রবিবার বিকাল ৩:০৬, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ. ৫ই ডিসেম্বর, ২০২১ ইং

রহমত (রমজানের প্রথম দশক) কী?

0 বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আ’লা রসুলিল্লাহ।

রমজান এসেছে রহমত,মাগফিরাত ও নাজাতের ডালি নিয়ে। রহমত,মাগফিরাত ও নাজাত বিষয়গুলো আসলে কী? আজ শুধু ‘রহমত’ বিষয়টির উপর আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ।

ثُمَّ تَوَلَّیۡتُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ ۚ فَلَوۡ لَا فَضۡلُ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ وَ رَحۡمَتُہٗ لَکُنۡتُمۡ مِّنَالۡخٰسِرِیۡنَ ﴿۶۴﴾

অতঃপর তোমরা এ সবের পর বিমুখ হয়ে ফিরে গেলে। আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও অনুকম্পা না হত, তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হতে।(সুরা বাকারাহ-৬৪)

উক্ত আয়াতে রহমত শব্দটি অনুকম্পা, দয়া, আশীর্বাদ, অনুগ্রহ, ভালোবাসা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ।

“আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করার পূর্বে একটি লেখা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তা হলো “আমার ক্রোধের উপর আমার রহমত অগ্রগামী রয়েছে।”[১]

আল্লাহ তাঁর রহমতে সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর অপরিসীম দয়ায় তিনি তাদের কাছে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁর রহমতের কারণেই তিনি তাদেরকে আদেশ-নিষেধ করেছেন এবং তাদের জন্য শরী‘আত বিধিবদ্ধ করেছেন। তিনি তাদের প্রতি তাঁর বাহ্যিক ও গোপনীয় নি‘আমতে পরিপূর্ণ করেছেন এবং তাদেরকে সুন্দর সূক্ষ্ম পরিচালনায় পরিচালিত করছেন। তাঁর রহমতেই তিনি তাদেরকে বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন করেন। তাঁর রহমত দুনিয়া ও আখিরাতে ভরপুর। অত:এব, তাঁর রহমত ব্যতীত কোন কিছুই শুভ-সুন্দর হয় না; কোন কাজই তাঁর রহমত ব্যতীত সহজ হয় না; কোন উদ্দেশ্য তাঁর রহমত ব্যতীত অর্জিত হয় না। তাঁর রহমত সব কিছু ঊর্ধ্বে, সবচেয়ে মহান ও সুউচ্চ। মুহসিন মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে তাঁর রহমতের পূর্ণ অংশ এবং অপরিসীম কল্যাণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ رَحۡمَتَ ٱللَّهِ قَرِيبٞ مِّنَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ٥٦﴾ [الاعراف: ٥٥]

“নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।” [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ৫৫][২]

আর-রহমান ও আর-রাহীম নামদ্বয় প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা‘আলা পরম দয়াময়, অতি দয়ালু, প্রশস্ত রহমতের অধিকারী; যার রহমত সব কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছে এবং সমস্ত সৃষ্টির উপর তাঁর রহমত ব্যাপক ভাবে বিস্তৃত।

কেউ আল্লাহর রহমান নামটি নিয়ে গভীর চিন্তা-গবেষণা করলে দেখতে পাবে যে, তিনি ব্যাপক ও পরিপূর্ণ রহমতের অধিকারী। তাঁর রহমত ঊর্ধ্বজগত, নিম্নজগত, সমস্ত সৃষ্টিজগত, দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বত্রই পরিপূর্ণ। উপরোক্ত অর্থের প্রতি প্রমাণকারী নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করুন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿قَالَ عَذَابِيٓ أُصِيبُ بِهِۦ مَنۡ أَشَآءُۖ وَرَحۡمَتِي وَسِعَتۡ كُلَّ شَيۡءٖ١٥٦﴾ [الاعراف: ١٥٥]

“তিনি বললেন, ‘আমি যাকে চাই তাকে আমার আযাব দেই। আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ بِٱلنَّاسِ لَرَءُوفٞ رَّحِيمٞ١٤٣﴾ [البقرة: ١٤٣]

“নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৪৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿فَٱنظُرۡ إِلَىٰٓ ءَاثَٰرِ رَحۡمَتِ ٱللَّهِ كَيۡفَ يُحۡيِ ٱلۡأَرۡضَ بَعۡدَ مَوۡتِهَآۚ إِنَّ ذَٰلِكَ لَمُحۡيِ ٱلۡمَوۡتَىٰ٥٠﴾ [الروم: ٥٠]

“অত:এব, আপনি আল্লাহর রহমতের চি‎হ্নসমূহের প্রতি দৃষ্টি দিন। কিভাবে তিনি জমিনের মৃত্যুর পর তা জীবিত করেন। নিশ্চয় এভাবেই তিনি মৃতকে জীবিত করেন।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৫০]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿أَلَمۡ تَرَوۡاْ أَنَّ ٱللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَأَسۡبَغَ عَلَيۡكُمۡ نِعَمَهُۥ ظَٰهِرَةٗ وَبَاطِنَةٗ٢٠﴾ [لقمان: ٢٠]

“তোমরা কি দেখ না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে। আর তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নি‘আমত ব্যাপক করে দিয়েছেন।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ২০]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿وَمَا بِكُم مِّن نِّعۡمَةٖ فَمِنَ ٱللَّهِۖ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ ٱلضُّرُّ فَإِلَيۡهِ تَجۡ‍َٔرُونَ٥٣﴾ [النحل: ٥٣]

“আর তোমাদের কাছ যে সব নি‘আমত আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। অতঃপর দুঃখ-দুর্দশা যখন তোমাদের স্পর্শ করে তখন তোমরা শুধু তার কাছেই ফরিয়াদ কর।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৫৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,

﴿وَإِن تَعُدُّواْ نِعۡمَةَ ٱللَّهِ لَا تُحۡصُوهَآۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَغَفُورٞ رَّحِيمٞ١٨﴾ [النحل: ١٨]

“আর যদি তোমরা আল্লাহর নি‘আমত গণনা কর, তবে তার ইয়ত্তা পাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ১৮]

আল্লাহর নি‘আমতের উসূল তথা মূলনীতি ও ফুরু‘ তথা শাখা-প্রশাখা সম্পর্কিত সূরা নাহাল তিলাওয়াত করুন। এতে আল্লাহর নি‘আমতের অপরিসীম দান ও প্রভাব রয়েছে। এ কারণেই তিনি সূরার শেষে বলেছেন,

﴿كَذَٰلِكَ يُتِمُّ نِعۡمَتَهُۥ عَلَيۡكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تُسۡلِمُونَ٨١﴾ [النحل: ٨١]

“এভাবেই তিনি তোমাদের উপর তার নি‘আমতকে পূর্ণ করবেন, যাতে তোমরা অনুগত হও।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৮১]

অত:পর সূরা আর-রহমান আদ্যোপান্ত গভীর চিন্তা-গবেষণাসহ তিলাওয়াত করুন। এ সূরাতে তাঁর নি‘আমতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। এতে রয়েছে রহমানের রহমতের যাবতীয় উদাহরণ ও নানা ধরণের নি‘আমতের বিস্তারিত বিবরণ। এ কারণেই তিনি তাঁর অনুগত মুমিনদের জন্য জান্নাতে পূর্ণ ও চিরস্থায়ী নি‘আমতের কথা স্মরণ করে দিয়ে সূরাটি শেষ করেন। আর জান্নাতের এ চিরস্থায়ী নি‘আমত আল্লাহর নি‘আমতের অন্যতম প্রভাব। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতকে রহমত বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَأَمَّا ٱلَّذِينَ ٱبۡيَضَّتۡ وُجُوهُهُمۡ فَفِي رَحۡمَةِ ٱللَّهِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ١٠٧﴾ [ال عمران: ١٠٧]

“আর যাদের চেহারা সাদা হবে, তারা তো আল্লাহর রহমতে থাকবে। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৭]

হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতকে বলবেন,

«أَنْتِ رَحْمَتِي أَرْحَمُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ مِنْ عِبَادِي».

“তুমি আমার রহমত, তোমার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের থেকে যাকে ইচ্ছা রহমত করব।”[৩] আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَهُوَ أَرۡحَمُ ٱلرَّٰحِمِينَ٦٤﴾ [يوسف: ٦٣]

“এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৬৩]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لَلَّهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ الوالدة بِوَلَدِهَا».

“মা তার সন্তানের উপর যতটুকু দয়ালু, আল্লাহ তার বান্দার উপর তদাপেক্ষা অধিক দয়ালু।”[৪]

«إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ كِتَابًا قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ الخَلْقَ: إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي».

হে রহমান,রাহীম- রমজানের প্রথম দশকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত নামক নিয়ামত দিয়ে আমাদেরকে ভরপুর করে দিন। আমিন।

#তথ্যপুঞ্জি:

[★] আল্লাহর বাণী,

﴿ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ٣﴾ [الفاتحة: ٣]

“দয়াময়, পরম দয়ালু, পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।” [সূরা আল-ফাতিহা, আয়াত: ৩]

[১] সহীহ বুখারী, ৮/১৭৬, কিতাবুত তাওহীদ, বাব, ওয়াকানা ‘আরশুহু ‘আলাল মাই, হাদীস নং ৭৫৫৪; সহীহ মুসলিম, ৪/২১০৭, কিতাবুত তাওবা, বাব, ফি সি‘আতি রহমাতিল্লাহি তা‘আলা, হাদীস নং ২৭৫১।

[২] আল-মাওয়াহিবুর রাব্বানিয়্যাহ মিনাল আয়াতিল কুরআনিয়্যাহ, পৃ. ৬৪।

[৩] সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, বাব, কাওলুহু ‘ওয়াতাকূলু হাল মিম মাযীদ’ ৬/৪৮, হাদীস নং ৪৮৫০; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জান্নাহ, বাব, আন-নারু ইয়াদখুলুহাল জাব্বারূন ওয়াল জান্নাতু ইয়াদখুলুহাদ দু‘আফা, ৪/২১৮৬, হাদীস নং ২৮৪৬, এটি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসের অংশ বিশেষ।

[৪] সহীহ বুখারী, ৭/৭৫, কিতাবুল আদাব, বাব, রহমাতুল ওয়ালাদি ওয়াতাকবীলিহি ওয়া মু‘আনাকাতিহি, হাদীস নং ৫৯৯৯; সহীহ মুসলিম, ৪/২১০৯, কিতাবুত তাওবা, বাব, ফি সি‘আতি রহমাতিল্লাহি তা‘আলা, হাদীস নং ২৭৫৪। হাদীসটি উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত।

Some text

ক্যাটাগরি: ধর্ম

Leave a Reply

লঞ্চে যৌন হয়রানি