মঙ্গলবার দুপুর ২:২৫, ২৯শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ. ১৩ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ খবর:
সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে জাতীয় গণজোটের বিবৃতি হাফেজ আবুল হাসান কুমিল্লার হুজুরের জানাযায় জনতার ঢল ‘আমার স্ত্রী মাকসুদাকে মেরে ফেলেছি, আমাকে থানায় নিয়ে যান’ বন্যার্তদের জন্য জাতীয় সাংবাদিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের আলোচনাসভা ও দোয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া আয়কর আইনজীবী সমিতির অভিষেক ও দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠিত ২৮ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা একাডেমিতে ‘মাতৃভাষা উৎসব’ ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বোর্ড নির্বাচন অনুষ্ঠিত নির্বাচনী পোস্টারে লেমিনেশন ও পলিথিন ব্যবহাররোধে স্মারকলিপি ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর জাতীয় পার্টি: চুন্নু মাতৃভাষা একাডেমিতে কবিতা আড্ডা অনুষ্ঠিত হোমিওপ্যাথিক হেলথ এন্ড মেডিকেল সোসাইটি ব্রাহ্মণবা‌ড়িয়া সম্মেলন অনু‌ষ্ঠিত ব্রাহ্মণবা‌ড়িয়ার বিখ্যাত বাইশমৌজা বাজার ও গরুর হাট

বু‌লেট কখ‌নো বিপ্লব‌কে স্তব্ধ কর‌তে পা‌রে না

২০৯ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

শরীফ ওমমান হা‌দি এখন আর শুধু এক‌টি নাম নয়, কো‌নো একক নেতার নামও নয়। হা‌দি এখন এক‌টি বিশাল প্রতিষ্ঠা‌নের নাম। তার সংগ্রাম কো‌নো ব‌্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজ‌নৈ‌তিক দ‌লের বিরু‌দ্ধে ছিল না ; তার লড়াই ছিল ৫৪ বছরে ধ্বংস হ‌য়ে যাওয়া সমগ্র ব‌্যবস্থার বিরু‌দ্ধে। হা‌দির প্রথম প‌রিচয় হ‌লো তি‌নি একজন সম্মুখসারির জুলাইযোদ্ধা। দেশ বদলা‌তে হ‌লে রাজনী‌তি বদলা‌তে হ‌বে। রাজনী‌তি বদলা‌তে রাজনী‌তি‌বিদ‌দের পুরা‌নো চিন্তা-ভাবনা ও দর্শন বদলা‌তে হ‌বে। হা‌দি ছিল সেই রাজনী‌তি‌কে বদ‌লে দেওয়ার রাজনী‌তি‌বিদ। মাত্র ৩২ বছ‌রের জীব‌নে তি‌নি দে‌খি‌য়ে গে‌ছেন–রাজনী‌তি মা‌নেই ক্ষমতা নয়, রাজনী‌তি মা‌নে আদর্শ।

প্রসঙ্গত, চ‌লিত বছ‌রের ১২ ডি‌সেম্বর দুপুর সোয়া ২ টার দি‌কে বাদজুম্মা রাজধানীর বিজয়নগর পা‌নির ট‌্যাং‌কির সাম‌নে রিকশায় ক‌রে যাওয়ার সময় ওসমান হা‌দির ওপর গু‌লি করা হয়। প‌রে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তা‌কে দ্রুত ঢাকা মে‌ডি‌কেলের জরু‌রি বিভা‌গে নেওয়া হয়। সে‌দিনই প‌রিবা‌রের ইচ্ছায় তা‌কে রাজধানীর এভার‌কেয়ার হাসপাতা‌লে স্থানান্তর করা হয়। এরপর সেখা‌নে নি‌বিড় প‌রিচর্যাকেন্দ্রে তার চি‌কিৎসা চ‌লে। প‌রে উন্নত চি‌কিৎসার জন‌্য ১৫ ডি‌সেম্বর এয়ার অ‌্যাম্বু‌লে‌ন্সে ক‌রে হা‌দি‌কে সিঙ্গাপু‌রে নি‌য়ে যাওয়া হয় ; সেখা‌নেই চি‌কিৎসারত অবস্থায়  ১৮ ডি‌সেম্বর রা‌তে মৃত‌্যু হয় এই জুলাইযোদ্ধার। ১৯ ডি‌সেম্বর তার লাশ দে‌শে আনা হয় এবং ২১ ডি‌সেম্বর দুপুর আড়াইটার দি‌কে জাতীয় সংসদ ভব‌নের দ‌ক্ষিণ প্লাজায় হা‌দির নামা‌জে জানাজা অনু‌ষ্ঠিত হয়। অতঃপর দুপুর ৩.৪৫ মিনি‌টে শাহবা‌গে ক‌বি নজরু‌লের সমাধিস্থ‌লের পা‌শে ওসমান হা‌দি‌কে দাফন করা হয়। ধারণা করা হয়, শহীদ ওসমান হা‌দির  নামা‌জে জানাজায় প্রায় ১০ লক্ষা‌ধিক লোক অংশগ্রহণ ক‌রে‌ছি‌লেন ! স্বাধীন বাংলা‌দে‌শের ইতিহা‌সে কোনো নামা‌জে জানাজায় এত মানু‌ষের সমাগম এক‌টি বিরল ঘটনা।
ভা‌গ্যেবর পুত্র ওসমান হা‌দি প্রিয় মাতৃভূমির বিজয় মা‌সে অ‌নেকটা জুড়ে রাষ্ট্র, সরকার, সংব‌াদমাধ‌্যম, আন্তর্জা‌তিক গণমাধ‌্যম, সামাজিক যোগা‌যোগমাধ‌্যম, পাড়া-মহল্লার চা‌য়ের দোকা‌নে সব জায়গায় দোর্দন্ড প্রতা‌পে দখলে রে‌খে‌ছেন। এক জন‌মে এর চে‌য়ে বড় প্রা‌প্তি কি হ‌তে পা‌রে !  শুক্রবার জুমার দি‌নে নরপিশাচ ঘাত‌কের বু‌লে‌টে মাথার খু‌লি-মগজ ছিন্ন‌ভিন্ন হ‌েয়ে জ্ঞান হা‌রিয়েছেন, আরেক জুমাবা‌রের রা‌তে মহান সৃ‌ষ্টিকর্তার দরবা‌রে হা‌জির‌া দি‌য়ে‌ছেন। এমন সৌভাগ‌্য কজ‌নের হয় ?
শহীদ হা‌দি ছি‌লেন অত‌্যন্ত মেধাবী, ত‌্যাগী ও দেশ‌প্রেমিক মানুষ। হা‌দির  লেখাপড়ার  জীবন শুরু হয়  মাদ্রাসায়। তি‌নি ঝালকা‌ঠি এন এস আলিয়া মাদ্রাসা থে‌কে কৃ‌তিত্বের স‌ঙ্গে ক‌ামিল, দাখিল ও আলিম পাস ক‌রেন।  এই সময় তি‌নি‌ মিশ‌রের আল আজহার বিশ্ব‌বিদ‌্যালয় ও অ‌স্ট্রেলিয়ার সিডনী বিশ্ব‌বিদ‌্যাল‌য়ে স্কলার‌শিপ পান, কিন্তু দেশাত্ব‌বো‌ধে উজ্জী‌বিত হা‌দি ঢাকা বিশ্ব‌বিদ‌্যাল‌য়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞা‌নে ভ‌র্তি হন এবং ওখান থে‌কে আনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন ক‌রেন। তারপর  তি‌নি ইংল‌্যা‌ন্ডের এক‌টি  বিশ্ব‌বিদ‌্যাল‌য়ে শিক্ষক হি‌সে‌বে তার পেশাগত জীবন শুরু ক‌রেন। ‌কিন্তু  ওইখা‌নে মাত্র কিছু‌দিন শিক্ষকতা  করার পর  তিনি দে‌শের টা‌নে দে‌শে ফি‌রে আসেন এবং এক‌টি বেসরকারি বিশ্ব‌বিদ‌্যাল‌য়ে ইং‌রে‌জি সা‌হিত্যে শিক্ষকতা শুরু ক‌রেন। পাশাপাশি ওসমান হা‌দি বি‌ভিন্ন টে‌লি‌ভিশন চ‌্যা‌নে‌লে টক‌শোতে অংশগ্রহণ কর‌তেন। তি‌নি টক‌শোতে জোরা‌লো বক্তব‌্য রাখ‌তেন। এতে দ্রুত তার এক‌টি সমর্থক গো‌ষ্ঠী গ‌ড়ে ও‌ঠে।
জুলাই অভ‌্যূত্থা‌নের পর তার সমর্থক গোষ্ঠী‌কে নি‌য়ে গঠন ক‌রেন ইন‌কিলাব মঞ্চ। ইন‌কিলাব মঞ্চ গঠ‌নের পর চার‌দি‌কে হা‌দির নাম ছ‌ড়ি‌য়ে প‌রে। এটি ছিল মূলত এক‌টি অরাজ‌নৈ‌তিক সংগঠন। তবে এখা‌নে  নিয়‌মিতভা‌বে রাজ‌নৈ‌তিক পাঠ হ‌তো। দে‌শের গ‌তিপথ কি হ‌বে তা নি‌য়ে চলত একা‌ডে‌মিক বিশ্লেষণ। জুলাইকে সা‌হিত‌্য-সংস্কৃ‌তি ও ঐতি‌হ্যের ম‌ধ্যে  নি‌য়ে আসার জন‌্য চলত কসরত। বাংলা‌দেশ‌কে উচ্চত‌ায় নি‌য়ে যাওয়ার জন‌্য চলত আপলাপ-আলোচনা। বাংলা‌দে‌শের বে‌শির ভাগ রাজ‌নৈ‌তিক-সামা‌জিক ও সাংস্কৃ‌তিক  সংগঠ‌নের ম‌ধ্যে এধর‌নের চর্চা নেই বললেই চ‌লে।
জুলাই বিপ্ল‌বের পর জুলাইয়ের কিছু নেতা ও যোদ্ধা দেশ-‌বি‌দে‌শের নানা ষড়য‌ন্ত্রের ফাঁ‌দে প‌ড়ে হোক কিংবা লো‌ভে প‌ড়ে অ‌ঢেল বিত্ত‌বৈভ‌বের মা‌লিক ব‌নে যাওয়ার ধান্ধায় হোক–তারা নানা বিতর্কিত কর্মকা‌ন্ডে জ‌ড়িয়ে পড়‌লেও একজন ওসমান হা‌দি বুক টান ক‌রে দে‌শের প‌ক্ষে কথা ব‌লে গে‌ছেন সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা ক‌রে। ওসমান হা‌দি‌কে কো‌নো টাকাপয়সা, লোভ-লালসা স্পর্শ কর‌তে পা‌রে‌নি। তি‌নি বল‌তেন, কাউকে না কাউকে দাঁড়ি‌য়ে যেতে হ‌বে দেশ রক্ষার জন‌্য, জুলাইয়ের চেতনা রক্ষার জন‌্য, নতুন ব‌ন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার জন‌্য-আমি সেই একজন হ‌য়ে যাই, মরণ হ‌লেও কো‌নো সমস‌্যা নেই।
সবসময় শাহাদ‌তের তামান্না ব‌য়ে বেড়া‌তেন ওসমান হা‌দি। গু‌লি‌বিদ্ধ হওয়ার দুদিন আগেও তি‌নি এক‌টি ভি‌ডিও সাক্ষাৎকা‌রে ব‌লে‌ছি‌লেন, ‘আমি চাই, আমি কো‌নো মি‌ছি‌লের সাম‌নে আছি, আর এক‌টি বু‌লেট আমার জীবনটা কে‌ড়ে নি‌য়ে আমা‌কে শহীদ ক‌রে দিল।’ তি‌নি বহুবার ব‌লে‌ছি‌লেন, ‘আমা‌কে বু‌লেট ছাড়া  কেউ থামা‌তে পার‌বে না। আমি শহীদ  হ‌লেও কো‌নো সমস‌্যা নেই ; আমরা খু‌নির যেন বিচার হয়’। তি‌নি আরো ব‌লে‌ছি‌লেন, ‘ মৃত‌্যুর ফয়সালা জ‌মি‌নে না, আসমা‌নে হয়। আমি পৃ‌থিবী থে‌কে চ‌লে গে‌লেও আমার সন্তান লড়‌বে। তার সন্তান লড়‌বে। য‌ুগ–যুগান্ত‌রে আজা‌দের সন্তানরা স্বাধীনতার পতাকা সমুন্নত রাখ‌বেই’।  তার এই কথায় সৃ‌ষ্টিকর্তার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সাহ‌সের প‌রিচয় পাওয়া যায়।  ওসমান হা‌দির  শাহাদ‌তের এই ক‌ঠিন তামান্ন‌া আল্লাহতায়লা কবুল ক‌রে‌ছেন। কিন্তু পরিতা‌পের বিষয়, তার হত‌্যাকরী‌কে এখ‌নো পযর্ন্ত আইনের আওতায় আনা যায়‌নি। এটা আন্তর্বর্তীকালীন সরকা‌রের চরম ব‌্যর্থতা।
জুলাই অভ‌্যূত্থা‌নের সময় হা‌দি শুধু রাস্তায় ছি‌লেন না, তি‌নি ছি‌লেন চিন্তায়, বক্ত‌ব্যে, সংগঠ‌নে। তি‌নি বল‌তেন, ‘ ফ‌্যা‌সিজম শুধু এক‌টি দ‌ল নয়, ফ‌্যা‌সিজম এক‌টি মান‌সিকতা।’ এ মান‌সিকতা বিরু‌দ্ধেই ছিল তার যুদ্ধ। হা‌দি কখ‌নো ধোঁয়াশায় কথা বলে‌ননি। তি‌নি ফ‌্যা‌সিস্ট‌কে ফ‌্যা‌সিস্ট বল‌তেন, নাম ধ‌রে বল‌তেন, দল ধ‌রে বল‌তেন, রাষ্ট্রয‌ন্ত্রের অপব‌্যবহার‌কে চিহিৃত কর‌তেন। এ কার‌ণেই তি‌নি টা‌র্গেট ছি‌লেন, এ কার‌ণেই তা‌কে গু‌লি করা হ‌য়ে‌ছিল, এ কার‌ণেই তার জীবন নিরাপদ ছিল না। তি‌নি জান‌তেন ঝুঁকি আছে, তবু  পি‌ছি‌য়ে যান‌নি। কারণ তি‌নি বিশ্বাস কর‌তেন–ভয়‌কে জয় না কর‌লে রাষ্ট্রকে বাঁচা‌নো যায় না।
ওসমান হা‌দির দর্শন ছিল যাবতীয় আধিপত‌্যবাদের বিরু‌দ্ধে, মানবতা ও সার্ব‌ভৌম‌ত্বের প‌ক্ষে। তি‌নি শুধু দে‌শের ভেত‌রের ফ‌্যা‌সিজম নয়, বাইরের রাজ‌নৈ‌তিক আধিপত‌্যবাদ‌কেও প্রশ্ন কর‌তেন। তিনি স্পষ্ট ক‌রে বল‌তেন–বাংলা‌দেশ কো‌নো আশ্রিত্বরাজ‌্য নয়। এ রাষ্ট্র কা‌রো করুণা নয়, এ রাষ্ট্র রক্ত দি‌য়ে কেনা। তার এই অবস্থান অ‌নে‌কেরই পছন্দ হয়‌নি। এ জন‌্য দেশ-‌বি‌দেশ থে‌কে ফো‌নে ও মে‌সেজ পা‌ঠি‌য়ে বহুবার তা‌কে হত‌্যার হুম‌কিও দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। তারপরও হা‌দি অন‌্যায়ের সা‌থে আপস ক‌রে‌নি। এ প্রস‌ঙ্গে হা‌দির বক্তব‌্য ছিল, আধিপত‌্যবা‌দের স‌ঙ্গে আপস ও সম‌ঝোতা  মা‌নেই ভ‌বিষ‌্যতের স‌ঙ্গে প্রতারণা।
ওসমান হা‌দির লড়াই শুধু রাজনী‌তি‌তে সীমাবদ্ধ ছিল না। তি‌নি সংস্কৃ‌তির প্রশ্নেও ছি‌লেন স‌চেতন। তি‌নি বল‌তেন–সংস্কৃ‌তি দি‌য়ে যখন জা‌তি‌কে দুর্বল করা হয়, তখন রাজ‌নৈতিক দখল সহজ হ‌য়ে যায়। তি‌নি তরুণ‌দের নিয়ে কথা বল‌তেন, ভ‌াষা নি‌য়ে বল‌তেন। ইতিহাস বিকৃ‌তির বিরু‌দ্ধে বল‌তেন।  তি‌নি বিশ্বাস কর‌তেন, সংস্কৃ‌তির স্বাধীনতা ছাড়া রাজ‌নৈ‌তিক স্বাধীনতা টে‌কে না। এ কার‌ণেই তি‌নি শুধু মি‌ছি‌লেন নেতা ছি‌লেন না, তি‌নি ছি‌লেন আলোচন‌ার মানুষ, বক্তৃতার মানুষ, লেখ‌ার মানুষ।
শরীফ ওসমান হা‌দি ছি‌লেন সরল, কিন্তু সহজ নয়। তি‌নি ছি‌লেন এমন একজন মানুষ, যি‌নি জীবন‌কে ভোগ নয়, দা‌য়িত্ব হি‌সে‌বে দে‌খে‌ছেন। তার রাজনী‌তি সু‌বিধার ছিল না, ছিল ঝুঁ‌কির। হা‌দি বিশ্বাস করতেন, চুপ থাকা কখ‌নো নি‌রপেক্ষতা নয়। চুপ থাকা অ‌নেক সময় অপরাধ। তি‌নি বল‌তেন, ‘জীবন মা‌নে শুধু বেঁ‌চে থাকা নয়, মাথা উঁচু ক‌রে বাঁচাই জীবন।’ এই এক‌টি বা‌ক্যেই ধার প‌ড়ে তার জীবনদর্শন। তি‌নি নিরাপদ রাজনীতি‌তে বিশ্বাস কর‌তেন না।  তি‌নি বল‌তেন, ‘‌নিরাপদ রাজনী‌তি মা‌নে সু‌বিধা‌ভোগী‌দের রাজনী‌তি।’ এ কার‌ণেই তি‌নি অ‌নে‌কের কা‌ছে অস্ব‌স্তিকর ছি‌লেন। আর এ কার‌ণেই তি‌নি লক্ষ‌্যবস্তু‌তে প‌রিণত হ‌য়ে‌ছি‌লেন। হা‌দির কা‌ছে রাষ্ট্র ছিল ক্ষমতার কাঠা‌মো নয়, রাষ্ট্র ছিল নৈ‌তিকতার প্রশ্ন। তি‌নি স্পষ্ট ক‌রে বল‌তেন, ‘রাষ্ট্র য‌দি নাগ‌রিকের মর্যাদা না দেয়, তাহ‌লে সেই রা‌ষ্ট্রেকে প্রশ্ন করাই নাগ‌ি‌রকের দা‌য়িত্ব।’ এই কথার ম‌ধ্যেই ছিল তার রাজনী‌তির কেন্দ্রবিন্দু। তি‌নি ভয়‌কে রাজনীতির ভাষা হ‌তে‌ দেন‌নি। তি‌নি বল‌তেন, ‘ভয়‌কে যদি রাজনী‌তির ভি‌ত্তি বানা‌নো হয়, তাহ‌লে রাষ্ট্র একদিন জেলখানা হ‌য়ে যা‌বে।
বাংলা‌দে‌শে আওয়ামী লীগ ও বিএন‌পিদলীয় প্রধ‌ান নির্বাচ‌নের ক্ষে‌ত্রে পু‌রোপু‌রি প‌রিবারতা‌ন্ত্রিক। বাংলা‌দে‌শের রাজনী‌তির মিড বা আপার মিড লে‌ভে‌লের নেতৃত্ব থা‌কে আস‌লে রাজ‌নৈ‌তিক এলিট বা অ‌ভিজাত‌দের হা‌তে। একজন সাধারণ মানু‌ষের প‌ক্ষে নি‌জের মেধা, যোগ‌্যতা এবং প‌রিশ্রম দিয়ে সেখা‌নে দলীয় প্রধা‌নের প‌দে পৌঁছা‌নো প্রায় অসম্ভব। এই অসম্ভব কাজটা শহীদ ওসমান হা‌দি কর‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লেন।
হা‌দি নি‌জের চে‌য়ে অ‌নেক বে‌শি হে‌ভিও‌য়েট একজন রাজ‌নৈ‌তিক প্রতিপ‌ক্ষের বিরু‌দ্ধে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নি‌য়ে‌ছি‌লেন। পু‌রো নির্বাচনি এলাকা হেঁ‌টে তি‌নি গণসং‌যোগ কর‌তেন। মানু‌ষের স‌ঙ্গে কুশল‌বি‌নিময় কর‌তেন। নির্বাচনে কা‌লো টাকা এবং পে‌শিশক্তির ওপন নির্ভর না ক‌রে তি‌নি সাধারণ মানু‌ষের অনুদান ও জনতার ভা‌লোবাসার ওপরই আস্থা রে‌খে‌ছি‌লেন। শেষ পর্যন্ত তি‌নি জিত‌তে পার‌তেন কি না–‌সে‌টি তর্কসা‌পেক্ষ এবং এই মুহূ‌র্তে অপ্রাস‌ঙ্গিক। ত‌বে তি‌নি যে জনগ‌ণের ম‌ধ্যে ব‌্যাপক সাড়া ফেল‌তে পে‌রে‌ছি‌লেন, এ ব‌্যাপা‌রে স‌ন্দেহের অবকাশ নেই। কো‌টি কো‌টি টাকা ছাড়াও যে নির্বাচন করা যায়, এই ধারা‌ভে‌ঙে দি‌তে যা‌চ্ছি‌লেন ওসমান হা‌দি, যা বড় ধর‌নের চ‌্যা‌লেঞ্জ হ‌য়ে দাঁ‌ড়ি‌য়ে‌ছিল প্রচ‌লিত ঘু‌ণে ধরা রাজনী‌তির সাম‌নে।
ওসমান হা‌দির এই ব‌্যতিক্রমধর্মী রাজনী‌তি আস‌লে বাংলা‌দে‌শে এতকাল ধ‌রে চ‌লে আসা সামন্ত্রতা‌ন্ত্রিক রাজনীতির ভিত না‌ড়ি‌য়ে দি‌য়ে‌ছিল। হা‌দির কর্মকান্ডে উদ্ধুদ্ধ হ‌য়ে য‌দি বাংলা‌দে‌শের উচ্চ‌শি‌ক্ষিত, মধ‌্যবিত্ত, সৎ এবং রক্ষণশীল যুবক-যুবতীরা য‌দি দ‌লে দ‌লে রাজনী‌তি‌তে যোগদান ক‌রেন, সেটা বাংলা‌দে‌শের রাজ‌নৈ‌তিক সংস্কৃ‌তি‌কে পু‌রোপু‌রি বদ‌লে দি‌তে পা‌রে। এই ভয়টা পু‌রো‌নো অ‌ভিজাতদের ম‌ধ্যে হা‌দি ভা‌লোভা‌বেই ঢোকা‌তে পে‌রে‌ছি‌লেন।
ওসমান হা‌দির ধর্ম‌চিন্তা ছিল গভীর, কিন্তু প্রদর্শনমূলক নয়। তি‌নি ধর্ম‌কে কখ‌নো ক্ষমতার হা‌তিয়ার ক‌রেন‌নি। তি‌নি বল‌তেন, ‘ধর্ম আমার কা‌ছে ক্ষমতার হা‌তিয়ার নয়, ধর্ম আমার কা‌ছে বি‌বে‌কের জায়গা।’ তার কা‌ছে ধর্ম মা‌নে ছিল অন‌্যা‌য়ের বিপ‌ক্ষে দাঁড়া‌নো আর  ‘যে ধর্ম অন‌্যা‌য়ের প‌ক্ষে দাঁড়ায়, সেটা ধর্ম নয়, সেটা ব‌্যবহার।’ এই বক্ত‌ব্য তা‌কে আলাদা ক‌রে‌ছে। কারণ তি‌নি ধর্ম নি‌য়ে রাজনী‌তি ক‌রেন‌নি এবং  রাজনী‌তি দি‌য়ে ধর্ম‌কে বি‌ক্রিও ক‌রে‌ন‌নি। সব সময় বল‌তেন, ‘মহান আল্লাহ অন‌্যা‌য়ের স‌ঙ্গে নেই–এ বিশ্বাসটাই আমার রাজনী‌তি।’ এটা কো‌নো স্লোগান ছিল না। এটা ছিল তার নৈ‌তিক অবস্থান।
আজ ওসমান হা‌দি নেই। কিন্তু ইতিহাস আবার প্রমাণ করেছে–একজন বিপ্লবী আততায়ীর হা‌তে ম‌ারা গে‌লেও বিপ্লব ম‌রে না। বরং ত‌ার রক্ত থে‌কে জন্ম নেয় অসংখ‌্য নতুন বিপ্লবী। আজ ওসমান হা‌দি নেই, কিন্তু তার দর্শন ও আর্দশ  থে‌কে ইতিম‌ধ্যে কো‌টি কো‌টি ওসমান হাদি জন্ম নিয়েছে। ত‌ার মৃত‌্যু সংবাদ ছ‌ড়ি‌য়ে পড়ার স‌ঙ্গে স‌ঙ্গে  লা‌খো-‌কোটি জনত‌ার ম‌ধ্যে দ্রোহ ও প্রতি‌শো‌ধের আগু‌নের যে স্ফু‌লিঙ্গ দেখা দি‌য়ে‌ছে, ত‌া অভূতপূর্ব। সারা বাংলা‌দে‌শের আনা‌চে-কানা‌চে ওসমান হা‌দির মৃত‌্যুর প্রতিবাদ উচ্চা‌রিত হ‌চ্ছে। তার জন‌্য সবাই মহান সৃ‌ষ্টিকর্তার নিকট দোয়া কর‌ছে এবং তা‌দের চো‌খে অশ্রু ঝর‌ছে।
বস্তুত, ইতিহা‌সের নির্মম সত‌্য হ‌লো–দমন ক‌রে কো‌নো জাগরণ‌কে থামা‌নো যায় না। গু‌লি কখ‌নো কো‌নো আদর্শ‌কে কিংব‌া বিপ্ল‌বকে স্তব্ধ ক‌রে দি‌তে পা‌রে না। আজ বাংলা‌দে‌শে লা‌খো-কো‌টি তরুণ-তরুণী তার শাহাদ‌তে অনুপ্রা‌ণিত হ‌য়ে দে‌শের জন‌্য লড়াই কর‌তে প্রস্তুত। র‌ক্তের শেষ বিন্দু থাকা পর্যন্তও  নতুন প্রজন্ম ও আমজনতা আমা‌দের এই প্রিয় জন্মভূ‌মি বাংলা‌দেশ‌কে কো‌নো দে‌শের কা‌ছে জি‌ম্মি হ‌তে দে‌বে না। ‌বি‌দেশী কো‌নো আধিপত্যের কা‌ছে ব‌াংলা‌দেশ কখ‌নো ম‌াথা নত ক‌র‌বে না। আজ  দেশ‌প্রেমিক, ইসলামপ‌ন্থি, প্রগতিশীল ও জা‌তিয়তাবাদী শ‌ক্তি‌কে ঐক‌্যবদ্ধ হ‌য়ে  শহীত  ওসমান হা‌দির আদর্শ ও দর্শন থে‌কে শিক্ষা নিয়ে সাম‌্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, বৈষম‌্যহীন ও ন‌্যায়‌ভি‌ত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন‌্য নিরন্তর সংগ্রাম চালি‌য়ে যে‌তে হ‌বে।
খায়রুল আকরাম খান
ব‌্যু‌রো চীফ : deshdorshon.com

Some text

ক্যাটাগরি: Uncategorized

Leave a Reply

ইরানের স্বৈরশাসক রেজা শাহ ও…

ইসলামের দৃষ্টিতে কদমবুচি করা কি…

প্রশ্নের মুখে নিউজ মিডিয়া ও…