‘ভাই বড় ধন, রক্তের বাঁধন’ এই উক্তিটি আসলে আবহমান বাংলার অতি পরিচিত একটি প্রবাদ, যার পুরোটা হলো: “ভাই বড় ধন, রক্তের বাঁধন, যদিও পৃথক হয় নারীর কারণ”, যা বোঝায় যে ভাইয়ের সম্পর্ক রক্তের বন্ধন হলেও, নারীর কারণে সেই বাঁধন দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এটি সাধারণত সম্পর্ক ও পারিবারিক টানাপোড়েন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
আগে গ্রামবাংলায় এসব মূল্যবান প্রবাদ-প্রবচন দেওয়ালে টাঙানো বা লেখা হতো। তৎকালীন সময়ে বাড়ির মহিলারা অবসর সময়ে সাদা সূতির কাপড়ের জমিনে রঙ্গীন সূতা দিয়ে কুশিকাটার সাহায্যে নকশা করে অতি যত্নসহকারে এসব পুরানো খনার বচনগুলো লিখে রাখতো এবং আত্মীয়স্বজনকে তা উপহার দিত। একটি রুমাল আকৃতির কাপড়ে লেখাটি লিখতে প্রায় সপ্তাহখানেক সময় লেগে যেতো। মূলত নিরক্ষর মানুষের কাছে প্রবাদগুলো ছিল সহজ ও কার্যকর শিক্ষার মাধ্যম। এগুলো ছিল মৌখিক ঐতিহ্য, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে লেখা হতো। কিন্তু হ্যায়! এখন সেই চল নেই বললেই চলে।
তৎকালীন সময়ে সমাজ-সংসারে ভাইয়ে ভাইয়ের মধ্যে খুব মিল ছিল। এক ভাইয়ের সাথে অন্য ভাইয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। পারস্পরিক বোঝাপড়া সুন্দর ছিল। কোন কিছুতেই কলহ ছিল না। সবাই অল্পতে তুষ্ট থাকতো। অন্যের সম্পত্তি ওপর কারো কোনো লোভ ছিল না। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল। নিজেদের মধ্যে এধনের দৃঢ় ঐক্য ও সংহতি থাকার কারণে বাইরের কোনো ব্যক্তি তাদের সংসারে অশান্তি বা কলহ সৃষ্টি করার সুযোগ পেতো না।
রক্তের এই অকৃত্রিম বন্ধন অটুট রাখার জন্য বড় ভাইয়েরা ছোট ভাইয়ের জন্য ও ছোট ভাই বড় ভাইয়ের জন্য যেকোনো ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতো। আজকাল এধরনের স্যাক্রিফাইস তেমন দেখা যায় না। এখন নিজের স্বার্থকেই সবাই বেশি গুরুত্ব দেয়। এখন অবস্থাপন্ন ভাইয়েরা আগের মতো আর ত্যাগ স্বীকার করে না। আজকাল এমনও দেখা যায় যে, পৈতৃক টাকা-পয়সায় নিজে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও অভাবী ভাইয়ের প্রতি কোনো খেয়াল রাখে না। তবে মাঝেমধ্যে নিঃস্ব ভাইকে টুকটাক সহায়তা করলেও, সেই সাহায্যের জন্য তাকে খুটা দিতে কুন্ঠাবোধ করে না। বাইরের লোকের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠাতা বজায় রাখে, কিন্তু নিজের ক্ষমতাহীন ভাইকে সব সময় হেলাফেলা করে।
অনেকে আবার গরীব ভাই ও তার পরিবারের সাথে সস্পর্ক ছিন্ন করতেন লজ্জাবোধ করে না! কোনো সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে তাদেরকে নিমন্ত্রণ পর্যন্ত করে না! এমনকি নিজেদের বিলাসবহুল একাধিক বাড়ি থাকার পরও বা বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও ছোটভাইকে নিজের হিস্যা নেওয়ার নিমিত্তে পৈতৃক ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে দ্বিধা করে না! এমনকি নিজের আলিশান বাড়িটি তালামেরে রাখে, কিন্তু আপন অসহায় ভাইকে সেই জাঁকজমপূর্ণ বাড়িতে বসবাস করতে দেয় না! সর্বদা দুর্বল ভাইকে এড়িয়ে চলে। এক্ষেত্রে ভাইয়ের স্ত্রী নেপথ্যে যথেষ্ট নেতিবাচক ভূমিকা রাখে।
যখন পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ-ভাটোয়ার প্রশ্ন আসে বা গরীব ভাইকে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা ছাড়া সরাসরি জোড় পূর্বক অন্যায় ও অনৈতিকভাবে পৈতৃক আদি বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে চায়, ঠিক তখনই শুরু হয় ভাইয়ের সংঘাত ও কলহ। এটা এক সময় শালিস ও মামলার অবস্থায় গিয়ে পৌঁছে। তখন উভয়ের সংযোগটা ‘সাপে-নেউলে সম্পর্ক’ এর পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়; কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না, একজন আরেক জনের সাথে মুখদেখাদেখী ও কথাবর্তা পর্যন্ত চিরতরে বন্ধ করে দেয়। এমন বৈরী আচরণ অবশ্য আমাদের মতো ঐতিহ্যবাহী ও রক্ষণশীল সমাজ মোটেই সমর্থন করে না। এমনকি ধর্মও এটা কখনো অনুমোদন করে না।
আমরা অতি ক্ষুদ্র স্বার্থের কারণে ভুলে যাই যে, রক্তের সম্পর্ক বজায় রাখা ও আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা মানুষের বুনিয়াদী আখলাকের অন্তর্ভূক্ত। এই পৃথিবীতে আমরা কোনো বিনিময়ের প্রত্যাশা ও ধারনা ছাড়া যে সকল নেক কাজ করি, সেগুলোর প্রতি গভীর দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায় যে, মানুষের সকলের মাঝেই আত্মীয়তার বাঁধন ও রক্তের সম্পর্কের একটি গভীর যোগসূত্র অটুট রয়েছে। যে বা যার অন্তরে এ অনুপ্রেরণা ও অনুরাগের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই, তার তরফ হতে যেকোনো ধরনের ভয়ঙ্কর কাজ করা সম্ভব। ইসলামী দর্শন মতে, রক্ত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক মহান আল্লাহপাকের ‘রাহমান’ গুণ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। রক্তের এই পবিত্র বন্ধন যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও প্রতিটি মানুষেরই অটুট রাখা উচিৎ। এই অকৃত্রিম সম্পর্ক অস্বীকার করে বা ছিন্ন করে পরকালে কখনো জান্নাতে যাওয়া যাবে না। এই প্রসঙ্গে মহনবী(সা.) বলেছেন, রক্তের বন্ধন ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না(সহিহ বুখারী:৫৯৮৪)।
মূলত, রক্তের পবিত্র বন্ধন সকল বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে একতাবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন বা অন্য যেকোনো মতপার্থক্যের কারণে রক্তের বাঁধন ও সম্পর্ক ছিন্ন কার উচিত নয়।
বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যায়, বেশিভাগ নারী ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা মানসিক শান্তির জন্য স্বামীকে নিয়ে আলাদাভাবে থাকতে পছন্দ করেন। আবার কিছু নারী শ্বশুর-শ্বাশুড়ী, দেবর-ননদকে সাথে নিয়ে একত্রে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পরিবারে সবাই একত্রে থাকলে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহানুভূতি ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। গবেষকদের মতে, ‘যারা যৌথপরিবারে মিলেমিশে থাকে তাদের স্যাক্রিফাইসের মন-মানসিকতা ওখান থেকেই গড়ে ওঠে। যেটা একক পরিবারে খুবই কম লক্ষণীয়। বড় পরিবারে মিলেমিশে থাকা সদস্যরা মানসিকভাবে সুস্থ থাকে। কিন্তু একক পরিবারে সব সময় অস্থিরতা বিদ্যমান থাকে।’
হতবাক হওয়ার বিষয়, যে সন্তান শুধু নিজের শান্তির জন্য স্ত্রীর প্ররোচনায় পরিবারের সবাইকে কাঁদিয়ে ও মায়া-মমতার বন্ধন ছিন্ন করে পৃথকভাবে বসবাস করে, সেখানে সব সময় শান্তির পরিবর্তে নিরানন্দ ও নিঃসঙ্গতা বিরাজ করে। অথচ, বড় পরিবারে শান্তি-শৃংখলা-মমত্ববোধ সর্বদা বিদ্যমান থাকে। বস্তুত পরিপূর্ণ পারিবারিক আনন্দ, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, রক্তের বাঁধন ও আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখার জন্য যৌথ বা বড় পরিবারের কোনো বিকল্প নেই। যৌথ পরিবারে বসবাস করা কোনো নারী বা তৃতীয়পক্ষ আড়াল থেকে উসকানি দিয়ে কখনো ভাইয়ে ভাইয়ে মধ্যকার মায়ার বন্ধন ও মধুর সম্পর্কে চির ধরাতে পারে না। এই বন্ধন থাকে রক্তের সম্পর্কের মতোই সুদৃঢ়, মজবুত ও পবিত্র।
তবে পৈতৃক হিস্যা, ব্যক্তিত্বের পার্থক্য ও মূল্যবোধের ভিন্নতার কারণে ভাইয়ে ভাইয়ের মধ্যে যদি কখনো কোনো ধরনের কলহের সৃষ্টি হয়, তখন গরিমসি না করে তৎক্ষণাৎ উচিত তৃতীয় পক্ষের সহায়তা না নিয়ে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে নীতি-নৈতিকতা-মানবিকতা ও আবহমান বাংলার পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বাস্তবতার আলোকে একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাধান দেওয়া। এতে ভাইয়ে ভাইয়ে মধ্যকার বিরোধ দূর হবে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া-সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরো মজবুত হবে। সুতরাং আমাদের সবাইকে ব্যক্তিগত স্বার্থ কিছুটা পরিত্যাগ করে হলেও ভাইয়ে ভাইয়ের মধুর সম্পর্ক ও মায়ার বন্ধন অটুট ও অক্ষুন্ন রাখতে হবে; এই মায়ার বন্ধন মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ নেয়ামত।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
