প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু ১৯৭১ এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর–এই দশ মাস দেশে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে সরকারের তরফ থেকে সকল শিক্ষার্থীর টিউশন ফি মাফ করা হয় এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অটো প্রমোশন দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বইখাতা, শার্ট ও পেন্টের কাপড় ফ্রিতে দেওয়া হয়। এমতাবস্থায় আমাদের স্কুলের সবাই অটো প্রমোশনের বদৌলতে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তির্ণ হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্বর পাক-বাহিনী আমাদের স্কুলটি প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল। স্কুলের তহবিলে কোনো অর্থ ছিল না। তাই স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন জন্য ১৯৭২ সালের মার্চের শেষের দিকে তৎকালীন ‘সংবিধান পরিষদের’ সদস্য মোহাম্মদ ঈমান আলীর নিকট স্কুলের সিনিয়র ভাইয়েরা সাহায্যের আবেদন করেন। কিন্তু ঈমান আলী সাহায্য না করে তাদেরকে চরমভাবে অপদস্ত করে। ঈমান আলীর এহেন আচরণে স্কুলের সিনিয়র ছাত্ররা মর্মাহত ও বিচলিত হয়। অতঃপর স্কুলের সকল ছাত্ররা ঈমান আলীর এমন জঘন্য আচরনের প্রতিবাদে সমস্ত শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। শহরের সকল শিক্ষপ্রতিষ্ঠান তখন ছাত্রদের এই নায্য আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে। এতে আন্দোলন বেগবান হয়। আন্দোলন চলে এক নাগাদ তিন দিন পর্যন্ত। চতুর্থ দিন ঈমান আলী স্কুলের অ্যাসেম্বেলীতে এসে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং স্কুলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রায় ১৫ হাজার টাকা মঞ্জুর করে। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্কুলের সিনিয়র ছাত্র–নুরু ভাই, হিরু ভাই, বকুল ভাই, আরজু ভাই, মিলন ভাই, কাসেম ভাই, শাহ আলাম ভাই, শাহাবুদ্দিন ভাই, নজরুল ভাইসহ আরো অনেকে। স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
এই সার্থক আন্দোলনের পর পর স্কুলের সকল শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক সচেনতা সৃষ্টি হয়। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা , যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি, শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য নিজেদের ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সবাই একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর ‘স্কুল ছাত্রসংসদ’ নির্বাচনের কথা চিন্তাভাবনা করতে থাকে। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালের ১ ডিসেম্বর আমাদের স্কুলে ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে ছাত্রলীগ মনোনীত ‘ হিরু-বকুল পরিষদ ‘ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। এই নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন আশরাফুল ইসলাম হিরু ও জিএস নির্বাচিত হন শহিদুল ইসলাম বকুল। আর ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ জাসদ প্যানেল বিপুল ভোটে পরাজিত হয়।
এই বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মাত্র ১২ দিনের মহড়ায় কাঙ্গাল মুর্শিদ আলমের বিখ্যাত রম্য নাটক ‘ আম চোরের বিচার ‘ স্কুলের আদাপাকা টিনসেড ঘরে মঞ্চস্থ হয়। স্কুলের সব টেবিল সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। মঞ্চের পেছনের ও উভয় পার্শ্বের পর্দা তৈরি করা হয়েছিল বিভিন্ন বাসা থেকে সংগ্রহকৃত মহিলাদের শাড়ি দিয়ে। আব্দুল মজিদ স্যার ও উমর আলী স্যার যৌথভাবে নাটকটির নির্দেশনার দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেছিলেন। এই নাটকে উমর আলী স্যার গ্রাম্য মোড়লে চরিত্রে ও বিমল বড়ুয়া স্যার গ্রামের অন্ধ কৃষকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। নাটকটি অত্র এলকায় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল!!
স্কুলের এসব ঘটনা আজও আমাকে রোমাঞ্চিত করে। এসব ঘটনার কথা মনে হলে আমি স্মৃতিকাতর হয়েপরি, ফিরে যাই সেই ১৯৬৯-৭৩ সালের দিকে।
বাংলদেশের মধ্যাঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গৌরবের প্রতীক বৃহত্তর মোমেনশাহী বা ময়মনসিংহ জেলার ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’। প্রায় ১০০ বছর ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। চলিত ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর এই বিদ্যাপীঠটির ১০০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শত শত শিক্ষার্থীর সমাগম ঘটবে এই বিপুল সমারোহে। অনেকেই এই জমকালো আয়োজনে তাদের হারানো বন্ধুদের খোঁজে পাবে। আমার দৃঢ় বিশ্বস আজ দীর্ঘ ৫০ বছর পর এই বিপুল সমারোহপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমিও আমার হারানো সাথীদের সন্ধান পাবো। আমি ধৈর্য ধরে সেই মাহেন্দ্রক্ষনের প্রতীক্ষায় রইলাম। (সমাপ্ত)
খায়রুল আকরাম খান
এসএসসি–১৯৮০ ব্যাচ
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
