীত শিক্ষকরা কঠোর শাসনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরকে নিজ সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। স্কুলের সার্বিক পরিবেশ তখন খুব সুন্দর ছিল। স্কুলের প্রতিটি শিক্ষক ছিলেন-ন্যায়পরায়ন, নিষ্ঠাবা ন, নির্লোভ, সাহসী, অমায়িক ও ছাত্রদের প্রতি যত্নবান। সেইদিক দিয়ে আমরা ছিলাম খুবই ভাগ্যবান।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ–এর ইতিহাস অধ্যয়ন করে অবগত হওয়া যায় যে, ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রাইমারী স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। প্রায় দশ বছর পর এটি জুনিয়র স্কুলের মর্যাদা লাভ করে। ১৯৬২-৬৩ সালে হাইস্কুলের মর্যাদা লাভ করে। তবে ১৯৭৬ সালে হাইস্কুল সেকশন পূর্ণ সরকারিকরন হয়। তবে ১৯৭৬ সালের আগ পর্যন্ত হাইস্কুল সেকশনের ব্যয়নির্বাহ হতো বিভিন্ন লোকের অনুদানের টাকা দিয়ে। শুধুমাত্র রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের লেখাপড়ার সুবিধার্থে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে কালেরপরিক্রমায় এই নিয়মের পরিবর্তন ঘটেছে। এখন এই প্রতিষ্ঠান মেধাবী সকল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে এখন পর্যন্ত লেখাপড়া-খেলাধুলা-গানবাজনায় এই প্রতিষ্ঠান বৃহত্তর নাসিরাবাদ তথা ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে অদ্বিতীয়। এই প্রতিষ্ঠান অসংখ্য মেধাবীদের জন্ম দিয়েছে-আজ তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। রত্নগর্ভা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার জন্য ময়মনসিংহ জেলা ও এর আশপাশ এলাকার শিক্ষার্থীরা সব সময় মুখিয়ে থাকে।
আমাদের সময় বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ–এর শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য নিজস্ব কোনো মাঠ ছিল না। মরাখোল মাঠেই আমাদের স্কুলের বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। এছাড়া আন্তঃস্কুল ফুটবল ও বলিবল প্রতিযোগিতা এই মাঠেই অনুষ্ঠিত হতো। বরাবরই আমাদের স্কুল এই দুটি খেলায় চ্যাম্পিয়ান হতো। তবে গফুরগাঁও ও এডোয়াড স্কুলের মধ্যে যখন খেলা হতো, তখন তারা পরাজয় ঠেকানোর জন্য ভীষণভাবে ফাউল করতো! এক পর্যায়ে এটা ভয়াবহ মারামারিতে রূপ নিত! (চলবে)।
উল্লেখ: ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর স্কুলের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণীকায় এই লেখাটি ছাপানো হয়েছিল।
খায়রুল আকরাম খান
এসএসসি–১৯৮০ ব্যাচ
ব্যুরো চীফ : deshdorson.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
