হাসিনা কিভাবে ৩টি ভুয়া নির্বাচন করে ক্ষমতা দখলে রেখেছিল, বিরোধী দল এবং মতকে কঠোর দমন-পীড়ন করেছিল সেটা বহুবার বলেছি। আজ নতুন করে আর বলছি না। হাসিনার আমলে অ্যাকটিভ বিএনপি নেতারা ঘর থেকে বের হতে পারতেন না। অনেক বিএনপি নেতা নিরবে আওয়ামী লীগের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। বিএনপি-জামায়াত বহু আন্দোলন করেছে। তবে ফলাফল শূণ্য! হাসিনার কিছুই হয়নি। ছাত্রদের নেতৃত্বে জুলাই গণবিপ্লবে বহু মানুষের রক্তের হাসিনার পতন হয়েছে।

সবদল অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা না করলে বিপ্লব সফল হতো এটাও কারো অস্বীকার করা উচিত নয়। গণবিপ্লবে হাসিনার পতনের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, মিডিয়া ও সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন জরুরি ছিল। গণবিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র নেতারা পুনর্গঠনের কথা শুধু মুখেই বলেছেন। আসলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
জরুরি কাজ বাদ দিয়ে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান হঠাৎ আওয়ামী লীগকে মাফ করে দিলেন। বিএনপি ও জামায়াত একে অপরের মাথা খাওয়া শুরু করলো। একে অপরের বিরুদ্ধে নোংরা ভাষায় আক্রমণ শুরু করলো। একদল ছাত্র সমন্বয়ক নাম দিয়ে অনেকে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন বেআইনী কর্মকান্ড শুরু করলো। গণবিপ্লবের ছাত্র নেতৃবৃন্দ সবচেয়ে বড় ভুলটা করলেন রাজনৈতিক দল গঠন করে। এ অধম বহুবার বলেছি গতানুগতিক দল করে কোনো ফল হবে না। উল্টো নোংরা রাজনীতি বিপ্লবী ছাত্র নেতাদের সম্মান নষ্ট করবে।

জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতাদের দল এনসিপিতে যোগ দিয়ে গাজী সালাউদ্দিন তানভির নামের এক নতুন দরবেশ পাঠ্যপুস্তকের কাগজ সরবরাহের দূর্নীতি করলেন। এক দূর্নীতি করেই সে দরবেশ চারশ কোটি টাকা হাতিয়েছে বলে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে। টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে অনেকে জুলাই বিপ্লবীদের ব্যবহার করেছে। জেনে করুক বা না জেনে করুক ইতিমধ্যে তারা অনেকগুলো ভুল করে ফেলেছেন।
৫ অগাস্টের পর থেকেই আমরা অবিরাম বলে যাচ্ছি যে, প্রশাসনিক পুনর্গঠন না হলে এতোগুলো নিরপরাধ মানুষের রক্ত বৃথা যাবে। সবাই একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে এতো বড় একটা গণবিপ্লবকে হুমকির মুখে ফেলে দিলেন। বিএনপি নেতারা সারাদিন শুধু নির্বাচন নির্বাচন করলেন। যেন তাদের অভিধানে আর কোনো শব্দ নেই। পুরোদমে জামায়াতকে রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী বলে অপবাদ দেয়া শুরু হলো। বিএনপি নেতারা আওয়ামী স্টাইলে জামায়াতকে আক্রমণ শুরু করলেন। ফলাফল যা হবার তাই হলো। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, মিডিয়া কোনো কিছুরই পরিবর্তন বা পুনর্গঠন হলো না। এসব অযথা বিতর্ক ও বাকওয়াজীর আওয়াজে অদৃশ্য হয়ে গেল সবচেয়ে জরুরি কাজগুলো।

বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান সম্প্রতি ৭১ নিয়ে জামায়াতকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন। এরপর আর কারো বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, বিএনপি জামায়াত বিরোধ মেটানো সহজ নয়। আমরা যতোটা সহজ ভাবি রাজনীতি আসলে ততোটা সহজ নয়। ক্ষমতা খুব খতরনাক বস্তু! ক্ষমতার জন্য অনেক কিছু করতে হয়। কিনকি ফ্রাইডম্যান বলেছেন, ”পলিটিক্স এর প্রকৃত অর্থ হলো: পলি-যার অর্থ একাধিক এবং টিক্স-যার অর্থ রক্তচোষা পরজীবী”। আমরা রাজনীতিকে সাধারণ ভাবে ভাবতে অভ্যস্ত। বিএনপির বর্তমান পলিসীর কারণে স্বাভাবিক ভাবেই কিছু প্রশ্ন সামনে আসবে। তা হলো: ৭১ সালের ভূমিকার জন্য ঘৃণিত এবং খারাপ দল জামায়াতকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান কেন রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দিলেন? ২০০১ সালে বিএনপি কেন জামায়াতকে সাথে নিয়ে সরকার গঠন করলো? জামায়াত নিয়ে জিয়াউর রহমানের পলিসী কি ভুল ছিল? বর্তমান বিএনপি নেতৃবৃন্দ কি জিয়াউর রহমানের চেয়ে বেশি বিচক্ষণ? প্রয়োজন হলে জামায়াতকে পাশে রাখবেন, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়ে রাজাকার-স্বাধীনতা বিরোধী উপাধী দেবেন? বিষয়টি কি এতো সহজ? বিএনপির পলিসীর কারণে স্বাভাবিক ভাবেই অনেকে জামায়াত প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমানকে কাঠগড়ায় তুলবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, এটা ১৯৯১ বা ২০০১ সাল নয়। মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য যাচাই করবে। এ জন্যই বলছিলাম কি জামায়াতে ইসলামীকে তাদের জায়গায় থাকতে দেয়া উচিত। আপনারা আপনাদের জায়গায় থাকুন। আওয়ামী স্টাইলে জামায়াতকে আক্রমণ করলে শেষে নিজেরাই ধরাশায়ী হয়ে যাবেন।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের বিষয়ে বিএনপির কোনো আপত্তি বা অভিযোগ নেই। বিএনপি নেতাদের আচরণে মনে হয় বিগত সাড়ে ১৫ বছর দেশে যেন কিছুই হয়নি! এ জন্যই ৫ অগাস্টের পর প্রশাসনিক পুনর্গঠনে বিএনপি নেতাদের কোনো স্পষ্ট বক্তব্য ছিল না। প্রেসিডেন্টের পদত্যাগে জুলাই বিপ্লবের ছাত্রদের আন্দোলনেও বিএনপি বাঁধা দিয়েছে। তাহলে কি বিএনপি ক্ষমতার বিনিময়ে সাড়ে ১৭ বছর যাবৎ নির্যাতিত-নিপীড়িত নেতা-কর্মীদের ত্যাগ-তিতীক্ষাকে কুরবানী দিয়েছে? অবশ্য এটাও ঠিক যে, বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতারা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হননি। কেউ কেউ হয়েছেন। সবাই কবি নয়-কেউ কেউ কবি। সে রকম আর কি! আরেকটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাসিনার ফাঁসির রায়ের পর তারেক রহমানের কোনো বক্তব্য-বিবৃতি পাওয়া যায়নি। অথচ দেশের প্রত্যেক বিষয়ে তিনি বক্তব্য-বিবৃতি দেন।
তাহলে কি পর্দার আঁড়ালে বিএনপির সাথে ইন্ডিয়া ও আওয়ামী লীগের সমঝোতা হয়েছে? অনেকে কিন্তু তাই বলছেন। ধরে নিলাম আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির কোনো আদর্শিক বিরোধ নেই। তাহলে সাজানো নির্বাচন করে হাসিনার ক্ষমতা দখলে রাখা ও বিএনপিসহ রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্যাতন-নিপীড়ন সবই সঠিক ছিল? যদি সঠিক না হয় তাহলে সাড়ে ১৫ বছর যাবৎ আন্দোলনের নামে মাঠ পর্যায়ের লাখ লাখ নেতা-কর্মীর জীবনকে কেন বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হলো? আশ্চর্য্যের বিষয় যে, বিএনপি জুলাই বিপ্লবকে গণবিপ্লব বলতে এবং স্বীকৃতি দিতেও রাজি হয়নি। কূপমন্ডুকতা আর কাকে বলে? অথচ জুলাই বিপ্লব মৃত বিএনপিকে নতুন প্রাণ দিয়েছিল। জামায়াতও নানা ঘেরাটোপে পড়ে হাসিনার অন্যতম প্রধান সহযোগী চরমোনাই পীরের সাথে জোট করে বসলো। রাজশাহী ইউনির্ভাসিটির শিবির নেতা আসলাম হোসেনের খুনের মামলার প্রধান আসামী রুহুল কুদ্দুস বাবুকে হাসিনা হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ করেছিল। ৫ অগাস্টের পর এ বিষয়ে জামায়াত নেতারাও কিছু বললেন না। তাহলে জামায়াতও কি তাদের নেতা-কর্মীদের ত্যাগ-তিতীক্ষাকে কুরবানী দিয়েছে?
১/১১ সরকার ও হাসিনা দেশের যে সমস্যাগুলো তৈরী করে গিয়েছিল ঐতিহাসিক গণবিপ্লবের পর তার কোনোটারই সমাধান হয়নি। সবদলের নেতা ও জুলাই বিপ্লবীরা একে অপরের ছায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেন। ফলাফল যা হবার তাই হলো।
আওয়ামী খুনিদের ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় পাওয়া। আটক অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিদেশ পালিয়ে যাওয়া। কোনো আওয়ামী নেতাকে সেনাবাহিনী আটক না করা। যৌথবাহিনী কুমিল্লার নিরপরাধ যুবদল নেতা তৌহিদুল ইসলাম ও ঢাকার যুবদল নেতা এবং জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অ্যাক্টিভিস্ট আসিফ শিকদারকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার ঘটনাগুলো নিয়ে বার বার সতর্ক করা হয়েছে। আওয়ামী তাবেদার মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীকে উপদেষ্টা নিয়োগ করার পরই ছাত্র নেতাদের সতর্ক হবার দরকার ছিল। আমরা অনেকে বিশেষ করে ব্যক্তিগত ভাবে আমি নিজে বিগত ১৬ মাস যাবৎ জুলাই বিপ্লবী ছাত্র নেতাদের সতর্ক করে যাচ্ছি। নিজের খেয়ে আমরা আর কতোকাল বনের মেষ তাড়াবো?
দেশের বহু উচ্চশিক্ষিত লোক, লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী আওয়ামী অপশাসনের বিরুদ্ধে লেখালেখি-সংগ্রাম করে বিগত সাড়ে ১৫ বছর যাবৎ নিষ্ঠুর নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। টক-শোতে আলোচনার কারণে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলীর ছেলেকে পর্যন্ত নির্যাতন করা হয়েছে।

জুলাই বিপ্লবের স্ট্যাকহোল্ডার কাউকেই এ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পর্যায়ে নিয়োগ করা হয়নি। এসব বিষয়ে আমরা বহুবার বলেছি ও সতর্ক করেছি। কেউ কি আমাদের উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন? জুলাই বিপ্লবীদের ভুল পলিসী, ব্যক্তি স্বার্থ ও টাকার লোভে এতো বড় একটা গণবিপ্লব প্রায় মৃত্যুশয্যায় চলে গেল। ভাড়াটে খুনিরা শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে পালিয়ে গেল। দেশের এতগুলো গোয়েন্দা সংস্থা খুনিকে এখনো পর্যন্ত ধরতে পারলো না। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শহীদ হলেন। ইংরেজীতে একটা কথা আছে: ”Man is mortal”. ”মানুষ মাত্রই মরণশীল।” আমরা কেউ অমর নই। সবাইকে একদিন না একদিন মরতেই হবে। এরপরও বলতে হচ্ছে বিপ্লবী ওসমান হাদিকে গুলি করে ঘাতকরা নিরাপদে পালিয়ে যাবে? এ ঘটনা আদৌ মেনে নেয়া সম্ভব? জুলাই বিপ্লবীরা বিপ্লবের ভ্যানগার্ড হয়ে থাকার কথা। রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসন জুলাই বিপ্লবীদের সম্মান ও সমীহ করবে এটাই ছিল স্বাভাবিক।
১/১১ সরকারের আমল থেকে আমরা কঠিন সংগ্রাম করে যাচ্ছি। নির্যাতন-নিপীড়ন, হামলা-মামলা ও জেল-জুলুম সবকিছু সহ্য করেছি। আমাদের পরিবার-পরিজন পর্যন্ত আওয়ামী জালিম ও তাদের সহযোগীদের হাতে নির্যাতিত হয়েছে। জুলাই বিপ্লব আমাদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছিল। এ জন্য জুলাই বিপ্লবীদের আমরা সবধরণের সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়েছিলাম। সুপরামর্শ তাদের কানে পৌঁছেছে বলে তো মনে হয় না। বিপ্লবীদের একের পর এক ভুলের কারণে দৃশ্যপট উল্টে গেছে। তাদের এসব ভুল কি ক্ষমার যোগ্য? এখন অন্যদের সমীহ নিয়ে তাদের চলতে হবে! তাদের জীবন এখন গান পয়েন্টে!
লেখক: সাংবাদিক, গল্পকার ও কলামিস্ট
E-mail: s.iquram03@gmail.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
