এই যানজট স্বাভাবিক হতে প্রায় আদা ঘণ্টা সময় লেগে যায়। প্রায় ৫.৩০ মিনিটে আমরা শহীদ শহিদুল্লাহ কায়সার রোড হয়ে ট্রাং রোডের পূর্বদিকে অবস্থিত ‘ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’ মাঠে পৌঁছি ; এই প্রতিষ্ঠানটি ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মহাকবি নবীনচন্দ্র সেন। বিদ্যালয়টি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অবিভক্ত পাকিস্তান শাসনাসলে সাত বার সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের খেতাব অর্জন করেছিল। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক জহির রায়হান, বিশিষ্ট সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার, বিশিষ্ট নাট্যকার সেলিম আলদীন ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন।

ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও ফেনী সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ
ঐতিহাসিক ভবনটি দুটি দেখার জন্য ফেনী শহর থেকে প্রচুর লোক এখানে আসেন। বিকালদিকে এই বিশাল মাঠে স্থানীয় যুবকরা খেলাধুলে করেন। বয়স্করা সকাল ও বিকাল দিকে কলেজ চত্বরে হাঁটাহাঁটি করতে আসেন। স্থানীয়রা সপরিবারে সময় কাটানো জন্য বিকাল দিকে এখানে আসেন। আর এই লোকসমাগমকে কেন্দ্র করে এখানে চলে চিনাবাদম, বিস্কুট, চকলেট, ঝালমুড়ি, ফুচকা, চা-কফি ও আইসক্রিমের জমজমাট ব্যবসা।
ফেনী কলেজের ঐতিহাসিক আঙ্গিনায় আমরা অবস্থান করছি ২০-২৫ মিনিটি হতে চলছে। এই চত্বরের দক্ষিণ পার্শ্বে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন মানুষের আনাগোনা দেখছি ও মাঠে ছেলেদের ফুটবল খেলা উপভোগ করছি। এমন সময় আচমকা দেখা হয় আমার অতিপরিচিত সফিকুর রহমান বাবলুর সাথে। তার গ্রামের বাড়ি ফেনী শহরের কাছাকাছি, গ্রামের নাম ‘ধলিয়া’। সে এলাকায় ব্যবসা করে। ৭০ এর দশকে বাবলুরা ও আমরা আখাউড়া রেলওয়ে পশ্চিম কলোনীতে থাকতাম। আমাদের উভয়ের পিতা রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগে চাকরি করতেন। কথা প্রসঙ্গে বাবলু আমাকে জানালো, সময়-সুযোগ পেলে সে সপরিবারে এখানে ঘুরতে আসে।
এইদিকে ব্যাপসা গরম শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে , মূষলধারের বৃষ্টি হবে। এমন পরিস্থিতে বাবলুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তরিগরি করে ঐতিহাসিক ‘রাজারঝি দীঘি দেখার জন্য আমরা রাস্তা পার হয়ে পশ্চিমদিকে রওয়ানা দেই।
নবীনচন্দ্র সেন লাইব্রেরীর পেছনেই অবস্থিত রাজারঝির দীঘি। কিন্তু দীঘির পাড়ে যাওয়ার রাস্তাটি পেতে আমাদের বেশ সমস্যা হচ্ছিল। কারণ দীঘির পূর্বদিকের পুরোটাই স্থানীয় হকাররা দখল করে রেখেছেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাস্তাটি পাই এবং ওই রাস্তা দিয়ে রাজারঝির দীঘির পূর্ব পাড়ে পৌঁছি।
এই দীঘিটি প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো। এই দীঘির মোট আয়তন ১০.৩২ একর। এর চারপাশে ওয়াক-ওয়ে, পাকাঘাট ও বসার স্থান রয়েছে। স্থানীয়রা প্রতিদিন সকালে শরীরচর্চা ও বিকেলে অবসর কাটাতে এখানে আসেন। এই দীঘিটি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এর চারপাশে রয়েছে-ফেনী সদর থানা, ফেনী কোর্ট মসজিদ, ফেনী অফিসার্স ক্লাব ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন। জনশ্রুতি আছে, ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশের একরাজা তার কন্যার অন্ধত্ব দূর করার মানসে আজ থেকে প্রায় ৭শ বছর পূর্বে এই দীঘিটি খনন করে ছিলেন। স্থানীয় ভাষায় কন্যাকে ‘ঝি’ নামে ডাকা হয়, যা অনুসারে এটিকে রাজারঝি দীঘি নামে ডাকা হচ্ছে। এই দীঘির অপর নাম ‘রাজনন্দিনী দীঘি’। এই দীঘির পারে ১৮৫৭সালে ফেনী মহকুমার দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ১৯৮৪ সালে ফেনী জেলা হওয়ার পর এর প্রশাসনিক কার্যালয়গুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভবনগুলো এখনো পরিত্যক্ত হিসেবে পড়ে রয়েছে।
এখানে এসেছি প্রায় আদা ঘণ্টা হলো-চারপার্শ্বে লোকেলোকারণ্য। অতি উল্লাসের সাথে চারদিকে তাকিয়ে দেখছি-কেউ বন্ধুদের সাথে গল্প করছেন, কেউ টলটলে পানিতে স্পিটবোটে ঘুরছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। আর বাচ্চারা দীঘির চত্বরে ছোটছুটি করছে।
এইদিকে পশ্চিম আকাশে সূর্য পুরোপুরি অস্ত গিয়েছে। আকাশে লালচে-সোনালী রঙ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আশপাশের কোলাহল কিছুটা কমে এসেছে। দলবেঁধে পাখিরা তাদের বাসায় ফিরছে। এসময় মসজিদগুলো থেকে ভেসে আসছে মাগরিবের আজানের মধুর ধ্বনি। এই গোধূলি বেলায় বাসায় ফেরার জন্য রাজারঝি দীঘির পাড় ত্যাগ করে আস্তে আস্তে পূর্বদিকে অগ্রসর হতে থাকি। অতঃপর কোর্ট মসজিদের গেইট দিয়ে বের হয়ে ট্রাং রোডের দক্ষিণ দিকে এগোতে থাকি।

ফেনীর পৌরসভা ভবন
চরাদিক বৈদ্যুতিক আলোতে পুরো শহর এমন চিত্রাকর্ষক ঝলমল করছে, যেন আমরা মালয়েশিয়ার পেনাং শহরের রাস্তায় হাঁটছি। আমরা ধীরে ধীরে হেঁটে ফেনী সরকারি কলেজের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত দ্বিতল বিশিষ্ট ‘ফেনী পৌরসভার’ ভবনের সমনে এসে থামি। ভবনটির ভিতর ও বাহির বিদ্যুতিক আলোয় উদ্ভাসিত। দেখতে বেশ চমৎকার লাগছে। চতুর্দিকে পরিবেশ বেশ মনমুগ্ধকর। ১৯৫৮ সালে এই পৌরসভা গঠিত হয়েছিল।এটি বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মধ্যে অন্যতম এবং ১৮ টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। বর্তমানে ফেনী পৌরসভার মোট আয়তন ১০.৫০ বর্গমাইল।
এই পৌরভবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত ‘আপ্যায়ন টাওয়ার’-সেখানের আঙ্গিনায় রয়েছে একটি কৃত্রিম ঝর্ণা, কিন্তু দীর্ঘ দিন যাবৎ এটি নষ্ট। ওই উঁচু ভবনের চারতলায় রয়েছে ‘স্টেট অফ ফুডস’ নামে একটি ফাস্টফুডের দোকান। এইদিকে ক্ষিধেয় আমাদের পেট চুঁ-চুঁ করছে। তাই ক্ষুধা নিবারণের জন্য আমরা সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠে রেস্তোরায় যাই এবং কিছু হালকা খাবারের অর্ডার দেই। হোটেলটির পরিবেশ বেশ নিরিবিলি। এখানে এসে দেখলাম অনেকেই সপরিবারে এসেছেন কোলাহলহীন পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানো জন্য।

স্টেট অব ফুডস-এর প্রবেশদ্বার
এখানকার স্টাফরা বেশ চটপটে-কাস্টমারের প্রতি তারা যথেষ্ট খেয়াল রাখেন। প্রায় ১০-১৫ মিনিট পর ওয়েটার গরম গরম খাবার নিয়ে আসেন-আমরা তৃপ্তির সহকারে খাওয়ার সম্পন্ন করে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিচে নামার জন্য সিঁড়ির বদলে ক্যাপসুল লিফটে গিয়ে ওঠলাম। চতুর্দিকে তাকিলে দেখলাম নিয়নবাতির আলোর ঝলকানিতে পুরো শহর ঝলমল করছে। লিফট থেকে পুরো ফেনী শহরকে কুয়ালালামপুর শহরের মতো লাগছিল। মনে হচ্ছে, আমারা কুয়ালালামপুরের টাইমস্কয়ার শপিংমল থেকে শপিং করে বাসায় ফিরছি!
এই ভবন থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অসহ্য গরম লাগছিলো। হঠাৎ মেঘমুক্ত আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে-মেঘের গর্জন শুরু হয়েছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। চারদিকে শুরু হয়েছে হুড়াহুড়ি। নিশ্চিত আজ প্রবলবেগে বৃষ্টি হবে। এমতাবস্থায় ফেনী শহর ঘুরাঘুরি অসমাপ্ত রেখে অটোরিকশা যোগে দ্রুত জহুর হোসেন চৌধুরী সড়কস্থ ‘হক মঞ্জিল’-এ প্রত্যাগমন করি। সারাদিন অনেক ছুটাছুটির কারণে বেশ পরিশ্রান্ত হয়েপরি। অতঃপর রাত্রির খাবার শেষ করে ঘুমিয়ে পরি। (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com