ব্যাংক খাতের গভীর সঙ্কট সামাল দিতে প্রণীত ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬’ এর ১৮(ক) ধারা নিয়ে নতুন করে দেশের আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজরে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সঙ্কটে পড়া পাঁটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করার পর পুরনো মালিকানা বা শেয়ারধারীদের ভূমিকা নিয়ে যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তা বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
চলিত বছরের ১০ এপ্রিল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজুলেশ আইন-২০২৬’ পাস করা হয়েছে। এই আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার সময় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যে অর্থ দিয়েছে, তার মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করেই আগের পরিচালকরা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ আগামী দুই বছরে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অনেকের অভিমত, যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে ব্যাংকগুলোকে সঙ্কটে ফেলেছে, তাদের কাছে ৭.৫ শতাংশ অর্থ জোগাড় করা কোনো কঠিন কাজ না। এতে তারা খুব সহজেই কোনো শাস্তি ও জরিমানা ছাড়া আবার মালিকানায় ফিরতে পারবে। বিষয়টি খুব বিস্ময়করও বটে!
উল্লেখ্য, ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬’ এর মূল খসড়ায় ১৮(ক) ধারাটি ছিল না। সংসদে বিলটি তোলার ঠিক আগে ৯ এপ্রিল রাতে এই ধারাটি নতুন করে সংযোজন করা হয়! সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যত পাশ কাটানো হয়েছে। তবে পরের দিন সকাল দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থমন্ত্রণালয়কে এটি না করার অনুরোধ জানায়-কিন্তু কে শোনে কার কথা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও পুঁজিবাজর বিশ্লেষক ড. আবু আহমদের মতে, ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬’ এর ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, পূর্বের মালিক বা শেয়ারধারীরা মালিকানার জন্য আবেদন করলে সরকারের দেয়া মূলধনের ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে তিন মাসের মধ্যে ব্যাংকের দখল বুঝে নিতে পারবেন। তবে প্রশ্ন, ‘বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশের নিশ্চয়তা কে দেবে? তার অভিমত, দেশের বিদ্যমান আর্থিক সংস্কৃতিতে সরকারি অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা খুবই দুর্বল। অতীতে বহু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দিয়ে উল্টো নতুন ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় বিপুল অঙ্কের সরকারি সহায়তার বাকি অংশ ব্যাংকমালিকরা স্বেচ্ছায় ফেরত দিবে, এমন ভাবা বা চিন্তা করা হাস্যকর ব্যাপারবটে! যারা একবার ব্যাংকগুলোকে ধ্বংস করেছে, লাখ লাখ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীকে পথে বসিয়েছে, তাদের হাতে আবার ব্যাংক তুলে দেয়া হলে পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থার সঙ্কট আরো তীব্রতর হবে।
বলাবাহুল্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ এ ব্যাংকের বিপযর্য়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সব অর্থ ফেরৎ দিলেও মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না বিধায়, তারাহুড়োভাবে তা সংশোধন করে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬’ এ ১৮(ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে ব্যাংক ডাকাতদের বিচারের পরিবর্তে পুরস্কারস্বরূপ অপরাধ থেকে দায়মুক্তির নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে! বাস্তবে দুর্নীতি ও লুটপাট সহায়ক ও সুরক্ষাকারী এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের লুটেরাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবারদিহি নিশ্চিত না করে বরং, বিশালভাবে পুরস্কৃত করা হলো, যা আত্মঘাতীমূলক। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সত্যিই হতাশাজনক।
এখন প্রসঙ্গক্রমে প্রশ্ন জাগে–সংঙ্কটে নিমজ্জিত ব্যাংকগুলোর আগের মালিকরা যারা এ খাতের লুটপাটের চ্যাম্পিয়ান, তারা এমনকি যাদুরবলে পবিত্র ও শুদ্ধতা অর্জন করলো যে, তারা একই ব্যাংকের শেয়ার, সস্পদ ও পুঁজি পুনরায় ফিরে পাওয়ার জন্য সরকারের নির্ধারিত অর্থের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ জমা দিবেন ও বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ দুই বছরে মাত্র ১০ শাতাংশ সুদসহ শোধ করবেন? নতুন মূলধন যোগান দিবেন? বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ করবেন? সরকারের কর ও রাজস্ব পরিশোধ করবেন? ক্ষতিগ্রস্তপক্ষকে ক্ষতিপূণর দেবেন এবং সরকারি বিধিবিধান মেনে প্রতিষ্ঠান পুর্নগঠন করবেন? ব্যাপারটি অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্যবটে!! এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর কি সরকারের নিকট আছে? তাছাড়া কোন মানদন্ডে পুর্নদখলের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হবে? অধিকন্তু ব্যাংক পুর্নদখলের পর ঘোষিত শর্তাবলী বাস্তবে কি প্রতিপালিত হবে? এমন নিশ্চয়তা কি সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট আছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে কি সম্ভব এসব চিহিৃত ব্যাংকডাকতদের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার?
বর্তমান সরকার কর্তৃক প্রণীত ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬ এর ১৮(ক) ধারা ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে মহাবির্পযয় ডেকে আনবে। দেশ-বিদেশে সরকারের এই হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। উল্লেখ্য, চলিত অর্থবছরের জুনে আই এম এফ এর কাছ থেকে আমাদের দেশের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার(১৩০ কোটি ডলার) ঋণ পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের অযৌক্তিক ১৮(ক) ধারা সংযোজনের কারণে উক্ত ঋণের কিস্তি আটকে দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, একীভূত হওয়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক( এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক) থেকে শেয়ারহোল্ডার এবং উদ্যোক্তারা বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, যার ফলে ব্যাংকগুলোর শেয়ার ফেস ভ্যালু বা অভিহিত মূল্য অনুযায়ী মোট প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে বা লোকসান হিসেবে গন্য হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার কথা চিন্তা করে ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরন প্রক্রিয়া শুরু করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর শেয়ার মূল্য শূন্য ঘোষণা করে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোতে থাকা এস আলম ও নাসা গ্রুপের শেয়ার জব্দ করে।
অতঃপর ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ এর মাধ্যমে অক্টোবর মাসে দুর্বল গুলোকে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক গঠন করা হয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন সহায়তা করা হয়।
মূলত, আমানতকারীদের টাকা নিরাপদে রাখা, ব্যাংকগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা ও ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালু রাখার লক্ষ্যে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা হয় এবং সকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধাপে ৩৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন দেওয়া হয়। কিন্তু এখন সন্দেহ হচ্ছে-অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করার উদ্দেশ্যেই ‘ব্যাংক রেজুশেন আইন-২০২৬’ এ ১৮(ক) ধারা সংযোজন করা হয়েছে, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়।
বস্তুত, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫ সংশোধন করে ১৮(ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে আগামী দিনে লুটেরা শ্রেণিকে আগের মতোই দেশের ব্যাংকব্যবস্থা ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হলো। এমনিতেই আমাদের দেশের ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল নজরদারি এবং আস্থাহীনতার চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় যদি নীতিগতভাবে শক্ত জবাদিহির বদলে ‘পুর্নবাসনভিত্তিক সমঝোতা’ প্রাধান্য পায়, তাহলে তার প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর।
সুতরাং যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের জন্য দায়ী পুরানো শেয়ারহোল্ডাদের জবাবদিহিতা ও শাস্তি নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হলে এখাতে গুণগত কোনো পরির্বতন আসবে না, বরং তা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছবে।
অতএব, ‘ব্যাংক রেজুলেশ আইন-২০২৬’ থেকে ১৮(ক) ধারাটি বাতিল করে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণ সার্থক ও সফল করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক প্রণীত ‘ব্যাংক রেজুলেশ অধ্যাদেশ-২০২৫’ এ কোনো ধরনের কাটছাট না করে, হুবহু আইনে পরিনত করা এখন সময়ের দাবি।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
