রবিবার রাত ১০:৫০, ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ. ২৮শে নভেম্বর, ২০২১ ইং

হেফাজতের সঙ্গে বিরোধ আদর্শিক; ধর্মীয় নয়: মোকতাদির চৌধুরী

বাংলা থিঙ্কট্যাঙ্ক নিউজপোর্টাল দেশ দর্শনে গত ২৭ এপ্রিল ‘দুই শর্তে কওমিদের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে’ শিরোনামে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এর সূত্র ধরে উভয়পক্ষের অনেক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও আলাপ-আলোচনার পর গত ৪ আগস্ট দেশ দর্শনে  ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজত-এমপি দ্বন্দ্ব: নিঃস্ব হাজারো পরিবার’ শিরোনামে আরেকটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার ও অনুসন্ধানধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে জনাব মোকতাদির চৌধুরী দেশ দর্শনকে ই-মেইলের মাধ্যমে আরো একটি সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্ট বার্তা দিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট ও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

মেইল বার্তায় তিনি জানান, “হেফাজতপন্থীদের সঙ্গে তার বিরোধ ধর্মীয় নয় বরং আদর্শিক।” অর্থাৎ তারা বারবার তার সঙ্গে ‘ধর্মীয় বিরোধের’ যে চিত্র প্রকাশ করেন তা সঠিক নয়। তিনি নিজে একজন ধর্ম-অন্তপ্রাণ মানুষ। তবে ধর্মীয় কিছু বিষয় যেমন ধর্মের রাষ্ট্রচিন্তা, শিক্ষা কারিকুলাম, সমাজ বিনির্মাণের ধরন-কৌশল, অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কওমি ও হেফাজতপন্থীদের সঙ্গে তার চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকৌশলগত পার্থক্য রয়েছে। আর এই পার্থক্যটাকে তিনি দেখছেন ‘আদর্শিক বিরোধ’ হিসেবে, যা ধর্মীয় বিরোধ হিসেবে চালিয়ে দেয়া চরম বিভ্রান্তিপূর্ণ।

“…শহীদ দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বার্ষিকী দিবস ইত্যাকার প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান আবশ্যক। তা হলেই- সমন্বয় নয়, সমঝোতার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়।”

এছাড়াও তিনি বলেন, “আমার সাথে বিরোধ শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হেফাজতপন্থীদের মিথ্যাচারের প্রশ্নে। তারা আমার মানহানি করেছে আমার সম্পর্কে মিথ্যা বলে। এই মিথ্যাচারের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।”

তিনি আরো বলেন, “স্বাধীনতা, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রশ্নে কওমীদের অবস্থান পরিষ্কার করা জাতীয় স্বার্থে জরুরী। জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বার্ষিকী দিবস ইত্যাকার প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান আবশ্যক। তা হলেই- সমন্বয় নয়, সমঝোতার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়।”

প্রতিবেদকের বক্তব্য: জনাব মোকতাদির চৌধুরী যেটাকে ‘আদর্শিক বিরোধ’ বলছেন, আমি সেটাকে তা মনে করি না। বরং আমার দৃষ্টিতে এটা এক ধরনের ‘রাজনৈতিক মতবিরোধ’, যা খুবই গৌণ এবং এর মীমাংসাও অতি সহজ। রাজনৈতিক মতবিরোধ সাধারণত তৈরি হয় ক্ষমতা ও শাসন ব্যবস্থার প্রশ্নে। অর্থাৎ একপক্ষ বা উভয়পক্ষের রাজনৈতিক খায়েশ থেকে যে ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব, মতানৈক্য, খোলামনে মুখোমুখি পর্যাপ্ত বসার অভাব তৈরি হয় তাই রাজনৈতিক মতবিরোধের প্রধান কারণ।

আর আমরা সচরাচর আমাদের যে ভৌগলিক রাজনৈতিক ও একটি নির্দিষ্ট সামাজিক/ধর্মীয় চিন্তাধারা; ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, দলীয় বা আঞ্চলিকতার প্রভাবযুক্ত মতবাদ, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল, জাতি বা সম্প্রদায়কেন্দ্রীক রাজনৈতিক প্রচেষ্টাকে বা সেই প্রচেষ্টার প্রধান ব্যক্তির চিন্তাধারা ও কাজকর্মকে আদর্শ বলি, তা আসলে আদর্শ নয়। বরং একটি বিশেষ মতবাদ, চিন্তাধারা, কর্মকৌশল। ‘সমন্বয়’ ও ‘সমঝোতায়’ যেমন পার্থক্য আছে, তেমনই পার্থক্য আছে ‘চিন্তাধারা’, ‘মতবাদ’ ও ‘আদর্শে’।

কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠী বা দলে ‘আদর্শের’ সর্বনিম্ন উপস্থিতি পাওয়া গেলেও পরস্পরবিরোধী ধ্বংসাত্মক বক্তব্য, অবস্থান, সংঘাত দ্রতগতিতে কমতে থাকবে বলে এ প্রতিবেদক মনে করেন।

‘আদর্শ’ একটি উচ্চতর শব্দ, যা সামগ্রিকতা, অখণ্ডতা, সম্পূর্ণতা ও পরীক্ষিত কল্যাণধর্মী বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। আদর্শের প্রথম শর্তই হচ্ছে- ‘সমগ্র মানবজাতির সার্বিক মুক্তি ও কল্যাণধর্মী পরীক্ষিত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। দ্বিতীয় শর্ত- সেই সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে একটি শান্তিপূর্ণ ও পরস্পর বিরোধমুক্ত সমাজ (ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ) মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা। তৃতীয় শর্ত- সামগ্রিক কল্যাণে বিশেষ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর তথাকথিত মান-সম্মান ও লৌকিক ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করা।

কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠী বা দলে ‘আদর্শের’ সর্বনিম্ন উপস্থিতি পাওয়া গেলেও পরস্পরবিরোধী ধ্বংসাত্মক বক্তব্য, অবস্থান, সংঘাত দ্রতগতিতে কমতে থাকবে বলে এ প্রতিবেদক মনে করেন। এর বিপরীতে বুঝতে হবে সেখানে বিশেষ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর নিজস্ব প্রবৃত্তিগত চিন্তাধারা, মতবাদ, সঙ্কীর্ণ স্বার্থ, অপরিণামদর্শী আচার-আচরণের মিশ্রণ ঘটেছে।

ক্যাটাগরি: প্রধান কলাম,  প্রধান খবর,  শীর্ষ তিন,  সম্পাদকের কলাম

ট্যাগ:

Leave a Reply