শুক্রবার সকাল ৯:২৯, ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ. ৩০শে জুলাই, ২০২১ ইং

ঈদ কেন ইদ হলো?

১০২ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ। মুসলিমদের একটি ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্যের আরবি ‘عيد مبارك‎‎’ ও বাংলা ‘ঈদ মোবারক’। গেল কয়েক বছর ঈদ এলেই বাঙালি মুসলিমদের বহু বছরের ঐতিহ্যের ধারক ‘ঈদ’ বানান নিয়ে নানান মনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়। সত্যিকার অর্থে ঐতিহ্যের ‘ঈদ’ কেবল শব্দে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আনন্দ-ভালোবাসায় জড়িত,আবেগ এবং ধর্মীয় আচার! তাহলে ‘ঈদ’ শব্দের বানান দীর্ঘ ঈ-কার ও হ্রস্ব ই-কারের মধ্যে কোনটি গ্রহণযোগ্য, ইতিহাস না বানানবিধি— কোনটির গুরুত্ব বেশি?

বাংলা একাডেমির ‘আধুনিক বাংলা অভিধানে’ ‘ঈদ’ শব্দটির ভুক্তি রয়েছে দু’টি। এর মধ্যে একটিতে লেখা হয়েছে ‘ঈ’ ব্যবহার করে, অন্যটি ‘ই’ ব্যবহার করে। এর মধ্যে ‘ঈদ’ কে প্রচলিত ও অসংগত বানান এবং ‘ইদ’কে সংগততর ও অপ্রচলিত বানান বলছে বাংলা একাডেমি।১৯৯৪ সাল থেকে বাংলা একাডেমির অভিধানে দুটো বানানই আছে। বানানবিধিতে বলা আছে, বিদেশি শব্দ লিখতে ‘ঈ’ বা ‘ঈ’-কারের পরিবর্তে ‘ই’ বা ‘ই’-কার লিখতে হবে। এও বলা আছে, ইতিহাস-ঐতিহ্যনির্ভর বানান পরিবর্তন করা যাবে না।
➤বাংলা একাডেমির ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ এর উপরোক্ত বানান রীতি অনুসরণ করলে মন আর চোখ সায় দেয় ‘ঈদ’ বানানে, কোনো কোনো বানান থাকে, যার পরিবর্তন হলে চোখে লাগে। কখনো কখনো আবেগে লাগে, কখনো কখনো বিশ্বাসে লাগে। কিন্তু মস্তিষ্ক বলে ‘ইদ’ সঠিক। অবশ্য তা ভাষাবিজ্ঞানীর মস্তিষ্ক বলে!

মূলত ‘ঈদ’ শব্দে প্রথম ‘ঈ’ ব্যবহার করেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবির বিখ্যাত গান “রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ‘ঈদ’ ছাড়াও বহু কবিতায় ঈদ শব্দের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।আরবি-ফারসি ভাষায়ও সমান পারদর্শী ছিলেন কবি। তারও আগে বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান [ প্রথম খন্ড (অ-ঞ) প্রথম প্রকাশ জৌষ্ঠ ১৪২০/ জুন ২০১৩] থেকে আলাওলের লেখায় ঈদ শব্দের প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায়। ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে আলাওল লিখেছেন, “জুম্মা দুই ঈদ আর আরফা সিনান”। ১৮৫০ সালে অক্ষয়কুমার দত্তের নিন্মোক্ত লেখাটিতেও ইদ শব্দের প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায়। তিনি লিখেন,”কি ইদ,কি মহরম কোন মোসলমান…..”।

#সঠিক বানান কোনটি ঈদ নাকী ইদ?
বাঙালি মুসলমানদের কাছে এবং ৯৭ ভাগ মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষের এদেশে ধর্মীয় আবেগের স্মৃতিতে মোড়া ‘ঈদ’ শব্দটি নিন্মোক্ত তিনটি কারণে সঠিক বলে মনে করা হয়। আর তা হল:
এক. ইসলাম ধর্ম যখন থেকে এ দেশে প্রবেশে করেছে তখন থেকেই ঈদ বানানে দীর্ঘ ঈ-কার ব্যবাহার করা হয়। তাই ঈদের বানান হ্রস্ব ই-কার হওয়ার কোনো কারণ নেই।

দুই. ঈদ শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ থেকে। এটি এখন বাংলা ভাষার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এখন বিদেশি শব্দ হিসাবে বিবেচনা করা যাবে না। তাই ঈদ বানানই সঠিক।

তিন. ঈদ লেখার সময় আরবী শব্দ আইন-দাল-ইয়া অক্ষর ব্যবহার করে ঈদ লেখা হয়। এ ক্ষেত্রে আইনে একটি দীর্ঘ টান আছে। বাংলা লেখার সময়ও ওই টান আসবে। এ জন্য ঈদ শব্দটিই সঠিক।

➤ধ্বনি ও বর্ণের প্রতিবর্ণীকরণের সমস্যা:
বাংলা ভাষার ব্যাকরণে আরবির মত দীর্ঘ টানে (‘ঈ’) উচ্চারণ নেই। এখানে সব শব্দই ছোট টানের (‘ই’)। তাই শব্দটি বাংলা ভাষার উচ্চারণে সঠিক হয় ‘ইদ’।
বাংলায় কোনো নিয়মিত দীর্ঘস্বর না থাকায় ‘ঈদ’ বা ‘ইদ’ যা-ই লিখি না কেন, আমরা ‘ইদ’-ই উচ্চারণ করে থাকি।

➤ভাষাবিজ্ঞানের ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনা:
আমরা যদি বিশ্বায়নের ভাষার সাথে বানান তুলনা করি তবে দেখা যাবে, বাংলা এবং ইংরেজি উভয়ের জন্য আরবি ‘ঈদ’ একটি বিদেশি শব্দ। ইংরেজিতে ‘ঈদ’ শব্দটি লেখা হয় ‘Eid’। এখানে ‘E’-এর পর ওই ‘I’-টা লেখা হয় দীর্ঘ ‘ঈ’ স্বর বোঝানোর জন্যই। আর ইংরেজিতে দীর্ঘ স্বর হিসেবেই উচ্চারণ করা হচ্ছে, যেটি বাংলা ভাষায় দীর্ঘস্বর বর্ণমালায় থাকলেও উচ্চারণে নেই!

➤ভাষাবিজ্ঞানের রূপতত্ত্বের আলোকে:
ব্যাকরণের বাক্যাংশের (Parts of speech) দিক থেকে ঈদ একটি বিশেষ্য পদ।ঈদ’ হল এক উৎসবের নাম।
কোনো ভাষাতেই নাম ও ট্রেডমার্ক ইচ্ছামতো বদলানো বা মতাচ্ছন্নতা সমর্থন করা হয় না।

➤ভাষা বহতা নদীর মত।বাঁধ দিলে যেমন নদীর গতিপথ বদলে যায়। নিয়মের বাঁধনে ভাষার গতিপথও বদলে যায়। কোনো ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না থাকলে তার গতি একদিন স্থবির হয়ে যেতে পারে। সংস্কৃতের মতো বহু ভাষা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতির কারণেই কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে।

Link:
Ourkantha24.com

Some text

ক্যাটাগরি: বিবিধ

Leave a Reply

এসো মোরা কাজ করি মানবতার…