মঙ্গলবার দুপুর ২:১০, ২৯শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ. ১৩ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ খবর:
সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে জাতীয় গণজোটের বিবৃতি হাফেজ আবুল হাসান কুমিল্লার হুজুরের জানাযায় জনতার ঢল ‘আমার স্ত্রী মাকসুদাকে মেরে ফেলেছি, আমাকে থানায় নিয়ে যান’ বন্যার্তদের জন্য জাতীয় সাংবাদিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের আলোচনাসভা ও দোয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া আয়কর আইনজীবী সমিতির অভিষেক ও দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠিত ২৮ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা একাডেমিতে ‘মাতৃভাষা উৎসব’ ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বোর্ড নির্বাচন অনুষ্ঠিত নির্বাচনী পোস্টারে লেমিনেশন ও পলিথিন ব্যবহাররোধে স্মারকলিপি ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর জাতীয় পার্টি: চুন্নু মাতৃভাষা একাডেমিতে কবিতা আড্ডা অনুষ্ঠিত হোমিওপ্যাথিক হেলথ এন্ড মেডিকেল সোসাইটি ব্রাহ্মণবা‌ড়িয়া সম্মেলন অনু‌ষ্ঠিত ব্রাহ্মণবা‌ড়িয়ার বিখ্যাত বাইশমৌজা বাজার ও গরুর হাট

সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ড ও বাংলাদেশে বিনাবিচারে খুনের সূচনা!

১৫২ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

সিরাজ সিকদারের মৃত্যু নিয়ে তৎকালীন জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সংবাদপত্র বিচিত্রা প্রচ্ছদ কাহিনী করেছিল। সম্ভবত সেটাই সিরাজ সিকাদারের হত্যাকান্ডের বিষয়ে প্রথম অনুসন্ধানী রিপোর্ট। ১৯৭৮ সালের জন্য অনেক কিছুই ছিল নতুন। এর অনেক কিছুই এখন হয়তো বিজ্ঞ ও বয়স্ক পাঠকদের জানা। এ জঘন্য ও নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনা সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বিস্তারিত জানে না। তাদের জন্য আজকের আয়োজন।

নিচের কবিতাটি সিরাজ সিকদারের।

”বার বার ঘুরে ফিরে

মনে পড়ে তোমাদের কথা

এক সাথে বা একা।

সাভারের লাল মাটি

ছোট ছোট টিলা

শাল-কাঠালের বন এখানে দাঁড়িয়েছিল ।

কিন্তু কালো মেঘে

ঢেকে গেল আকাশ।

সাভারের লাল মাটি

আরো লাল হলো –

তোমাদের পবিত্র রক্তে”।

সাভারের লাল মাটি–সিরাজ সিকদার, গণযুদ্ধের পটভূমি “৭৩ কবিতাগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা-২৩

খুবই নৃশংস অত্যাচার-নির্যাতন করে সিরাজ সিকদারকে খুন করা হয়। এটা ছিল ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নামের আলাদা দেশ হবার পর এক্সট্রা জুডিসিয়াল কিলিং বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের সূচনা। এ নির্মম ও নৃশংস হত্যাকান্ডের পরই শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মৃত্যুর পর্ব শুরু হয়।

৩রা জানুয়ারি ১৯৭৫। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় সংবাদ শিরোনাম: সিরাজ সিকদার গ্রেফতার: পালাতে গিয়ে নিহত। ২রা জানুয়ারি গভীর রাতে প্রদত্ত পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে বলা হলো ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’ নামে পরিচিত আত্মগোপনকারী চরমপন্থী দলের নেতা সিরাজুল হক সিকদার ওরফে সিরাজ সিকদারকে পুলিশ গত ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামে গ্রেফতার করে। সে দিনই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি দেন এবং তার দলীয় কর্মীদের কিছু গোপন আস্তানা এবং তাদের বেআইনী অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দেখিয়ে দেয়ার জন্য পুলিশের সাথে যেতে সম্মত হন। তদনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে একদল পুলিশ যখন তাকে পুলিশ ভ্যানে করে গোপন আন্তানার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন তিনি সাভারের কাছে পুলিশের ভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। পুলিশ তার পলায়ন রোধের জন্য গুলিবর্ষণ করে। ফলে ঘটনাস্থলেই সিরাজ সিকদারের মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে সাভার থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

৩রা জানুয়ারি ১৯৭৫। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় সংবাদ শিরোনাম: সিরাজ সিকদার গ্রেফতার: পালাতে গিয়ে নিহত। ২রা জানুয়ারি গভীর রাতে প্রদত্ত পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে বলা হলো পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামে পরিচিত আত্মগোপনকারী চরমপন্থী দলের নেতা সিরাজুল হক সিকদার ওরফে সিরাজ সিকদারকে পুলিশ গত ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামে গ্রেফতার করে। সে দিনই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সিরাজ সিকদার তার গোপন দলে একদল ডাকাতের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। এদের দ্বারাই তিনি গুপ্তহত্যা, থানা, বনবিভাগ দপ্তর, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ইত্যাদির উপর হামলা, ব্যাংক লুট, হাট বাজার, লঞ্চ, টেন ডাকাতি রেললাইন উপড়ে ফেলে গুরুতর ট্রেন দুর্ঘটনা সংঘটন এবং জন সাধারণের কাছ থেকে জবরদস্তি টাকা আদায়–এ ধরণের উচ্ছৃঙ্খল অপরাধের মাধ্যমে দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলাকে বিঘ্নিত করেছিলেন।

 

পরবর্তী ঘটনার সরকারি ভাষ্যও মোটামুটি সকলের জানা। ৪ জানুয়ারির সংবাদপত্রে বলা হয়, আত্মীয় পরিজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় গতরাত প্রায় ৮টার সময় উগ্রপন্থী গুপ্তদলের নেতা সিরাজ সিকদারকে মোহাম্মদপুর ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তার বাবা জনাব আবদুর রাজ্জাক সিকদার তার কবরের জন্য ওই সংরক্ষিত গোরস্তানে জমি কিনেছেন এবং তার অনুরোধে পুলিশ প্রহরায় তারই খরচে দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়। ঢাকার পুলিশ সুপার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ খবর দেন। ময়না তদন্তের স্থলে পুলিশ মৌখিক ভাবে জানায় যে ২রা জানুয়ারী দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে নিহত সিরাজ সিকদারের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে আনা হয়।

সন্দেহের সূত্রপাত এবং বিচিত্রার তদন্ত:

পুলিশের উপরোক্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বাইরে এর চেয়ে বেশি কিছু জনগণের জানার উপায় ছিল না। জনমনে সন্দেহ থেকে যায়। ১৯৭৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা এ সন্দেহের কারণ।

১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইন্ডিয়ান সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এবং এ তারিখকে ‘কালো দিবস’ আখ্যায়িত করে পুর্ব বাংলার সর্বহারা পাটি দেশব্যাপী হরতাল পালনের আহবান জানায়। তাতে নয়টি জেলায় পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। সে হরতালের প্রতিক্রিয়া ঢাকাতেও লক্ষ্য করা গিয়েছিল।

এর কিছুদিন পরেই ভূটানের রাজার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফরের সময় ২৮ ডিসেম্বর সংবিধানের ১০১(ক) ধারার ১ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সারা বাংলাদেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন। ঘোষণায় বলা হয়, ‘একদল লোক, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এবং এক সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রতিহত করতে যথাসাধ্য প্রয়াস পেয়েছিল তারা তখন থেকেই বিভিন্ন রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় নিয়োজিত রয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যারা ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়েছিল তারাও এদের সাথে যোগ দিয়েছে। নিজেদের জাতি বিরোধী অপরাধের জন্য কুখ্যাত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কিছু দালাল, চরমপন্থী লোকজন ও এ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য বিদেশী শক্তির অর্থপুষ্ট শত্রু এজেন্টরা–এরা সবাই এখন এমন সব কার্যকলাপে নিয়োজিত যা স্বাভাবিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু অর্থনৈতিক অগ্রগতির ব্যাপারে এক অসম্ভব অবস্থা তৈরি করেছে।

পরবর্তী পর্যায়ে ১লা জানুয়ারি চট্টগ্রামে সিরাজ সিকদার গ্রেফতার হন। ২ জানুয়ারি রাতে তাকে নৃশংস কায়দায় খুন করা হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দুপুর ১:১৫টায় শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট পদে শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহণের পর শেখ মুজিব সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?’ আজ জনমনে প্রশ্ন জেগেছে এ মৃত্যু সম্পর্কে। জনসভায় বলা হচ্ছে এটা মৃত্যু নয়, হত্যাকান্ড। সে সময়ের সরকারি দলের নেতারা শুধু উপরোক্ত প্রেস রিলিজের কথাই উল্লেখ করেছেন।

তদন্ত রিপোর্ট:

সিরাজ সিকদার কিভাবে গ্রেফতার হন এবং পুলিশী নিরাপত্তায় কিভাবে তার মৃত্যু ঘটে তার সঠিক ভাষ্য এখনো জানা যায়নি। কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে আমরা যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছি তাকে নির্ভরযোগ্য মনে করেই আমরা তা প্রকাশ করছি।

১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি দলের নেতৃস্থানীয় কর্মীদের বৈঠকে যোগ দেয়ার জন্য চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন সিরাজ সিকদার। এর আগেই তিনি সংবাদ পেয়েছিলেন তাকে গ্রেফতার করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে।

পরবর্তী পর্যায়ে ১লা জানুয়ারি সিরাজ সিকদার চট্টগ্রামে গ্রেফতার হন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দুপুর ১:১৫টায় শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট পদে শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহনের পর সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কোথায় আজ সিরাজ সিকদার? আজ জনমনে প্রশ্ন জেগেছে এ মৃত্যু সম্পর্কে। জনসভায় বলা হচ্ছে এটা মৃত্যু নয়, হত্যাকান্ড। সে সময়ের সরকারি দলের নেতারা শুধু উপরোক্ত প্রেস রিলিজের কথাই উল্লেখ করেছেন।

১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই তার দলের ওপর ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে। হরতাল আহবানের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রেফতার হয়ে যায় বহু কর্মী। অপরদিকে ১৯৭২ সালে দল পরিচালনার জন্য ছয় সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা  হয়। ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে সদস্য সংখ্যা দুই-এ পৌঁছে। সেপ্টেম্বর মাসে আরো একজন সদস্য ব্যক্তিগত ব্যর্থতার কারণে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অপসারিত হলে অবশিষ্ট থাকেন শুধুমাত্র সিরাজ সিকদার।

সিরাজ সিকদারের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ছাত্রাবস্থায়। ১৯৬৭ পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) এর সাথে জড়িত ছিলেন। কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতিও হয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি কয়েকজন সমমতাবলম্বীকে নিয়ে সিরাজ সিকদার ‘পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন’ নামে একটি ‘প্রস্তুতি’ সংগঠন গঠন করেন।

১৯৭১ সালেরর ৩ জুন বরিশাল জেলার পেয়ারা বাগানে এ আন্দোলনকেই তিনি পার্টিতে রূপান্তরিত করেন। ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি এ পার্টির প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৩–৭৪ সালে সাংগঠনিক ভাবে এর বিকাশ ঘটে। বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তি এ সংগঠনে যোগদান করেন। যেমন: লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জিয়া উদ্দীন (অব:) প্রমূখ। সর্বশেষ ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের হরতালের প্রতি মওলানা ভাসানীর সমর্থন সিরাজ সিকদারের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে শক্তি জোগায়। ১৯৭৪ সালে দলের ব্যাপক বিকাশের সময় তার দলে বহু অবাঞ্ছিত লোকের অনুপ্রবেশ ঘটে। যা পরবর্তীতে তার গ্রেফতারের কারণ বলে ধারণা করা হয়।

খুবই নৃশংস অত্যাচার-নির্যাতন করে সিরাজ সিকদারকে খুন করা হয়। এটা ছিল ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নামের আলাদা দেশ হবার পর এক্ট্রা জুডিসিয়াল কিলিং বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের সূচনা। এ নির্মম ও নৃশংস হত্যাকান্ডের পরই শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মৃত্যুর পর্ব শুরু হয়।

গ্রেফতারের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে এবং বিভিন্ন সূত্রে সে সংবাদ পেয়ে সিরাজ সিকদার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি আরো গোপন অবস্থানে সরে যাবেন। তার দলের অভিযোগ ১৯৭৪ সালেই জনৈক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার ভাগনে এ দলের সদস্যপদ লাভ করে। তার মাধ্যমে সিরাজ সিকদারকে পাঠানো সবগুলো সতর্কীকরণ চিঠিই পুলিশের হাতে পৌছে যায়। এ ভাবেই ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি তার চট্টগ্রাম বৈঠকের খবর পুলিশ জানতে পারে।

চট্টগ্রাম (হালিশহর) বৈঠকে আমন্ত্রিত সবাই উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষ হবার আগে নিয়ম ভঙ্গ করে একজন সদস্য ঘুরে আসার কথা বলে বাইরে চলে যায়। পরে সে আর ফিরে আসেনি। নিরাপত্তার কারণে সে বৈঠকে নির্ধারিত হয়েছিল সকলের আগে ‘কুরিয়ার’ সহ বেরিয়ে যাবেন সিরাজ সিকদার। সে মোতাবেক সিরাজ সিকদার মহসিনকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

কিছুদূর গিয়ে তারা একটি বেবীট্যাক্সী ভাড়া করেন। এ সময় তার পরনে ছিল ঘি রঙয়ের প্যান্ট, টেট্রনের সাদা ফুলশার্ট, চশমা এবং হাতে একটি ব্রীফকেস। হালিশহরে বৈঠক শেষে তারা বেবীট্যাক্সীতে ওঠছেন। ঠিক সেসময় একজন অপরিচিত ব্যক্তি তাদের কাছে লিফট চায়। সিরাজ সিকদার জানতে চান–

–আপনি কোথায় যাবেন?

–আমি সামনে গিয়ে নেমে যাব।

–অন্য ট্যাক্সী দেখুন না।

–আপনারা যদি আমাকে নিয়ে যান তাহলে খুবই উপকার হয়। (অনুনয়ের সাথে)

এরপরই সে লোক ট্যাক্সীতে চড়ে বসে।

পুলিশ পূর্বের সংবাদ অনুযায়ী চট্টগ্রাম শহর থেকে হালিশহর পর্যন্ত পুরো রাস্তার ওপর কড়া নজর রেখেছিল। বেবীট্যাক্সী যখন নিউ মার্কেটের (বিপনী বিতান) এর কাছে আসে তখনই সে অনাহুত সহযাত্রী ট্যাক্সী থামাতে বলেন। একপর্যায়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। সাথে সাথে সে অচেনা লোক লাফ দিয়ে বেবীট্যাক্সীর সামনে গিয়ে পিস্তল উচিয়ে ড্রাইভারকে থামাতে বলে। ভয়ে ড্রাইভার গতিরোধ করে। সাথে সাথে চার পাশ থেকে স্ট্যানগান হাতে সাদা পোশাকের পুলিশ বেবীট্যাক্সীটি ঘেরাও করে।

ঘটনার আকস্মিকতায় জমে যায় লোকজন। একজন ভদ্রলোকের এ পরিণতির কারণ জানতে চাইলে জবাব দেয়া হয়–‘সে একজন পলাতক কালোবাজারী। তাই তাকে এভাবেই গ্রেফতার করা হচ্ছে’। বেবীট্যাক্সী আটক করার পরই ছয়জন স্ট্যানগানধারীর একজন সিরাজ সিকদারের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেয় এবং চোঁখ বেধে ফেলে। সাথী মহসিনেরও একই পরিণতি হয়।

গ্রেফতারের পর সিরাজ সিকদারকে ডাবলমুরিং থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ থানা থেকেই খবর পাঠানো হয় সর্বত্র এবং জরুরি ভিত্তিতে সেদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম ঢাকা বিমানে বন্দীদের জন্য আসন সংগ্রহ করা হয়।

৬:৪৫ টায় যে বিমানে তাদের ঢাকা নিয়ে আসা হয় সে বিমানটি কক্সবাজার থেকে যাত্রী নিয়ে এসেছিল। চট্টগ্রাম পৌঁছার পর নিয়মভঙ্গ করে ঢাকাগামী যাত্রীদের নেমে যেতে বলা হয়।

যাত্রীরা নেমে গেলে একটি বিশেষ গাড়িতে করে নিয়ে আসা হয় বন্দীদের। ককপিটের পরেই সামনের চারটি আসন তাদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। বিমান ছাড়ার সময় বিপত্তি দেখা দেয়। বিমানের পাইলট বন্দী অবস্থায় কোন যাত্রীকে বহন করতে অস্বীকার করেন। কিছুটা বাকবিতন্ডার পর বাংলাদেশ বিমানের সে ফকার বিমানটি ঢাকার উদ্দেশে পাড়ি জমায়।

ঢাকা পৌঁছানোর পর পরই তড়িঘড়ি করে নামিয়ে দেয়া হয় যাত্রীদের। তারপর বিমানটিকে হ্যাঙ্গারের কাছে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই পেছনের গেট দিয়ে আসা পুলিশের গাড়ি অপেক্ষা করছিল।

যাত্রীরা নেমে গেলে একটি বিশেষ গাড়িতে করে নিয়ে আসা হয় বন্দীদের। ককপিটের পরেই, সামনের চারটি আসন তাদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। বিমান ছাড়ার সময় দেখা দেয় বিপত্তি। বিমানের পাইলট বন্দী অবস্থায় কোন যাত্রীকে বহন করতে অস্বীকার করেন। কিছুটা বাকবিতন্ডারর পর ঢাকার উদ্দেশে পাড়ি জমায় বাংলাদেশ বিমানের সে ফকার বিমানটি।

বিমান থেকে অবতরণের সময় আকস্মিক ভাবে পুলিশের জনৈক ইন্সপেক্টর দৌড়ে এসে সিরাজ সিকদারের বুকে লাথি মেরে চীৎকার করে ওঠে ‘হারামজাদা তোর বিপ্লব কোথায় গেল?’ এ পর্যায়ে উপস্থিত পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করে নতুন আক্রমণের হাত থেকে সিরাজ সিকদারকে রক্ষা করে। মন্তব্য করে যে–‘এতো অস্থির হচ্ছ কেন কা….. ঘরে নিয়েই আমরা দেখে নেব।’

বিমান থেকে সিরাজ সিকদারকে সোজা নিয়ে যাওয়া হয় স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসে। সেখানে পাগলা ঘন্টি বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দেয়া হয়। সর্বত্র একটা সাড়া পড়ে যায়। স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিস ঘিরে ফেলে কয়েকশ পুলিশ। এ বক্তব্য সে সময়ে আটক এক রাজনৈতিক কর্মীর।

চট্টগ্রাম (হালিশহর) বৈঠকে আমন্ত্রিত সবাই উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষ হবার আগে নিয়ম ভঙ্গ করে একজন সদস্য ঘুরে আসার কথা বলে বাইরে চলে যায়। কিন্তু সে আর ফিরে আসেনি। নিরাপত্তার কারণে সে বৈঠকে নির্ধারিত হয়েছিল সকলের আগে ‘কুরিয়ার’ সহ বেরিয়ে যাবেন সিরাজ সিকদার। সে মোতাবেক মহসিনকে সাথে করে বেরিয়ে পড়েন সিরাজ সিকদার।

সিরাজ সিকদারকে যখন গাড়িতে করে নিয়ে আসা হয় তখন সামনে পিছনে ছিল কড়া প্রহরা। জানা যায় সাইরেন বাজিয়ে রাস্তার লোকজন সরিয়ে দেয়া হয়। স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয় ‘কমিউনিস্ট টাস্ক ফোর্স’ ও রক্ষীবাহিনীকে।

স্পেশাল ব্রাঞ্চে নিয়ে আসার পর সেখানে কর্তাব্যক্তিদের ভিড় বেড়ে যায়। সবাই এ মূল্যবান বন্দীকে একনজর দেখতে চায়। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি বা পুলিশের সুপারিনটেন্ডেন্টের পদমর্যাদার নীচে কাউকে দেখার অনুমতি দেয়া হয়নি বলে পুলিশের নিম্নপর্যায়ের কর্মচারীরা অভিযোগ করেন।

গ্রেফতার স্বত্ত্বেও পুলিশের লোকজনও প্রাথমিক পর্যায়ে তার পরিচিতি সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পারেনি। তাই স্পেশাল ব্রাঞ্চে আটক তার দলীয় কয়েকজন কর্মীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

প্রাথমিক হেফাজতেই তার ওপর অত্যাচার চালানো হয়। অত্যাচারে কথা বের করতে ব্যর্থ হলে শুরু হয় কথোপকথন:

০ আপনি কি জানেন আপনার শেষ পরিণতি কি?

০ আমি জানি, একজন দেশপ্রেমিকের পরিণতি কি হতে পারে তা ভালো ভাবেই আমার জানা আছে।

O আমরা আপনাকে শেখ সাহেবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলব।

০ জাতীয় বিশ্বাসঘাতকের কাছে একজন দেশপ্রেমিক ক্ষমা চাইতে পারে না।

O তাহলে আপনাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।

০ সে মৃত্যুকেই আমি গ্রহণ করব। সে মৃত্যু দেশের জন্য মৃত্যু, গৌরবের মৃত্যু। (কথোপকথন রেকর্ডকৃত ভাষ্য নয়। কিন্তু নির্ভরযোগ্য মহল যা জানিয়েছেন এ তার মর্মার্থ)।

একপর্যায়ে উপস্থিত পুলিশের জনৈক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে টেলিফোনে নির্দেশ আসে। সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় পাততাড়ি গুটানোর পালা। কোথায় যেতে হবে কেউ জানেন না। জানেন শুধু কয়েকজন। রাত দশটার দিকে চলতে থাকে এক সাঁজোয়া বাহিনী। এবারের গন্তব্যস্থল গণভবন। সেখানে অধীর আগ্রহে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অপেক্ষা করছেন বেশকিছু লোক।

রাত সাড়ে দশটায় পেছনে হাত বাধা অবস্থায় সিরাজ সিকদারকে শেখ মুজিবের সামনে হাজির করা হয়। তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেই তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তার প্রাইভেট সেক্রেটারীর সাথে আলাপে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় সিরাজ সিকদার প্রশ্ন করেন-রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাউকে বসতে বলার সৌজন্য বোধ কি আপনার নেই?

সাথে সাথে পেছনে থেকে একজন পুলিশ সুপার এগিয়ে এসে পিস্তলের বাট দিয়ে সিরাজ সিকদারের মাথায় আঘাত করে। গণভবনে কথা কাটাকাটির পর শেখ মুজিব তাকে নিয়ে যেতে বলেন। রাত তখন বারোটা।

স্পেশাল ব্রাঞ্চে নিয়ে আসার পর কর্তাব্যক্তিদের ভিড় বেড়ে যায় সেখানে। সবাই এ মূল্যবান বন্দীকে একনজর দেখতে চায়। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি বা পুলিশের সুপারিনটেন্ডেন্টের পদমর্যাদার নীচে কাউকে দেখার অনুমতি দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন পুলিশের নিম্নপর্যায়ের কর্মচারীরা।

মধ্যরাতেই শেরে বাংলা নগরের তৎকালীন রক্ষীবাহিনী হেডকোয়ার্টারে শোরগোল বেধে যায়। তাড়াহুড়া করে সেখানে আটক অন্যান্য বন্দীদের অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো এলাকা আলোকিত করার জন্য সার্চলাইট জ্বালিয়ে দেয়া হয়। রক্ষীবাহিনী পুরো এলাকা কর্ডন করে ফেলে। সকলের মুখে গুঞ্জন, ফিসফিসানি। তখনো কেউ জানে না, কাকে নিয়ে আসা হচ্ছে? রাত সোয়া বারোটায় হেডকোয়ার্টারে আসেন তৎকালীন অপারেশন প্রধানসহ রক্ষীবাহিনী প্রধান। এসেই ব্যাটেলিয়ন কোয়ার্টার গার্ড থেকে সিরাজ সিকদারের দলের দুজন নেতৃস্থানীয় কর্মীকে হেড কোয়ার্টার গার্ডে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন।

রাত সাড়ে বারোটায় মহসিনসহ সিরাজ সিকদারকে রক্ষীবাহিনী হেডকোয়ার্টারে নিয়ে আসা হয়। তারপরই একজনকে আরেক জনের কাছ থেকে আলাদা করা হয়। রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে পুলিশের বিশেষ টিম ও রক্ষীবাহিনীর ১১ ব্যাটালিয়নের এস.পি কোম্পানীকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তী প্রহরগুলোয় তেমন উল্লেখ্য কোন ঘটনা ঘটেনি। ২ জানুয়ারী ভোর পর্যন্ত অভুক্ত অবস্থায় তাকে রক্ষীবাহিনী হেডকোয়ার্টারে আটক রাখা হয়।

শেষ নাটক:

২রা জানুয়ারী ১৯৭৫ সকালে সিরাজ সিকদারকে কড়া প্রহরাধীনে সাভারে নিয়ে যাওয়া হয়। চারটি ভজ গাড়ি ও একটি টয়োটা গাড়ি তাকে অনুসরণ করে। তাকে সাভারের তৎকালীন রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পে দেয়া হয়। সন্ধ্যার পর পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত হন। রাত নয়টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেকটু এদিকে তাকে নিয়ে আসা হয়। সেখানে হাত বেঁধে রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয় বলে অনুমান করা হয়।

পার্শ্ববর্তী এলাকার যারা গুলির শব্দ শুনেছেন তারা কেউ ভয়ে বের হননি। ভেবেছেন সে সময়ের নিত্যদিনের মতই একটি ঘটনা। পরদিন অনেকেই রাস্তার ওপর জমাট বাধা রক্তের দাগ দেখেছেন। মৃত্যুর পর তার লাশ নিয়ে আসা হয় স্পেশাল ব্রাঞ্চে। সেখান থেকে নেয়া হয় কন্ট্রোল রুমে। তারপর পাঠানো হয় মর্গে।

৩রা জানুয়ারী বেলা প্রায় সোয়া একটায় হাসপাতাল মর্গ থেকে দাফনের জন্য তার লাশ আজিমপুর নেয়া হয়। কর্তৃপক্ষ সাধারণ কবরে দাফন করার ব্যবস্থা করেছিলেন। এতে তার পিতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পিতা আবদুর রাজ্জাক সিকদার হুমকি দিয়ে বলেন ‘কবরের জন্য কেনা জায়গায় ছেলেকে দাফন করতে না পারলে আমি অস্বীকার করব যে, এ লাশ আমার ছেলের নয়। কর্তৃপক্ষ নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। নির্ধারিত হয় মোহাম্মদপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। এক মাস পুলিশ প্রহরা থাকবে।

পার্শ্ববর্তী এলাকার যারা গুলির শব্দ শুনেছেন তারা কেউ ভয়ে বের হননি। ভেবেছেন সে সময়ের নিত্যদিনের মতই একটি ঘটনা। পরদিন অনেকেই রাস্তার ওপর দেখেছেন জমাট বাধা রক্তের দাগ। মৃত্যুর পর তার লাশ নিয়ে আসা হয় স্পেশাল ব্রাঞ্চে। সেখান থেকে নেয়া হয় কন্ট্রোল রুমে। তারপর পাঠানো হয় মর্গে।

সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর অধুনালুপ্ত বাংলার বাণী উপ-সম্পাদকীয় কলামে ৫ জানুয়ারী ‘৭৫ মন্তব্য করে ‘বিপ্লব করিবার জন্য চারু মজুমদারকে যে কল্পনা বিলাসে পাইয়া বসিয়াছিল। তাহার পরিণতি সকলের জানা থাকিবার কথা। সিরাজ সিকদারের পরিণতি তাহার চাইতে ভিন্নতর কিছুই হয় নাই। ….. . সিরাজ সিকদার ধৃত হইয়া মৃত্যুবরণ করিবার পর আশা করা যায় যাহারা এই দেশে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহারা অতঃপর নিজেদের ভুল ধরিতে পারিয়াছেন। আর সিরাজ সিকদারের পার্টি বিদায় বেলা/মনে রেখো মনে রেখো একটি কথা/কত ঘাত প্রতিঘাত সংঘাত প্রতিকুলতা/কিন্তু আমাদের আছে একটি কামনা/সে হলো নিঃস্বার্থ জনসেবা।

কেন এ নৃশংস হত্যাকান্ড?

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় শেখ মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বি বলতে কেউ ছিল না। জাসদ ও পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি বলতে গেলে তেমন জনপ্রিয় দল নয়। তখন অন্য আর কোনো জনপ্রিয় দল ছিল না। মুজিবের আমলে আওয়ামী লীগ নেতা, তার আত্মীয়-স্বজন ও মুক্তিযোদ্ধা নামধারী দুর্বৃত্তদের বেআইনী কাজ, অত্যাচার ও নির্যাতনে সাধারণ মানুষ অতীষ্ঠ হয়ে ওঠে। শেখ মুজিব তাদের নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেন। শুধু ব্যর্থতা নয় বিশ্লেষকদের মতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব দুর্বৃত্তরা শেখ মুজিবের আশকারা পায়। ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। অতীষ্ঠ সাধারণ মানুষের সমর্থন পায় জাসদ ও পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি। মুজিব ছাড়া কেউ রাজনীতিতে জনপ্রিয় হোক সেটা পছন্দ করতো না তার চারপাশে থাকা স্তাবক, চাটুকার, তোষামোদকারী ও মোসাহেবরা। বিশ্লেষক বলেন, এদের পরামর্শ ও নিজের প্রতি অতি আত্মবিশ্বাসে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে শেখ মুজিব সিরাজ সিকদারকে খুন করার হুকুম দেন।

আজকের প্রেক্ষিতঃ

রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীর এমন মৃত্যু দেশে বা বিদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু ঘটলে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তাই প্রশ্ন ওঠেছিল চারু মজুমদার, চে গুয়েভারা ও হাসান নাসিরের মৃত্যু নিয়ে।

১৯৭৮ সালে চে গুয়েভারার মৃত্যু সম্পর্কে বলিভিয়ার প্রাক্তন সরকার প্রধানকে স্বীকারোক্তি করতে হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় সিরাজ সিকদারের মৃত্যু। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতাকে এ প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। জনসভায় পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে হয়। সিরাজ সিকদারের খুনের ঘটনার প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও বলেছেন আইন তার নিজস্ব পথ বেছে নেবে।

সিরাজ সিকদারের পিতা নৃশংস হত্যাকান্ডের তদন্ত দাবি করেছেন। জনগণও তদন্ত দাবি করেছে। এখন প্রশ্ন–কখন ঘটনার সঠিক তদন্ত ও এ সম্পর্কে শ্বেতপত্র প্রকাশিত হবে।

একজন নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার প্রধান হওয়ায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। দেশের কোনো কিছুই তো পরিবর্তন হলো না। নোবেল লরিয়েটের রেজিমেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের হেফাজতে থাকা ৫ জন মানুষকে মেরে ফেললো। তারও কোনো সঠিক তদন্ত ও বিচার হলো। এ দেশের মানুষ কবে তাদের ন্যায় বিচারের অধিকার পাবে?

এখানে একটা জরুরি কথা বলা দরকার। স্বাধীনতার পর থেকে হেফাজতে খুন বা মৃত্যুর ঘটনাগুলোর বিষয়ে পুলিশ বিভাগ প্রেস রিলিজ বা বিজ্ঞপ্তি ইস্যূ করে। দেশের সংবাদপত্রগুলো সে প্রেস রিলিজ প্রকাশ করে নিজেদের দায় সারে। স্বাধীনতার পর থেকে এ অবস্থা চলছে। অযোগ্য শাসকরা তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে সবসময় রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে অপব্যবহার করে মানুষকে জুলুম-নির্যাতন করেছে, খুন করে চলেছে। সে ১৯৭১ সাল থেকে ২০২৬ একই রূপ ও একই চরিত্র! শুধু সময় ও দৃশ্যপট ভিন্ন! জুলুম-নির্যাতন চলছেই।

জুলাই বিপ্লবের পর একজন নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার ইন্টারিম প্রধান হওয়ায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, দেশের কোনো কিছুই পরিবর্তন হলো না। নোবেল লরিয়েটের রেজিমেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের হেফাজতে থাকা ৫ জন মানুষকে মেরে ফেলেছে। তারও কোনো সঠিক তদন্ত ও বিচার হলো না। এ দেশের মানুষ কবে তাদের ন্যায় বিচারের মৌলিক অধিকার পাবে?

লেখক: গল্পকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

E-mail: s.iquram03@gmail.com

তথ্যসূত্র:

১. বিচিত্রা, ৭ বর্ষ, ১ সংখ্যা, ১৯ মে ১৯৭৮

২. স্বাধীনতার প্রথম দশকে বাংলাদেশমাহফুজ উল্লাহ

৩. উইকিপিডিয়া

 

 

Some text

ক্যাটাগরি: Uncategorized

Leave a Reply

ইরানের স্বৈরশাসক রেজা শাহ ও…

ইসলামের দৃষ্টিতে কদমবুচি করা কি…

প্রশ্নের মুখে নিউজ মিডিয়া ও…