বৃহস্পতিবার সকাল ৬:৩২, ১৪ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ. ২৭শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং

মানুষের জন্য নদী

নদী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার পালন করা হয় বিশ্ব নদী দিবস। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘মানুষের জন্য নদী’। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয়েছে দিবসটি। যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে নদী রক্ষায় সচেতন করে তোলা।

দেশের নদী রক্ষায় কাজ করা ৭০টির বেশি সংগঠন, উদ্যোগ ও আন্দোলনের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্ব নদী দিবস উদযাপন পরিষদ গত শনিবার ‘অনলাইন মার্চ ফর রিভারস’ কর্মসূচি পালন করে।

নদী নিয়ে একটি বিশেষ দিবস পালনের প্রাথমিক তাৎপর্য এটাই বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নদীর ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহী, অনুপ্রাণিত ও সংবেদনশীল করে তোলা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভূখণ্ড, সভ্যতা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ, অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা, পরিবেশ-প্রতিবেশ গড়ে উঠেছে নদীর আশীর্বাদে; এমনকি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ের ক্ষেত্রে নদী পালন করেছে অনন্য ভূমিকা। এই বাংলাদেশের মানুষকে নদীর প্রতি সংবেদনশীল করে তোলার জন্য দিবস পালন খানিকটা হাস্যকর মনে হলেও এটাই দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা। যে নদী তার বুকের পলি তিল তিল করে জমিয়ে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে, তার প্রতিদান দূরে থাক দখলে, দূষণে, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ করে আমরা সেই নদী তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছি।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, আক্ষরিক অর্থেই জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীর মধ্যে বেষ্টিত থেকেও নদীর কথা মনে না রাখা। ফলে আমাদের নীতি ও কর্মে নদীর প্রেক্ষিত থাকে অনুপস্থিত। অথচ নদীমাতৃক একটি দেশে সব নীতি, চিন্তা ও তৎপরতার মূলে থাকতে হত নদী।

নদী দিবস পালনের আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেটিও স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আমরা যারা নানা মাত্রায় নদী, পানি বা পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, এ ধরনের দিবস ও সে উপলক্ষে কর্মসূচির ব্যবহারিক সুবিধাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ উপলক্ষে একত্র হওয়া, দেখা-সাক্ষাৎ, কথাবার্তার মধ্য দিয়ে পরস্পর চেনা-জানা হয়; আরও নানা বিষয়ে সেতু ও জানালা খুলে যায়।

এক সময়ের হাজার নদীর দেশ বাংলাদেশ কেমন আছে এমন প্রশ্ন করা হলে এক কথায় বলা চলে ভালো নেই সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা নদীর এই দেশটি। বর্তমানে দেশের নদ-নদীগুলো যৌবন হারিয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় এখন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। যৌবনহারা এসব নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে কার্যকর কোনো ওষুধ এখনো পাওয়া যায়নি।

নদীগুলোকে বাঁচানো না গেলে দেশকে একসময় বাঁচানো সম্ভব হবে না। কারণ নদীকে ঘিরে এক সময় গড়ে উঠেছিল দেশের প্রতিটি শহর, বন্দর, হাটবাজার, গঞ্জ। সেগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। নদীকে ঘিরে মালামাল পরিবহন ও যোগাযোগের সহজ উপায় ছিল পাল তোলা নৌকা। এখন এই নৌকার দেখা মেলা ভার। সময়ের বিবর্তনে যেটুকুবা নদী পারাপারের বাহন রয়েছে তা দখল করেছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা।

জলবায়ু পরিবর্তন, দখল, দূষণসহ নানা কারণে নদনদী অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে। বিলুপ্ত প্রায় এসব নদী নিয়ে বিস্তর লেখা হলেও সমাধানের কোনো সুনির্দিষ্ট পথ খুঁজে পাওয়া যায়নি। নদী নিয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকায় বছরের পর বছর ধরে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে খরা মৌসুমে তীব্র খরা আবার শীত মৌসুমে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে নদী স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছেনা। বৃষ্টিপাত কম হওয়া ও খরা মৌসুমে অপরিকল্পিত ভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।

এছাড়া ভারতের একতরফা নদী শাসনের ফলে নদনদী খাল বিল পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। প্রায় পাঁচ দশকে দেশ থেকে হারিয়ে গেছে কয়েকশত নদী ও হাজার হাজার খেয়া ঘাট। এখনো শতাধিক নদী যৌবন হারিয়ে ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। দিনের পর দিন পলি পড়ে ভরাট হয়ে নাব্যতা ও গভীরতা হারাচ্ছে দেশের নদীগুলো। প্রতি বছর দেশের নদ-নদীতে গড়ে জমা পড়ছে ৪ কোটি টন পলি। ফলে নৌপথ ছোট হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। গত ৫০ বছরে নৌপথের দৈর্ঘ্য কমেছে ১৯ হাজার কিলোমিটার। স্বাধীনতার আগে দেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার, এখন তা কমে মাত্র ৫ হাজারেরও নিচে এসে দাঁড়িয়েছে।

খননের অভাবে পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ অন্যান্য নদীগুলো এখন ধু-ধু বালুচর। এছাড়া দেশজুড়েই অব্যাহত রয়েছে নদী দখল ও দূষণ। ফলে কৃষি, জনস্বাস্থ্য, প্রাণী, উদ্ভিদ হুমকির মুখে পড়েছে। নদীকে ঘিরে যেটুকু উন্নয়ন হচ্ছে তা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। ফলে প্রাপ্তির ফারাক দিন দিন বাড়ছে।

নদীর সমার্থক শব্দগুলো হচ্ছে তটিনী, তরঙ্গিণী, সরিৎ ইত্যাদি। সাধারণত মিষ্টি জলের একটি প্রাকৃতিক জলধারা যা ঝরনা ধারা, বরফগলিত স্রোতে অথবা প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়ে প্রবাহ শেষে সাগর, মহাসাগর, হৃদ বা অন্য কোন নদী বা জলাশয়ে পতিত হয়। মাঝে মাঝে অন্য কোন জলের উৎসের কাছে পৌঁছানোর আগেই নদী সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। নদীকে তার গঠন অনুযায়ী শাখানদী, উপনদী, প্রধান নদী, নদ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। আবার ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে ছোট নদীকে একেক এলাকায় একেক নামে ডাকা হয়।

বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোতে প্রতি বছর ১ দশমিক ২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) ঘনমিটার পলি প্রবাহিত হয়। আর তার বড় অংশই নদীর তলদেশে জমা হয়ে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি করছে। ৪৮ বছরে নদীগুলোতে পলি জমেছে প্রায় ১৭৮ কোটি টন। পলির কারণে ইতিমধ্যে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৩০০ নদী। অধিক হারে পলি জমা, সংরক্ষণে অবহেলা, অবকাঠামো নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, জলবায়ু পরিবর্তন, খনন যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাবসহ নানা কারণকে এর জন্য দায়ী করা হয়েছে।

সাধারণত উঁচু ভূমি বা পাহাড় গিরিখাত থেকে সৃষ্ট ঝরনাধারা, বরফগলিত স্রোত কিংবা প্রাকৃতিক পরিবর্তন থেকে নদীর জন্ম। হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড় থেকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলরাশিতে এক ধরণের প্রচণ্ড গতি সঞ্চারিত হয়। ছুটে আসা এই দ্রুত গতিসম্পন্ন জলস্রোতে স্থলভাগ অতিক্রম করার সময় নদী নামে পরিচিত হয়। নদী যখন পাহাড়ি এলাকায় প্রবাহিত হয় তখন তার যৌবনাবস্থা বলা। এ সময় নদী ব্যাপক খননকাজ চালায় এবং উৎপত্তিস্থল থেকে নুড়ি, বালি, পলি প্রভৃতি আহরণ করে অতি সহজে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে।

নদী এভাবেই আবহমানকাল ধরে ভূপৃষ্ঠকে ক্ষয় করে চলেছে। তার এ কাজ শেষ হয় তখনই যখন সমস্ত নদী অববাহিকা ক্ষয় প্রাপ্ত হয়ে সমভূমি বা প্রায় সমভূমিতে পরিণত হয়। নদীকে ৩ অবস্থায় ভাগ করা হয়েছে। এর প্রথম অবস্থাকে বলা হয় যৌবন অবস্থা। দ্বিতীয় অবস্থাকে বলা হয় পরিপক্ব অবস্থা এবং তৃতীয় ধাপকে বৃদ্ধ অবস্থা বলা হয়।

যৌবন অবস্থায় নদীর প্রধান কাজ হল ক্ষয় এবং বহন। সাধারণত পার্বত্য অবস্থাটিই নদীর যৌবনকাল। এ সময় নদী বড় বড় পাথর বহন করে নিয়ে আসে। এসব পাথরের ঘর্ষণে নদীর তলদেশ ক্ষয় পেয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি করে। পার্বত্য অঞ্চলে নদীর ক্ষয় ক্রিয়ার ফলে গিরিখাত, ক্যানিয়ন এবং জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়। এরপর নদীর যে অবস্থানটি তাকে বলা হয় পরিপক্ব অবস্থা। এ অবস্থায় নদী একটু স্তিমিত হয়। ফলে নদীর বেগ ও বোঝা বয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও কমে যায়। সাধারণত নদী মধ্যস্থানে বা উপত্যকায় প্রবেশ করলে এই পরিপক্ব অবস্থা বোঝায়। এই অবস্থায় গিরিখাত, খরস্রোত, জলপ্রপাত প্রভৃতি আর দেখা যায় না।

সর্বশেষ অবস্থা হল বৃদ্ধা অবস্থা। নদীর বৃদ্ধ অবস্থায় বলতে যা বুঝায় তা হল, নদীর ক্ষয় করার ক্ষমতা একেবারেই কমে যায়। তবে ভাঙ্গার কাজ অল্পস্বল্প চলে। সাধারণত সমতল ভূমিতে নদীর এই অবস্থা হয়। এতে কোথাও কোথাও উঁচু ভূমি থাকতে পারে। এ সময় নদীর গতিমাত্রা এত কমে যায় যে, সামান্য বাধা পেলেই নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে। নদী এই অংশে খুব এঁকে-বেঁকে চলে। পথে পথে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় নদী বর্ষাকালে প্রায়ই দু’কূলে বন্যার সৃষ্টি করে। নদীর পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এর ফলে বালি ও পলি দুই তীরে ছড়িয়ে পড়ে। নদীর বুকে জেগে উঠে চর । তবে নদী সবসময় ঠিক এভাবে চলে না। মাঝে মাঝে ভূকম্পনের ফলে নদী আবার যৌবন পেতে পারে। এ ছাড়া অন্যান্য কারণেও নদীর তীব্রতা ও গতি বৃদ্ধি পেয়ে যৌবন ফিরে পেতে পারে। আমাদের দেশে যৌবনপ্রাপ্ত নদীর সংখ্যা গণনা করলে যোগফল হবে শূন্য এটা নিঃসন্দেহে বলা চলে। কারণ বাংলাদেশের নদীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এদেশের নদ-নদীর যৌবন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এদেশের নদীগুলোর এখন চলছে বৃদ্ধ অবস্থা। যে কোন সময় এগুলোর মৃত্যু হতে পারে।

বাংলাদেশে ঠিক কত নদী আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে তাদের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। নদী, উপনদী ও শাখানদীর সর্বমোট সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট মতদ্বৈধতা আছে। একটি নদী থেকে অসংখ্য নদী সৃষ্টি হয়েছে। আবার কোন কোন নদী থেকে খাল বা ছড়ায় পরিণত হয়েছে। এগুলোও প্রাকৃতিক নদীর অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের প্রধান নদী পাঁচটি নদীর নাম এলে প্রথমে বলতে হবে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, পশুর ও কর্ণফুলী। এরপর ধরা যায় তিস্তা, গড়াই, মধুমতী, রুপসা, আড়িয়াল খাঁ, কুমার, আত্রাই, কীর্তনখোলা, বিষখালী ইত্যাদি। এসব নদীর মধ্যে কোনটা বড় কোনটা ছোট বলা কঠিন। তবে অনুমান ও হিসাব কষে ছোটবড় মিলিয়ে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৭০০ নদী আছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বর্তমানে দেশের অধিক বিপদাপন্ন নদ-নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে সিরাজগঞ্জের বড়াল, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের ডাকাতিয়া, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির কর্ণফুলী, নেত্রকোনার মগরা ও সোমেশ্বরী, খুলনার ময়ূর, হবিগঞ্জের খোয়াই, রংপুর অঞ্চলের ঘাঘট, ধরলা, জলঢাকা, দুধকুমার, তিস্তা, স্বতী, নীলকুমার, বাঙ্গালী, বড়াই, মানাস, কুমলাই, লাতারা, ধুম, বুড়িঘোড়া, দুধ কুমার, সোনাভরা, হলহলিয়া, লোহিত্য, ঘরঘরিয়া, ধরনী, নলেয়া, জিঞ্জিরাম, ফুলকুমার, কাটাখালী, সালমারা, রায়ঢাক, খারুভাজ, যমুনেশ্বরী, চিকলী, মরা করতোয়া, ইছামতি, আলাই কুমারী ইত্যাদি। সিলেটের পিয়াইন, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরার নবগঙ্গা, টাঙ্গাইলের লৌহজং, বান্দরবানের শঙ্খ, কক্সবাজারের বাঁকখালী, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, দিনাজপুরের পুনর্ভবা, বগুড়ার করতোয়া, সাতক্ষীরার আদি যমুনা, নওগাঁ ও জয়পুরহাটের ছোট যমুনা, বরিশালের সন্ধ্যা, ফরিদপুরের কুমার, নাটোরের নারদ ও যশোরের কপোতাক্ষ,বরগুনা, নয়াভাংগনী, সাতলা, গণেশপুরা, তেঁতুলিয়া, লোহালিয়া, ইলিশা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীসহ অনেক নদী নাম নাম যৌবন হারার তালিকায় উঠে এসেছে। যৌবনহারা এসব নদ-নদীর কোন মহাষৌধে যৌবন ফিরে পাবে এটা কেউ বলতে পারবে বলে মনে হয়না। তবে এসব নদীকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।

এখন নদীর সোঁ সোঁ ডাকতো দূরের কথা দু’চোখ যে দিকে যায় শুধু বালু আর আর বালু। ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মা শুকিয়ে অনেক স্থানে খালে পরিণত হয়েছে। এক সময় জীবন জীবিকার নির্ভর ছিল নদীর উপর। আবহমানকাল থেকে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়েছিল অসংখ্য শত শত নদী। ভাটিয়ালি, মারফতি, মুরর্শীদি গান গেয়ে পাল তোলা নৌকার মাঝিরা নদীর প্রাণকে সজিব করে তুলতো। পারাপারের জন্য ছিল অসংখ্য খেয়াঘাট। কিন্তু আজ কাল আর এসব দৃশ্য চোখে পড়ে না।

জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে নদীগুলো মরে গেছে। নদীগুলো শুকিয়ে ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদী দেখলে এখন আর কেউ মনে করে না এক সময় এসব নদীর খরস্রোতা যৌবন ছিল। ভারতের এক তরফা পানি প্রত্যাহার ও প্রকৃতি বিরূপ আচরণ করায় কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে এই নদীগুলো। সেই সাথে হারিয়ে গেছে নদী পথে পারাপারে প্রায় হাজার হাজারের ওপর খেয়াঘাট।

অথচ এই খেয়াঘাটগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল নগর জীবন। সেসব এখন শুধুই অতীত। যেখানে এক সময় মাছের চাষ হতো এখন সেখানে চাষ হচ্ছে ধান, পাট, তামাকসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের যুগ যুগ ধরে নদী দিয়ে বয়ে চলা প্রাণের প্রবাহিত থেমে গেছে। এসব নদী, উপনদী, শাখা প্রশাখা নদী, ছড়া নদী, নালা নদী এবং নদীখাত এখন শুধুই এ দেশের মানুষের কাছে স্মৃতি।

তিস্তা নদীতে ভারত-পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবা নামক স্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে । বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজ থেকে ১০০ কিলোমিটার উজানে এ বাঁধটি অবস্থিত। বাঁধের সাহায্যে ভারত একটি খালের মাধ্যমে তিস্তা শুকনো মৌসুমের প্রবাহ থেকে দেড় হাজার কিউসেক পানি মহানন্দা নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। বাঁধের সাহায্যে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের তিস্তা বাঁধ প্রকল্প প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তিস্তা অববাহিকার পানি প্রবাহ অস্বাভাবিক কমে গেছে।

ফলে কৃষি, নৌসহ জীবন যাত্রায় পড়েছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব। তিস্তা অববাহিকায় বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষের জীবন জীবিকায় নেমে এসেছে চরম হাহাকার। বাংলাদেশে ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী প্রবাহিত হচ্ছে। প্রতিটি নদ নদীতে ভারত বাধ নির্মাণ করে পানির প্রবাহ বাধা গ্রস্ত করছে। অপরদিকে পদ্মা নদীতে ভারত ফারাক্কায় বাঁধ দেয়ার ফলে এ অঞ্চলের ভূ প্রকৃতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পরেছে। ব্রহ্মপুত্র নদের অবস্থাও আরও করুন। কুড়িগ্রামের চিলমারি এলাকায় শুকনো মৌসুমে এ নদী পায়ে হেটে পার হওয়া যায়। তবে বর্ষায় ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে।

১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার বিশ্ব নদী দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি। এরপর ২০০৫ সাল থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা দিবসটি পালন করছে। বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে থেকে রিভারাইন পিপল নামের একটি সংস্থা এ দিবস পালন করে আসছে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ দিবসটি অনুসমর্থন করে।

কোনো দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে পরবর্তী দিবস পর্যন্ত সেই বিষয়ে কর্মতৎপর থাকাই রেওয়াজ। তা না হলে প্রতিপাদ্য নির্ধারণের যৌক্তিকতা কী? স্বীকার করতে হবে যে, বিশ্ব নদী দিবসের বাংলাদেশ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে ঠিকই, সে অনুযায়ী কাজ হয়নি। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আমাদের আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

গত রবিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দিবসটি অনুষ্ঠিত হয়। সেই সাথে চলে বিভিন্ন সভা সেমিনার। নানান সমস্যার কথা উঠে আসে। সমস্যার সমাধানে চলে সুচিন্তিত মতামত। যদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় তবে হয়তোবা যৌবনাহারা নদীগুলো ফিরে পেতে পারে তাদের হারানো যৌবন।

আ‌দিত্ব্য কামাল: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ক্যাটাগরি: প্রধান কলাম

ট্যাগ:

Leave a Reply