সোমবার বিকাল ৫:৫৩, ১৯শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ. ৩রা আগস্ট, ২০২০ ইং
প্রতিবেদন
গরুর চামড়ার গোশত অনেক সুস্বাদু ও পুষ্টিকর অথৈ জলে ভাসছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিম্নাঞ্চল (ভিডিও) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফেন্সিডিলসহ আটক ত্রিমু‌খী দু‌র্যো‌গেও জ‌মে উঠে‌ছে ঐ‌তিহ‌্যবাহী না‌জিরপুর কুরবা‌নী হাট ব্রাহ্মণবাড়িয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের হার্ট অ্যাটাক! দুর্গাপু‌রে কে‌ন বাড়‌ছে আত্মহত‌্যা, প্র‌তিকার কী? সাংবাদিক সম্মেলনে গোঁজামিল বক্তব্য: ফেঁসে গেলেন ডাঃ সাঈদ শাহেদের আরেক নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডাক্তার সাঈদ করোনায় মারা গেলেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন মারা গেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা মারা গেলেন কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর

নতুন ঘোষণা আসছে খালেদা জিয়ার -আলাল

মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল

চায়ের আমন্ত্রণে সাড়া না দেয়ার বিষয়ে নেত্রীর সঙ্গে আমি একমত। কেননা সেটি ছিল এমন যে আসো মামা তুমি আর আমি দেশটা ভাগ করে খাই। সেটা ছিল ক্ষমতা ও মন্ত্রিত্বের ভাগাভাগি ও দর কষাকষির একটা প্রস্তাব। -আলাল

জাকির মাহদিন : কী উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে জড়ালেন?

সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল : রাজনীতিতে জড়ানোর পেছনে মন্ত্রী-এমপি হওয়ার সামান্যতম শখ নেই। ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত যা দেখেছি তাতে মনের মধ্যে চরম একটা বিদ্রোহীভাব কাজ করেছে। এরপর জিয়ার আদর্শ ও জীবনাচার খুব কাছ থেকে দেখে মনে হল তার মধ্যে দলমতের উর্ধ্বে চিন্তা, দেশপ্রেম, নির্লোভ-নিরহংকার একটি সত্তা আছে। তার খালকাটাসহ ঊনিশ দফা কর্মসূচি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এসব দেখে মনে হল দেশটা যে চেতনা নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল সে চেতনার ভিত্তিতে অন্তত একজন ভদ্রলোক কাজ শুরু করেছেন।

জাকির মাহদিন : তখন আপনার বয়স কত ছিল, কোথায় ছিলেন?

মোয়াজ্জেম আলাল : ১৯৭১ সালে একবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। স্বাধীন বাংলাদেশে সেটি বাতিল হলে আবার ৭২ সালে দিয়েছি। বরিশালে ছিলাম। বয়স ১৮/২০ হতে পারে।

জাকির মাহদিন : এ পথে আপনার গুরু বা অগ্রগামী ব্যক্তি কে?

মোয়াজ্জেম আলাল : গুরু সরাসরি জিয়াউর রহমান। মাঝখানে সেতুবন্ধনের কাজটি করেছেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস। জিয়া ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথমেই যে একটি অলিখিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশা, তথন বরিশালে আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে তিনি বলেছিলেন কিছু ভাল ও মেধাবী যুবক-তরুণকে সংগঠিত করতে।

জাকির মাহদিন : শুরুতে একটি রাজনৈতিক দলের ত্যাগ, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। এর প্রতিষ্ঠাতা, প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের গুণ-বৈশিষ্ট্য সমাজকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু যখন এরা আত্মসমালোচনার পরিবর্তে নিজেদের গুণগান আর চামচামী করাই একমাত্র কাজ মনে করে তখন কি দল এবং নেতাকর্মীরা ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাসে ভর করে লাইনচ্যুত হয় না? যেমন আজ আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবকে নিয়ে এবং আপনারা জিয়াকে নিয়ে যা করছেন?

মোয়াজ্জেম আলাল : আপনার এ কথার সঙ্গে আমি একমত না। পরিস্থিতির ভিন্নতা আছে। জিয়ার জীবিতকালে কেউ গুণকীর্তন করতে পারেনি। আমি নিজে এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী। একবার বরিশালে সাধারণ ও পেশাজীবী মানুষদের নিয়ে একটি সমন্বয় সভা করছিলেন, বরিশাল জিলা স্কুলের অডিটরিয়ামে। সেখানে মুসলিম লীগের একজন নেতা যিনি পাকিস্তান আমলে এমপিএ ছিলেন, সেখানে দাঁড়িয়ে জিয়াকে জাতির আলোকবর্তিকা, জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি বিশেষণ দিয়ে বক্তব্য শুরু করেছিলেন। জিয়া এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধমক দিয়ে বসিয়ে দিয়ে বললেন, বন্ধ করুন এসব। এগুলো করেই আপনারা আগের যারা ছিল তাদের ক্ষতি করেছেন, দেশের ক্ষতি করেছেন। কাজের কথায় আসেন। বলেন বরিশালে কি সমস্যা? পুরনো জেলা এটা, ব্রিটিশ আমলের জেলা।

প্রশ্ন : শুরুতে একটি রাজনৈতিক দলের ত্যাগ, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। এর প্রতিষ্ঠাতা, প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের গুণ-বৈশিষ্ট্য সমাজকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু যখন এরা আত্মসমালোচনার পরিবর্তে নিজেদের গুণগান আর চামচামী করাই একমাত্র কাজ মনে করে তখন কি দল এবং নেতাকর্মীরা ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাসে ভর করে লাইনচ্যুত হয় না? যেমন আজ আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবকে নিয়ে এবং আপনারা জিয়াকে নিয়ে যা করছেন?

বিদ্যুতের ব্যাপারে একজন গ্রাহক অভিযোগ করলে তিনি পিডিবির সুপারেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারকে দাঁড় করিয়ে জানতে চাইলেন এর সমাধান কী? মাইক চলে গেল তার কাছে। মোটকথা জিয়াউর রহমান শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগ থেকেই শিক্ষা নিলেন। তোষামুদি তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সুবিধাবাদিতা, দুর্নীতি পরিহার করেছেন, এমনকি আত্মীয়-স্বজনদেরও এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্রয় দেননি। তার একজন আত্মীয় সরকারি কর্মকর্তা একটা গাড়ি চালাচ্ছিলেন যার তিনি প্রাপ্য না, খবর পেয়ে সাথে সাথে গাড়ি প্রত্যাহার করে তাকে ঢাকা থেকে বদলি করেছেন। জিয়ার এসব ঘটনা ব্যাপকভাবে জনগণ জানতে পেরেছে তার নিহত হবার পর। আগে বই-পুস্তক ছিল না, আর তিনি নিজের প্রশংসা কখনোই পছন্দ করতেন না। তোষামুদির প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি এর আগের রাজনৈতিক দলগুলোতে দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি একটি নতুন পথ রচনা করেছিলেন।

সুতরাং এক্ষেত্রে দুটি দলকে একই মাপকাঠিতে বিচার করলে হবে না। তিনি কোনো আত্মীয়-স্বজনকে কাছে ঘেষতে দিতেন না। আমরা দেখেছি জিয়ার নিজের পোশাক কাটছাট করে তারেক ও আরাফাত পরতেন। বিশাল এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে কোথাও তার নামে পাঁচকাঠা জমি নেই, ব্যাংকে কোনো টাকা নেই একজন রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও।

জাকির মাহদিন : তরুণ বয়সে রাজনীতিতে জড়ানোর পেছনে আপনার যে সৎ ইচ্ছা অনুভূতি কাজ করেছে, এরপর যখন আজ এ পর্যায়ে এসে আপনি গতানুগতিক অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও আওয়ামী লীগের মতোই দলের প্রতিষ্ঠাতার গুণগান গেয়েই সময় পার করেন, এসব কি জাতির বর্তমান সংকট উত্তরণে কোনো ভূমিকা রাখে?

মোয়াজ্জেম আলাল : এতে সংকট বাড়ছে। সমস্যা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। নেতৃত্বের ‘পূজা’ না করে ‘অনুসরণ’ করা উচিত। জীবনের কর্মকাণ্ড দিয়ে একজন মানুষকে বিচার করা সম্ভব। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান নিঃসন্দেহে বড় নেতা, জাতীয় নেতা, তাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তাকে এমন দেবতাতুল্য আসনে বসানোর চেষ্টা হচ্ছে, সংবিধানে, পাঠপুস্তকে, সবজায়গায় বড় বড় পাথরের মূর্তি বানিয়ে তার এবং তার পরিবারের নামকরণে পূজা হচ্ছে। মনে হচ্ছে তিনি যেন একজন অতিপ্রাকৃতিক কিছু। এসব করে শেখ মুজিবের চেতনাকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে তার সম্পর্কে অনেক ভুল ও অসত্য তথ্য দেয়া হয়েছে। এসব করে আসলে শেখ মুজিবকে অসম্মান ও খাটো করা হচ্ছে। যদিও তার নেতৃত্বের গুণাবলী অস্বীকারের পথ নেই। আর জিয়ার বিষয়টা হচ্ছে, তার জীবনাচার ও রাষ্ট্রের কল্যাণে চিন্তাভাবনা নিরবে ও কাজের মাধ্যমে অনুসরণ করলেই আমরা মনে করি তাকে যথার্থ সম্মান করা হবে।

জাকির মাহদিন : আপনাদের বক্তব্য-বিবৃতিগুলোতে সমস্যার বিশ্লেষণ নাকি অন্য দলের সমালোচনা প্রাধান্য পায়?

মোয়াজ্জেম আলাল : সমস্যার বিশ্লেষণই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। মাত্র সাড়ে তিন বছরের একটি দল রেখে গিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। সেই সাড়ে তিন বছরের দলটি তেষট্টি বছরের পুরনো একটি দলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমানতালে এগোচ্ছে। জনপ্রিয়তায় দুটি দল কাছাকাছি। তবে গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধ্বস নেমেছে এসব বাড়াবাড়ির কারণে। বিএনপির উচিত এ জাতীয় বাড়াবাড়ি না করে জাতীয় সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়া। জাতীয় সমস্যার সমাধান হলেই জাতি বুঝবে শহীদ জিয়ার দল সঠিক আদর্শেই পথ চলছে। এক্ষেত্রে তোষামুদি ও দোষারোপের কুসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সমস্যার গভীরে ঢুকে বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য অনেকগুলো কাজ আমরা করেছি।

প্রশ্ন : তরুণ বয়সে রাজনীতিতে জড়ানোর পেছনে আপনার যে সৎ ইচ্ছা অনুভূতি কাজ করেছে, এরপর যখন আজ এ পর্যায়ে এসে আপনি গতানুগতিক অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও আওয়ামী লীগের মতোই দলের প্রতিষ্ঠাতার গুণগান গেয়েই সময় পার করেন, এসব কি জাতির বর্তমান সংকট উত্তরণে কোনো ভূমিকা রাখে?

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর বেগম জিয়া সরকারকে সবরকম সহযোগিতার কথা বলেছেন এবং গত সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কমিটমেন্ট বাস্তবায়নেও আমরা সহযোগিতা করব। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জনগণের আটশত কোটি টাকা চুরির বিষয়েও আমাদের একই মনোভাব। নেত্রীর নির্দেশে সারাবিশ্বে যোগাযোগ করে আমরা একটা বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট তৈরি করে পরবর্তী সহযোগিতার আশ্বাসসহ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রণালয়ের সচিব ও অর্থমন্ত্রীকে দিয়েছি। আমরা প্রকৃতপক্ষইে জাতীয় সমস্যার সমাধান চাই, দলাদলি কিংবা রেষারেষি করে আওয়ামী লীগরে ঘাড়ে দোষ চাপানো নয়। কিন্ত সরকার আমাদরে প্রস্তাবকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে জাতরি সমূহ ক্ষতি হচ্ছে।

জাকির মাহদিন : সরকার নিজের ক্ষমতা নগ্নভাবে টিকিয়ে রাখতে বিরোধী দলগুলোর সহযোগতিার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করবেই। সেক্ষেত্রে জাতির চূড়ান্ত ক্ষতি এড়াতে বিকল্প পথ হিসেবে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরের চিন্তাশীল, কল্যাণকামী, বুদ্ধিজীবী এবং খ্যাত-অখ্যাত বিভিন্ন যোগ্যদের ঐক্য ও সমন্বয়রে একটি শক্তিশালী প্লাটফরম গড়তে আপনাদের ভূমিকা কী?

মোয়াজ্জেম আলাল : কিছুদিন আগে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে নেত্রী একটি নতুন ভিশন দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন প্রতিহিংসা, রেষারেষি, বিদ্বেষ পরিহার করে জাতীয় পর্যায়ের সমস্ত পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের মেধাসম্পন্ন লোক এবং আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে আমরা এ জাতিকে একটি রেঙ্গুনেশনে পরিণত করতে চাই। যেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থাকবে, সকল ধর্মের মানুষরা থাকবে, আন্তধর্মীয় সংলাপ হবে, পুরোহিত, ইমাম, পাদ্রী, যাজক, ভিক্ষুসহ সব ধর্মের প্রতিনিধিত্ব ও আন্তসংলাপ নিশ্চিত করা হবে। বিএনপির এসব মৌলিক চিন্তাধারা ও কর্মকা- অতিশীঘ্রই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নেত্রী নিজে জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন।

জাকির মাহদিন : নেত্রীর এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আগে মানবিক ঐক্য ও সমন্বয়ের সূত্রে আপনাদের মতো নেতাদের পক্ষ থেকে কোনো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি, রিহার্সেল বা এ জাতীয় কিছু নেই?

মোয়াজ্জেম আলাল : বর্তমান সরকারের সীমাহীন অযোগ্যতার কারণে সরকার সমর্থক অনেকেই এ মুহূর্তে সরকারের তীব্র সমালোচনা করছে। সুলতানা কামাল, ড. কামাল হোসেন, নুরুল কবির, আসিফ নজরুল, আফসান রহমান প্রমুখ। যদি সরকার আমাদের সহযোগিতার আহ্বানে সাড়া না দেয় তাহলে আমরা সরকার ও রাজনীতির বাইরের যোগ্যদের নিয়ে একটি বৃহৎ জাতীয় ঐক্য ও বিকল্প প্লাটফরম অবশ্যই গড়ে তুলব। এ লক্ষে সবার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত আছে। তবে সরকার যেভাবে হামলা-মামলা করে আমাদের ব্যস্ত রাখছে ও অহেতুক হয়রানী করছে, নেত্রীকে প্রতি সপ্তাহে হাজিরা দিতে বাধ্য করছে, তাতে আমরা জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষে কোনোই পদক্ষেপ নিতে পারছি না।

জাকির মাহদিন : যাদের নাম বললেন তাদের অনেকেই বিএনপি-জামাত ঘেষা বুদ্ধিজীবী। যেমন আসিফ নজরুল। আর আপনারা যারা হামলা-মামলার শিকার, এই দুঃসময়ে দলের বিকল্প নেতৃত্ব কোথায়, যারা দল-মত নির্বিশেষ একটি জাতীয় বৃহৎ ঐক্য গড়ে তুলবে? যে বৃহৎ ঐক্যের গণজোয়ারে সরকারের সব অন্যায় অত্যাচার ভেসে যাবে?

মোয়াজ্জেম আলাল : সুলতানা কামাল, ড. কামাল হোসেন, নুরুল কবিররা প্রচণ্ড রকমের আওয়ামী বা বামপন্থী বুদ্ধিজীবী। আর আসিফ নজরুল বিএনপিঘেষা হতে পারে তবে জামাতঘেষা নয়। যা হোক, বৃহৎ ঐক্যের বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমি একমত। এ নিয়ে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

জাকির মাহদিন : এই সময়ের রাজনৈতিক যে সংস্কৃতি, গতানুগতিক আন্দোলন সংগ্রাম, বক্তব্য-বিবৃতি যেগুলোতে কোনো তত্ত্ব নেই, বিশ্লেষণ নেই, কোনো গভীর দর্শন নেই, বিশাল বিশাল সমাবেশে কেবল ভাসাভাসা শব্দের ফুলঝুরি আর অন্যের সমালোচনা, এর দ্বারা কি তরুণ প্রজন্মের সঠিক চেতনার বিকাশ ঘটবে কিংবা অন্ততপক্ষে অশুভ মানসিকতা পরিবর্তিত হবে?

মোয়াজ্জেম আলাল : হবে না। নতুন প্রজন্ম কোনো পুরনো ইতিহাস ঘাটাঘাটি চায় না। একই সঙ্গে একের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো, মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে কেবল সরকারের সমালোচনা কিংবা সরকারকর্তৃক বিরোধী দলকে সমালোচনা তরুণ প্রজন্ম আদৌ পছন্দ করে না। তারা কাজে বিশ্বাসী এবং কাজ শুরু করতে যা দরকার তাই শুনতে চায়। সুতরাং নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সমর্থন ও সহযোগিতা পেতে আমাদের ভালো কাজের উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। গতানুগতিক ওসব বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে নয়।

প্রশ্ন : এই সময়ের রাজনৈতিক যে সংস্কৃতি, গতানুগতিক আন্দোলন সংগ্রাম, বক্তব্য-বিবৃতি যেগুলোতে কোনো তত্ত্ব নেই, বিশ্লেষণ নেই, কোনো গভীর দর্শন নেই, বিশাল বিশাল সমাবেশে কেবল ভাসাভাসা শব্দের ফুলঝুরি আর অন্যের সমালোচনা, এর দ্বারা কি তরুণ প্রজন্মের সঠিক চেতনার বিকাশ ঘটবে কিংবা অন্ততপক্ষে অশুভ মানসিকতা পরিবর্তিত হবে?

জাকির মাহদিন : ‘বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে নয়’ ঠিক। কিন্তু ‘ভালো কাজের’ ইচ্ছেটা তরুণ প্রজন্মের অন্তরে কীভাবে তৈরি হবে? সেখানে কি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও যৌক্তিক সমাধানধর্মী বক্তৃতা বিবৃতির প্রয়োজন নেই?

মোয়াজ্জেম আলাল : জনসভাগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও মন-মানসিকতার লোক থাকায় মূল নেতা বা নেত্রী ছাড়া অন্যদের বিশ্লেষণমূলক আলোচনা শোনার ইচ্ছে বা করার পরিবেশ থাকে না। এটা একটা কঠিন বাস্তবতা। সেক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন সেমিনার ইনার হাউজ, প্রেসক্লাব বা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে করে থাকি। সেটা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না বরং জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যে সমস্যা সমাধানের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কী হতে পারে। প্রস্তাব আকারে আমাদের চিন্তাভাবনা পেশ করছি , অন্যদের চিন্তাভাবনা, প্রস্তাব ও পরামর্শ নিচ্ছি। এটাই হচ্ছে যুগোপযোগী পদক্ষেপ।

জাকির মাহদিন : ঘরোয়া সভা-সেমনিারগুলোতে বিশ্লেষণমূলক ও সমাধানধর্মী আলোচনার যে পূর্বশর্ত- ব্যাপক পড়াশুনা, জ্ঞান-গবেষণা, দলীয়গণ্ডির বাইরে চিন্তাভাবনা, অনুসন্ধান ও সময়- এসব কি এখনকার রাজনৈতিক লিডারদের আছে?

মোয়াজ্জেম আলাল : এটা আসলে মন-মানসিকতার ব্যাপার। পর্যাপ্ত সময় সুযোগ কারো জীবনেই থাকে না, তা বের করে নিতে হয়। ইচ্ছে থাকলে জেলখানায় বসেও জ্ঞান আহরণ করা যায়। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক লিডারদের সে ইচ্ছে একেবারেই নেই। এক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ মনোযোগী হওয়া দরকার এবং আমি মনে করি এই ইচ্ছে ও সময়-সুযোগ যাদের আছে তাদেরকে বড় বড় দলে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। শুধুমাত্র দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দিয়েই যেন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পূর্ণ করা না হয়। বিশ্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিবর্তিত। জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে সেই পরিবর্তনের সঠিক জায়গাগুলোতে পৌঁছুবার জন্য বয়স্কদের চেয়ে তরুণ এবং যুবনেতৃত্বের আগ্রহই বেশি। তাই এদের সুযোগ দিলে কাজ অনেক এগিয়ে যায়।

জাকির মাহদিন : আপনি কি যথেষ্ট পড়াশুনা ও দলীয়গণ্ডির বাইরে চিন্তাভাবনা করেন?

মোয়াজ্জেম আলাল : জি, আমি চেষ্টা করছি এবং মহান আল্লাহর মেহেরবানীতে অল্প পড়লেই আজীবন মনে থাকে।

প্রশ্ন : ঘরোয়া সভা-সেমনিারগুলোতে বিশ্লেষণমূলক ও সমাধানধর্মী আলোচনার যে পূর্বশর্ত- ব্যাপক পড়াশুনা, জ্ঞান-গবেষণা, দলীয়গণ্ডির বাইরে চিন্তাভাবনা, অনুসন্ধান ও সময়- এসব কি এখনকার রাজনৈতিক লিডারদের আছে?

জাকির মাহদিন : আপনার দলীয় পদাধিকার বলে জাতি আপনার কাছ থেকে কী আশা করতে পারে?

মোয়াজ্জেম আলাল : মোটাদাগে বলি, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব আমাদের হাতে আসলে এবং আমি দায়িত্বশীল পদ পেলে- ১. পরিবেশ দূষণ ও গাড়ির হাইড্রোলিক হরণ বন্ধের ব্যবস্থা করব, ২. খাদ্যে ভেজাল রোধে প্রয়োজনে ফাঁসির বিধান রাখা হবে, ৩. বাংলাদেশের বিশাল অনাবাদী ও নতুন ভূখ-গুলোর পরিকল্পিত ব্যবহার- শিল্প-কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাস, আইটি পার্ক ইত্যাদি আলাদা আলাদা জায়গায় করব। এ জন্য সমস্ত চিন্তাবিদ ও সমাজতত্ত্ববিদদের একত্রিত করে পরামর্শ গ্রহণ এবং তাদের একটা স্পেশাল টিম গড়ে তুলব।

জাকির মাহদিন : ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় যাক বা না যাক, এখন আপনি যে অবস্থানে আছেন তা দিয়ে জাতির জন্য আপনি কতটুকু কী করতে পারেন?

মোয়াজ্জেম আলাল : এই অবস্থায় খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। আমি বিভিন্ন জায়গায় মুক্ত আলোচনা করি যদিও সেটা দলের বিপক্ষে যায়। আর চেয়ারপার্সন ও মহাসচিবের সঙ্গে দলীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোতে নিজেদের ভুলত্রুটিগুলো তুলে ধরি, তারা এসব অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনেন। নেত্রীকে এক্ষেত্রে অনেকটাই প্রভাবিত করতে পারি এবং তার একটি ভালো গুণ আছে, ভুল ধরে দিলে তিনি নিজেকে শোধরে নেন। ফোরামের বাইরে একান্তে কথা বলার সময় তিনি অনেক ভুলত্রুটি স্বীকার করেন, আবার আমাদের ভুলগুলোও ধরিয়ে দেন। তার কাছে অবাধে প্রবেশ করার সুযোগটা আমি সহজেই পাই।

জাকির মাহদিন : নেত্রীর গত সাত-আট বছরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে আপনি কতটুকু একমত, বিশেষ করে শেখ হাসিনার চায়ের আমন্ত্রণে সাড়া না দেয়ার বিষয়টি?

উত্তর : চায়ের আমন্ত্রণে সাড়া না দেয়ার বিষয়েও নেত্রীর সঙ্গে আমি একমত। কেননা সেটি ছিল এমন যে আসো মামা তুমি আর আমি দেশটা ভাগ করে খাই। সেটা ছিল ক্ষমতা ও মন্ত্রিত্বের ভাগাভাগি ও দর কষাকষির একটা প্রস্তাব। সুতরাং ব্যাপক জনগণের কল্যাণ ও অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের ভাগাভাগিতে আমরা নেই।

মোয়াজ্জেম আলাল : এমন সিদ্ধান্ত তো অনেকগুলো। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়া, সর্বশেষ ব্যাংকের চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারে সরকারকে সহযোগিতা করা ইত্যাদি। এসবে দ্বিমতের কারণ নেই। আর সেই চায়ের আমন্ত্রণে সাড়া না দেয়ার বিষয়েও নেত্রীর সঙ্গে আমি একমত। কেননা সেটি ছিল এমন যে আসো মামা তুমি আর আমি দেশটা ভাগ করে খাই। সেটা ছিল ক্ষমতা ও মন্ত্রিত্বের ভাগাভাগি ও দর কষাকষির একটা প্রস্তাব। সুতরাং ব্যাপক জনগণের কল্যাণ ও অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের ভাগাভাগিতে আমরা নেই। যদি এ ধরনের ভাগাভাগির মানসিকতা পরিহার করে রাষ্ট্রের কল্যাণে কোনো প্রস্তাব আমাদের কাছে আসে, তাহলে নেত্রী রাজি না হলেও আমরা জোর করে রাজি করাব ইনশাআল্লাহ।

জাকির মাহদিন : কিন্তু তারপরও সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে টেলিফোনে সরাসরি প্রস্তাব, সেটাকে প্রত্যাখ্যান করা কোনোভাবেই উচিত হয়নি।

মোয়াজ্জেম আলাল : প্রস্তাবটিকে ক্ষমতা ও মন্ত্রিত্বের ভাগাভাগিতে ব্র্যাকেটবন্দি করে ফেলা হয়েছিল। এটা জাতীয় নীতিমালার ভিত্তিতে করা হয়নি।

জাকির মাহদিন : জাতীয় নীতিমালার ভিত্তিতে আপনারা কোনো প্রস্তাব দিচ্ছেন?

মোয়াজ্জেম আলাল : আমরা সে সুযোগ পাচ্ছি না মামলা-হামলা-শাস্তির কারণে। তারপরও আমি একজন মানুষ হিসেবে দলের বাইরে এবং দলীয় চিন্তার উর্ধ্বে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্যাপক জনসমাজের তরুণ, যুবক ও অন্যান্যদের সঙ্গে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি একজন রেগুলার ব্লাড ডোনার। সন্ধানীর কার্ড হোল্ডার। বিগত পঁচিশ বছর ধরে মানবতার স্বার্থে রক্ত দিচ্ছি ব্লাডব্যাংকে। আমার দুই ছেলেও নিয়মিত রক্ত দেয়। আমি এবং আমার স্ত্রী দুজনেই মরণোত্তর চক্ষু দান করেছি স্ট্যাম্পে লিখে দিয়ে।

[বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল একজন ত্যাগী, নির্ভীক ও দক্ষ রাজনীতিক। তার বিভিন্ন বক্তব্য-বিবৃতির বিশ্লেষণী ক্ষমতা তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করে। তিনি বেগম খালেদা জিয়ার একজন অন্যতম আস্থাভাজন ব্যক্তি। মুখোমুখি হয়েছেন দেশ দর্শন সম্পাদক জাকির মাহদিন।]

ক্যাটাগরি: প্রধান কলাম,  সাক্ষাৎকার

ট্যাগ:

Leave a Reply