তিতাস পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আখাউড়া’। প্রায় একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে আখাউড়া উপজেলার এই প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শতবর্ষ উদযাপন ২০২০ সালে হওয়ার কথা থাকলেও কারোনা মহামারীর কারণে তা করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন বাধা বিপত্তি পেরিয়ে অবশেষে বিগত ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর এই বিদ্যামন্দিরের ১০০ বছর পূর্তি জমকালো অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। অনুষ্ঠানের অংশগ্রহণের জন্য প্রায় তিন হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন, কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায় পাঁচশ’র মতো শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানের দিন আসতে পারেননি।
ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যানিকেতনে আমি ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছি। বাংলাদেশ রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়, আখাউড়া এর সাথে আমার নাড়ির সম্পর্কে রয়েছে। তাই এই বিদ্যায়তনের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য তীব্র শীত উপেক্ষা ওই দিন সকাল ৯ টায় স্কুল চত্বরে পৌঁছি; স্কুল আঙিনার সাজসঞ্জাম দেখে আমি অভিভূত হয়েপরি। বিশাল মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে স্কুলের ওঠানের দক্ষিণ দিকে। আলোঝলমলে মঞ্চ–চারদিকে আলোর ঝিলিক দিচ্ছে। আর আমাদের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র লে.কর্ণেল শামস ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান রাফি চমতকার উপস্থাপনার মাধ্যমে অনুষ্ঠান মাতিয়ে রাখছেন।
এই দিকে অনুষ্ঠানে আগত শৈশব--কৈশোরকালের বন্ধুরা একেঅপরকে আবেগে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময় করছেন। অনেকে স্কুলের প্রতিটি ক্লাশ রুম, বারান্দা ঘুরে ঘুরে দেখছেন আর স্মৃতি রোমন্থন করছেন। কেউ আবার বন্ধুদেরকে নিয়ে গ্রুপ ছবি তোলছেন। চারদিকে সাজ সাজ রব। সে এক এলাহিকান্ড। আমি তন্ময় হয়ে এই দৃশ্য দেখছিলাম আর সহপাঠিদের কথা স্মরণ করছিলাম। কাকতালীয়ভাবে এমন সময় হঠাৎ বন্ধুবর মনিরুল ইসলাম খোকন, খুরশীদ আলম ও নাজমুল হক মিন্টু আমারে সামনে উপস্থিত হয়–আমি তাজ্জব হয়ে যাই। সবার মুখ ভর্তি দাঁড়ি; দীর্ঘ ৪৫ বছর পর তাদেরকে চিনতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল–শুধু কন্ঠস্বরে তাদেরকে চিনে ফেলি। তারপর আমরা পরস্পরকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেক আপ্লুত হয়ে পরি। তখন আমার মনে হচ্ছিল–এটাই শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানের সার্থকতা। শতকোটি টাকা দিয়েও কখনো এমন সুন্দর ও আনন্দঘন মুহূর্ত পাওয়া যাবে না এবং এমন অপূর্ব দৃশ্যও অবলোক করা যাবে না।

এইদিকে সকাল সাড়ে দশটারদিকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম, বিশেষ অতিথি জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান অনুষ্ঠান মঞ্চে উপস্থিত হন। তারপর জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। শান্তির পায়রা উড়িয়ে অতিথিরা অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন এবং স্মৃতির স্মরক হিসেবে বিদ্যালয় মাঠে বৃক্ষরোপন করেন। অবাক হওয়ার বিষয় হলো, অতিথিদের দেরীর কারণে অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ বাণার্ঢ্য র্যালি বাতিল করা হয়। বস্তুত র্যালি বা শোভাযাত্রা সকলকে একই চেতনায় একত্রিত করে ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে এবং একটি উৎসবকে প্রাণবন্ত করে। অথচ আয়োজক কমিটি সময় স্বল্পতার দোহাই দিয়ে এই পর্বটি বাতিল করলো! মঞ্চে চলছে বিভিন্ন বক্তার নিয়মমাফিক বক্তব্য আর অন্যদিকে চলছে শিক্ষার্থীদে জমজমাট আড্ডা। মূলত এই আড্ডাই হলো শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ অংশ। দুপুর দেড়টার দিকে জোহর নামাজ ও মধ্যাহৃ ভোজের বিরতি দেওয়া হয়। তখনও চারদিকে চলছে প্রচুর হাসি–ঠাট্টা, গল্প–গুজব। অনুষ্ঠানের যে বিরতি চলছে সেইদিকে কারো–ই খেয়াল নেই। অপরদিকে মাইক থেকে ঘোষণা আসতে থাকে, ‘দুপুরের খাবারের জন্য সকল ব্যাচ কোওর্ডিনেটদের নিজ দায়িত্বে তাদের ব্যাচের খাবার নিয়ে আসতে হবে, যেহেতু অনেকে ব্যাচের খাবার টুকেন পায় নাই। তবে লিস্ট নিয়ে গুদামঘর থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হবে’। একথা শোনার পর তো আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা। অগত্যা জোহর নামাজ আদায় করে আমরা রওয়ানা দেই মালগুদামের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখী, চারদিকে হুলুস্থুল কান্ড! কার আগে কে খাবার নিবে–চলছে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা। এমন সময় সাক্ষাৎ পাই সহপাঠি এমদাদুল হক মিঠু ও মাজহারুল ইসলাম বাবুলের। তারা অবশ্য এই আয়োজক কমিটির সাথে জড়িত। তাদের মাধ্যমে প্রায় আদা ঘণ্টা পর চার প্যাকেট খাবার ম্যানেজ করি। তখন দুপুর তিনটা বাজে বাজে। চারপাশে চলছে খাবার বন্টন নিয়ে ব্যাপক হইচই, যেমনটি চলে মাজারে শিরনি বিতরনের সময়। কিছু কিছু প্রাক্তন শিক্ষার্থী এমন গোলযোগ দেখে বিক্ষুদ্ধ ও বিরক্ত হয়ে শূন্য হাতেই স্কুল আঙিনায় চলে আসেন। একদিকে তীব্র শীত বইছে ও অপরদিকে প্যাকেটের খাবার হীমশীতল হয়ে যাচ্ছে। তারপরও মধ্যাহৃ ভোজের সময় খাবারগুলো অমৃতের মতো লাগছিল। মূলত বন্ধুদের সাথে আড্ডায় চিরতার মতো তেতু স্বাদও মধুর মতো সুমিষ্ট লাগে।
দুপুরের খাবার সম্পন্ন হওয়ার পর আবাসন সংকটের কারণে মনিরুল ইসলাম খোকন ফেণীতে, খুরশীদ আলম চট্টগ্রামে ও নাজমুল হক মিন্টু ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। তাদের মতো অনেক প্রাক্তন বিদ্যার্থী–ই আবাসন সংকটের কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুষ্ঠান অসমাপ্ত রেখে তড়িগড়ি করে যার যার বাড়িতে ফিরে যান। সহপাঠিদের চলে যাওয়া পর মনটা খুব অস্থির লাগছিলো। জানিনা জীবনে সায়হেৃ তাদের সাথে আর কখনো দেখা হবে কিনা। তারপরও বড় সান্ত্বনা এই শতবর্ষ পূর্তি উৎসব উপলক্ষ্যে তো আমার হারিয়ে যাওয়া কিছু বন্ধুদের খোঁজ পেলাম–এটা আবার কম কিসের। আখাউড়ায় এত বড় মিলনমেলার আয়োজন না হলে জীবনে হয়তোবা তাদের কোনো সন্ধানই পেতাম না। এই সীমাহীন কৃতিত্ব পুরোটাই শতবর্ষ পূর্তি আয়োজক কমিটির। (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
