বাংলাদেশে ভারতীয় আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী বিরোধী লড়াইয়ের পটভূমি বহুবিধ এবং ঐতিহাসিক, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই বিভিন্ন আঙ্গিকে দানা বেঁধেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতেই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের উপর অতি নির্ভরতা এবং পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এই লড়াইয়ের মূল ভিত্তি তৈরি করে।
বিশেষ করে একতরফা বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা, ফাঁক্কা বাঁধের কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবনাক্ত বেড়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়া, তিস্তার পানির চুক্তি নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা, পাবর্ত্যচট্টগ্রামকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত করার জন্য পার্বত্যচট্টগ্রামের আদিবাসীদেরকে গোপনে সহযোগিতা করা, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা, আসাম-ত্রিপুরা ও পশ্চিম বঙ্গ থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদেরকে বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করা, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় বিনা নোটিশে ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধ খুলে দেওয়া, সম্প্রতিকালে ভারতীয় ক্রিকেট টিম ‘আইপিএল’ থেকে বিনা কারণে বাংলাদেশী হওয়ার কারণে ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া–এই বিষয়গুলো জনমনে ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
এছাড়াও সাংস্কৃতির আগ্রাসনের অভিযোগ, আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর নজরদারী, বিশেষ করে ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকান্ডের নেপথ্যে ‘র’ এর জড়িত থাকা ও পরর্বতী সময়ে গন-আন্দোলনের সময় ভারতের হস্তক্ষেপের অভিযোগ, বাংলাদেশের আপামর জনগণের মাঝে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী মনোভাব আরও শক্তিশালী করছে। দিন দিনই এই মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং জনগণের ভারত বিরোধী এই অনুভূতিকে রাজনৈতিক দলগুলোর খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। জনগণের এই অনুভূতিকে সব সময়ই রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রসঙ্গত, ভারতের বিভিন্ন আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদের চির আবসানের জন্যই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেনাঅভ্যুত্থান ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। যদি জুলাই-আগস্টের বিপ্লবের মাধ্যমে বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর পতন না হতো, তাহলে বর্তমানে যে প্রেক্ষাপটে এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন চলছে, তা হওয়া অত্যন্ত দুরূহ ছিল।
অথচ, এই এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রচার মাঠে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই শহীদদের হত্যাকান্ডের বিচার ও আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র ভারত প্রসঙ্গে কোনো ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে না! ব্যাপারটি খুবই হতাশাজনক বটে।
এই নির্বাচন অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর আসন্ন এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এটি ব্যর্থ হলে বা বানচাল হলে ফ্যাসিবাদীরা তাদের কর্মকান্ডের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগ পাবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার সুযোগ নিয়ে পলাতক সন্ত্রাসীরা আবার রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করবে। আধিপত্যবাদী ভারত পলাতক আওয়ামী লীগকে এই সুযোগটি করে দিতে চায়।
আসন্ন এয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র চার দিন। নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। এই প্রচারে তারা কৌশলে ভারত প্রসঙ্গে কিছু বলছে না। এ সময়ে পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হওয়া উচিত। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন এলেই ভারত ইস্যু নির্বাচনী প্রচারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠতো। কিন্তু এবারের নির্বাচনী প্রচারে সেটি প্রায় অনুপস্থিত। এই নীরবতা স্বাভাবিক নয়, বরং তা রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার প্রশ্নকে সামনে এনে দিচ্ছে।
অবস্থার প্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো দেড় দশক ধরে চেপে বসা স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের কথা ভুলে গেছে। আরো ভুলে গেছে কোনো রাষ্ট্রের সমর্থন ও সহযোগিতায় পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতায় ছিল। এমনকি কারা বা কোন রাষ্ট্র এখনো ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ তার সাঙ্গপাঙ্গকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছে, সেটাও তাদের স্মৃতি থেকে চিরতরে বিস্মৃত হয়েছে।
বলাবাহুল্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর আগ্রাসী ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভুয়া অভিযোগ, বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা, কূটনৈতিক মিশনকে লক্ষ করে উসকানি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক বার্তা ছড়ানো–এসব কাজ তারা নিয়মিতভাবে করে যাচ্ছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের এসব নেতিবাচক কাজ নিঃসন্দেহে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত স্বরূপ। এমন পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সবাই আগ্রাসী ভারত প্রসঙ্গে দায়িত্বশীল ও সুস্পষ্ট বক্তব্য আশা করছিলো। তবে অনেকের ধারণা, ক্ষমতা যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো তলে তলে ভারতকে তু্ষ্ট করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, নির্বাচনি মাঠে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্যান্য দলের প্রচারে ভারত প্রশ্ন কার্যত অনুপস্থিত। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা উন্নয়ন, অর্থনীতি, নারীমুক্তি, বেকারত্ব দূরীকরণ, বিচার বিভাগ ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের কথা বলছে। মানুষকে আকাশচুম্বি স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তবে প্রতিবেশী একটি বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ধরন কেমন হবে, সে বিষয়ে তাদের কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই! ব্যাপারটি খুবই রহস্যজনক বটে। তবে ধারণা করা যেতে পারে, ভারত অসন্তুষ্ট হয় এমন কোনো ধরনের বক্তব্য তারা নির্বাচনের আগে আপাতত দিতে চাচ্ছে না। কিন্তু এটা ঠিক যে, পরর্বতীকালে দীর্ঘকাল যাবৎ এর মাশুল রাজনৈতিক দলগুলোকেই দিতে হবে।
উৎকন্ঠার বিষয় হলো, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ভারতের আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে তরুণসমাজের মধ্যে যে অসন্তোষ ও বিরক্ত সৃষ্টি হয়েছে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে প্রতিফলিত হচ্ছে না। জুলাই বিপ্লব–পরর্বতী সময়ে যে জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সার্বভৌমকেন্দ্রিক সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে, তাকে উপেক্ষা করা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই দীর্ঘদিন সম্ভব নয়। বর্তমান নতুন প্রজন্ম কোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর আধিপত্যবাদী আচরণ মেনে নিতে প্রস্তুত নয়–এই বাস্তবতা অস্বীকার করলে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়বে।
অতএব, এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলোর অতিব জরুরি দায়িত্ব হলো, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের বাইরে এসে দেশ ও জনগণের স্বার্থ ও অনুভূতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
সুতরাং, ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক হতে হবে আধিপত্যবাদের বিপরীতে সমতা ও সম্মানের ভিত্তিতে। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে অথার্ৎ পূর্বের স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের প্রণিত পররাষ্ট্রনীতি অটুট রেখে বিজয়ী কোন দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে চায়, তাহলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতোই তাদের করুণ পরিণতি হবে।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
