বিকাল সাড়ে চারটার দিকে আমি স্কুল চত্বরে ফিরে আসি। এসময় দেখা হয় বাল্যবন্ধু জহিরুল হক জহির, আমিনুর রহমান আমিন, শওকত হোসেন বাদল, ইকবাল হোসেন বেলাল, তৌফিক আলম, মোশারফ হোসেন বাবুল, এমদাদুল হক, মঈন উদ্দিন আহমেদ বাবলু, জাহাঙ্গীর আলম, নূরুল ইসলাম, বিকাশ রঞ্জন দাস, দেবব্রত বণিক পরিমল, আফরোজ জাহান জেসমিন, ফাহমিদা নাসরিন, সেলিনা আক্তার, শিপ্রা রানী সাহার সাথে। তারপর সাক্ষাৎ হয় মোরশেদ আলম ভাই, আব্দুল খালেক বাবু ভাই, আমিরুল ইসলাম আলোক ভাই, শফিকুল ইসলাম কামাল ভাই, আমান উল্লাহ খুকু ভাই, মনিরুল ইসলাম মনু ভাই, শাহ আলম ভাই, কাজী জিল্লুর রহমান ভাই, শামীমা আপা, দিলরুবা আপা, ছোট ভাই আনিস, আওয়াল, সোহেল মামা, জামাল, বাবলু, রতন, মোজ্জামেল, মাহবুব, স্বপন, তুরান, ছোট বোন রওশনআরা, নাসরিন রুবী, হিরাসহ আরো অনেকের সঙ্গে। এদের সান্নিধ্যে মনটা বেশ হালকা হয়।
চত্বরের চারদিকে চলছে জমজমাট আড্ডা; এই বন্ধু মিলন মেলায় সবাই পুরানো দিনের সুখকর স্মৃতি, হাসি–ঠাট্টা ও মজার মজার ঘটনাগুলো ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। এমন মধুর দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে স্কুলের বিশাল আঙিনা জুড়ে যেন বন্ধু মিলনের বাজার বসেছে, এই বাজারে সবাই স্মৃতি কেনা–বেচা করছেন।
বিভিন্ন ব্যাচের ফটোসেশনের মাধ্যমে আসর নামাজের পর অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। ফটোসেশন ও সেলফি পর্ব চলে প্রায় আদা ঘণ্টা পর্যন্ত। তারপর সময় স্বল্পতার দোহাই দিয়ে শতবর্ষ পূর্তি উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ স্মৃতিচারণ পর্বটি বাদ দিয়ে সরাসরি চলে যায় র্যাফেল ড্র পর্বে। বস্তুত, র্যাফেল ড্র–এর চেয়ে মানসিকভাবে স্মৃতিচারণ পর্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে ; এটি অতীত থেকে শিখতে ও বর্তমানকে অর্থবহ করতে শেখায়। তবে অনুষ্ঠানের আনন্দময় সমাপ্তির জন্য র্যাফেল ড্র একটি চমৎকার মাধ্যম। একটি সফল অনুষ্ঠানের জন্য দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। তবে কোনটি বাদ দিয়ে নয়। কিন্তু আয়োজক কমিটির এমন অদ্ভূত সিদ্ধান্তের জন্য অনেকেই বেশ অবাক হন।
এশার নামাজের পর শুরু হয় সবারই বহুকাঙ্ক্ষিত মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে স্থানীয় ও আমন্ত্রিত শিল্পীরা সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান মাত করে রাখেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে স্থানীয় নৃত্যশিল্পীরা নৃত্যও পরিবেশন করেন। এভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে রাত ১১ টা পর্যন্ত। এভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটে বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আখাউড়া–এর শতবর্ষ পূর্তির বিশাল জমকালো অনুষ্ঠান। এই আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমি প্রচুর মজা করেছি। এই জাকালো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।

এতকিছু সফলতার পরও আমাদের এই জমকালো শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে বেশ কিছুর কমতি ছিল। স্মরণ রাখা উচিৎ, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ পূর্তির উৎসবের আয়োজন করা একটি ভাগ্যের ব্যাপারও বটে। আরো মনের রাখা উচিৎ যে, এটি কোনো একটি সাধারণ সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি বিশাল সামাজিক-সাংস্কৃতিক– শিক্ষামূলক ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব। এই আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে মিলন ও গর্বের সেতুবন্ধন তৈরি কার হয়। এলাকার সকলের মাঝে প্রতিষ্ঠানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানের কথা তোলে ধরা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এখন প্রসঙ্গক্রমে প্রশ্ন আসে–আমরা কি বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আখাউড়া–এর শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠান পালনে সম্পূর্ণ সফল হয়েছি? এর প্রেক্ষিতে বলতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের এই অনুষ্ঠানে বেশ কিছুর ঘাটতি, সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা ছিল। যেমন : (১) আহ্বায়ক কমিটি ও সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে বেশ অন্তঃকলহ ছিল। অনুষ্ঠানের প্রায় ৪৫ দিন আগে পূর্বের আহ্বায়ক কমিটিকে বিনা কারণে, বিনা নোটিশে ও বিনা আলোচনায় বাদ দিয়ে নতুন আহ্বয়ক কমিটি গঠনের পর থেকে এই অর্ন্তদ্বন্দ্ব আরো বেড়ে যায়। এছাড়াও শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠান সফল করার জন্য যেসব শিক্ষার্থী নতুন কমিটিকে সদুপদেশ দিয়েছেন, তাদের হিতোপদেশকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে উপেক্ষা করা হয়েছে। এমনটি না হলে আয়োজন আরো সুন্দর ও প্রাণময় হতো। (২) স্মরণিকা অর্থ হলো, স্মৃতি রক্ষাকারী লেখা, কিন্তু বাস্তবে কি তা হয়েছে? বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্কুল স্মরণিকায় ৩৫ পৃষ্ঠা থেকে ২০৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ছিল ছবি ও তথ্যসহ প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের বিশাল পরিচয় তালিকা! ইচ্ছ করলে ওইখানে বাবা-মার নাম, ব্লাড গ্রুপ ও পেশার বিবরণ উল্লেখ না করলেও চলতো। এতে প্রচুর পাতা সাশ্রয় হতো, সেখানে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের নানা ধরনের লেখা এবং স্কুলের প্রয়াত বন্ধুদের ও যেসব প্রাক্তন ছাত্র ১৯৭১-এর রণাঙ্গনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে ছিলেন তাদের তথ্য ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশ করা যেতো। এধরনে তালিকা এবং শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন লেখা স্মরণিকা ও প্রকাশনা উপকমিটির নিকট হস্তান্তরও করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, স্মরণিকায় তা প্রকাশ করা হয়নি! যদি এমনটি হতো, তাহলে স্মরণিকাটির শ্রীবৃদ্ধি পেতো। (৩) উৎসবের দিন স্কুল চত্বরে কোনো হেল্পডেস্ক, প্রাথমিক চিকিৎসা ডেস্ক, আবর্জনা ফেলার পাত্র ছিল না। এমনকি মহিলাদের জন্য আলাদা নামাজ ঘরের ব্যবস্থাও ছিল না। এতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের-ই বেশি কষ্ট হয়েছে। (৪) আগত অতিথি ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দেখাশোনার জন্য কোনো স্বেচ্ছাসেবী দলের ব্যবস্থা ছিল না। এক্ষেত্রে স্কুলের স্কাউটদের কাজে লাগানো যেতো। (৫) দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা মালগুদামে না করে আমাদের স্কুলের প্রতিটি ক্লাশ রুমে ব্যাচ ভিত্তিক করা যেতো। এতে বিশৃঙ্খলা ও খাদ্যের অপচয় কম হতো। এছাড়াও বিকালদিকে স্কুল আঙিনায় পিঠা উৎসবের ব্যবস্থা করলে শতবর্ষ অনুষ্ঠানটির সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য আরো বৃদ্ধি পেতো। (৬) শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানের প্রাণ হলো স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। কিন্তু স্বল্প সময়ের দোহাই দিয়ে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব বাদ দেওয়া ঠিক হয়নি। (৭) সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে র্যাফেল ড্র ও ব্যান্ড সঙ্গীতের পাশাপাশি একাঙ্কিকা,জাদু, কৌতুক, কবিতা আবৃত্তি, ধারাবাহিক গল্প বলা ও পুরানো দিনের গানের ব্যবস্থা করা যেতো। এছাড়াও স্কুলের বারান্দায় ছোটদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং অতি ক্ষুদ্র পরিসরে বইমেলার আয়োজন করা যেতো। এসব কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত টাকা খরচ হতো না, তবে বন্ধু মিলন মেলাটি আরো সমৃদ্ধ হতো। (৮) প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে মঞ্চে বির্তক বা কুইজ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা যেতো। এতে প্রাক্তন ও বর্তমান বিদ্যার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হতো। (৯) স্কুলের আঙিনায় পর্যাপ্ত সেনিটেশনের ব্যবস্থা ছিল না। এছাড়াও দূরের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের খরচে আবাসন ব্যবস্থা করার দরকার ছিল। শুধু আবাসন সংকটের কারণে রেজিস্ট্রেশনকৃত তিন হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থী মধ্যে প্রায় পাঁচশ জন ছাত্র–ছাত্রী ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এই বিশাল বন্ধু মিলন মেলায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি; ব্যাপারটি খুব দুঃখজনকও বটে। (১০) একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ঐহিত্যবাহী অনুষ্ঠান সফল ও সুন্দর করার জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটাকে অনুষ্ঠানের মেরুদন্ড বলা হয়; এটি ছাড়া একটি অনুষ্ঠান কখনোই তার পূর্ণাঙ্গ সফলতা ও সৌন্দর্য অর্জন করতে পারে না। অবাক হওয়ার বিষয় আমাদের স্কুলের আয়োজক কমিটির মধ্যে সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন উপকমিটির মাঝে পারস্পারিক সমন্বয়ের প্রচুর ঘাটতি ছিল। সুতরাং পরবর্তীকালে সফলতার জন্য এসব ভুল বা ব্যর্থতা থেকে আমাদেরকে যথাযথ শিক্ষা নিতে হবে।

আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, সাফল্য কোনো শেষ গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া ; আর ব্যথর্তা সেই প্রক্রিয়ার একটি অংশ, যা আমাদের আরও শক্তিশালী, নিষ্ঠাবান ও ধৈর্যশীল করে তোলে। অতএব পূর্বের ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা, অক্ষমতা ও ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবে ভুল বা ব্যর্থতা থেকে শিখতে হলে প্রথমে ভুুল স্বীকার করে সেটিকে বিশ্লেষণ করতে হবে, কেন এমন হলো তা খুঁজে বের করতে হবে এবং সেই ভুল থেকে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে কিভাবে ভিন্ন পন্থায় তা করা যায় তার পরিকল্পনা করতে হবে। এর জন্য ইতিবাচক মানসিকতা, আত্মসমালোচনা এবং প্রয়োজনে অন্যের মতামত নেওয়া জরুরি।
সুতরাং শত ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতা, অক্ষমতা ও ঘাটতি থাকার পরও একথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে, বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আখাউড়া এর শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন আয়োজক কমিটির প্রতিটি সদস্যদের মধ্যে আন্তরিকতা ও একাগ্রতার কোনো কমতি ছিল না ; তারা অনুষ্ঠানকে সফল ও সাথর্ক করার জন্য আলস্যহীভাবে কাজ করে গেছেন। এজন্য তারা প্রত্যেকে ধন্যবাদ পাওয়ার পাত্র।
এছাড়াও দ্বিধাহীনভাবে বলা যেতে পারে, আমাদের স্কুলের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানের মঞ্চসজ্জা, লাইটিং, মাইক্রোফোন, স্পিকার, সাউন্ডসিস্টেম, আঙিনার ডেকোরেশন, ফটোসেশন, রেকডিং ও উপস্থাপনা ছিল অনন্য। এমনকি স্কুল চত্বরের নিরাপত্তা ছিল অতুলনীয়। আমাদের দেশে অনেক সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে তৈরি খাবার লুন্ঠন হয়, এমনকি কিছু সুবিধাবাদী–মৌলবাদী ও লাঠিয়াল প্রকৃতির লোক সঙ্গীতা অনুষ্ঠান বা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলাকালে বিশৃঙ্খলা বাধিয়ে অনুষ্ঠানকে সম্পূর্ণরূপে ভন্ডুল করে দেয়। সেই বিবেচনায় আমাদের স্কুলের জুনিয়র ছাত্র, পুলিশ-বিডিআর এবং আনসার বাহিনীর সদস্যরা উৎসবকে সফল ও সুন্দর করার জন্য কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ়তার সাথে স্কুল মাঠের নিরাপত্তার নিশ্চিত করেছেন। এটা আখাউড়া তথা সারা বাংলাদেশের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমি বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আখাউড়া এর ১০০ বছর পূর্তি উদযাপন আয়োজক কমিটির প্রতিটি সদস্যকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাচ্ছি। (সমাপ্ত)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized