ইরান পৃথিবীর প্রাচীনতম কাল থেকে শুরু করে বর্তমান পযর্ন্ত অস্তিত্বশীল বৃহৎ সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ধারণা করা হয়, প্রায় ১ লাখ বছর আগে ইরানে মানুষের বসতি ছিল। ইরানকে সভ্যতার দোলনা বলা হয়।পৃথিবীর মধ্যে ইরান কোনো আগ্রাসী দেশ নয়, শান্তিপ্রিয় দেশ। প্রতিবেশী সব দেশের সাথে তার সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে। দেশটি সব সময় ‘মজলুম দেশের’ পক্ষে কথা বলে ; প্রয়োজনে ‘শৃঙ্খলিত দেশের’ মুক্তির জন্য সাহায্য-সহযোগীতা করে থাকে। ইরান কখনো কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায় না। অথচ, সকল আর্ন্তজাতিক নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করে বিনা কারণে ও বিনা উসকানিতে নিজেদের আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সুসভ্য ও শান্তিপ্রিয় দেশ ইরানে নজিরবিহীন আক্রমন চালায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই হামলায় ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নিহত হন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা। প্রতিবাদে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা এবং ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোয় হামলা করে। এই হামলা-পাল্টা হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নেমে আসে এক বিপর্যয়কর সংঘাতের ছায়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইরান মার্চের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানী তেল সরবরাহ হয়। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানী তেলের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে এবং এর প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের ওপরও পরেছে। যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১২০ ডলারে পৌঁছেছে।
টানা ছয় সপ্তাহ যুদ্ধের পর চলিত বছরের ১০ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্ততায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধরিতিতে সম্মত হয় ইরান-ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই বিরতি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। পাকিস্তান বিবদমান দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এমন যুদ্ধবিরতি অনেক সময়ই শুধু নতুন সংঘর্ষের প্রস্তুতির সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয় ; এর ঢেউ আঘাত হেনেছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশীর চাকরি আজ অনিশ্চয়তার মুখে। এতে রেমিট্যান্সপ্রবাহের ওপরও বিরুপ প্রভাব সৃষ্টি হবে। তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও পণ্যের দামে।
বস্তুত, যুদ্ধ কখনো শুধু ভূখন্ড দখলের লড়াই নয় ; এটি মানুষের স্বপ্ন, সভ্যতা এবং ভবিষ্যতের ওপর এক নিমর্ম আঘাত। চল্লিশ দিনের এই যুদ্ধে ইরানের প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে–যার মধ্যে অধিকাংশই আবাসিক বাড়ি, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সামরিক স্থাপনা–কোনো কিছুই রক্ষা পায়নি আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের ভয়াবহ আঘাত থেকে। এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় তিন হাজারেরও বেশি মানুষ আর অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। প্রায় ৫০ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন। এই যুদ্ধের উত্তাপ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী। তাই এই ধ্বংসস্তুপের মাঝেই সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে–একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক শান্তি, যা মানবতার অস্তিত্বকে রক্ষা করতে পারে।
স্বল্পসময়ের জন্য যুদ্ধবিরতির নীরবতা নেমে এলেও মধ্যপ্রাচ্য আজও যেন আগ্নেয়গিরির মতো অস্থির--যেকোনো মুহুর্তে এর বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল–এই ত্রিমুখী উত্তেজনা সাময়িকভাবে স্তিমিত হলেও বাস্তবে সংঘাতের আগুন নিভে যায়নি ; বরং ভেতরে ভেতবে আরো দাউ দাউ করে জ্বলছে।
সাম্প্রতিক আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনার দিকে ধাবিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি–ইরানকে তার পারমানবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হবে এবং একটি কঠোর আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে। কিন্তু ইরান এই দাবিকে তার সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তাদের অবস্থান স্পষ্ট–শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় তারা নিজেদের সক্ষমতা ত্যাগ করবে না। ফলে আলোচনার টেবিল এখন কার্যত অচল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোরাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। তিনি প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সুবিধাজনক সময়ে ইরানকে ‘নিশ্চিহৃ’ করে দেওয়া হতে পারে–এমনকি অতীতে তিনি ইরানের হাজার বছরের সভ্যতাকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার’ কথাও উল্লেখ করেছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য শুধু সামরিক হুমকি নয় ; এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল, যা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।
অন্যদিকে, ইরানও সমানভাবে কঠোর বার্তা দিয়ছেন–তাদের ‘হাত ট্রিগারে’, অথার্ৎ তারা যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত। বর্তমান উত্তেজনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি।
এইদিকে ইতিমধ্যে ইরানের নৌ-অবরোধের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ১৩ এপ্রিল মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানী বন্দরে পাল্টা নৌ-অবরোধ আরোপ করে, যা হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে এবং এর ফলে তেল ও গ্যাসের মূল্য আরো বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, খাদ্যের সংকট ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলো এই পরিস্থিতি মোটামুটি সামাল দিতে পারলেও, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বেদেশগুলো তা সামাল দিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হবে।
আপাতত এখন অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি চলছে। উল্লেখ, ২৩ এপ্রিল ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় কোনো পক্ষই একই টেবিলে আলোচনায় বসেনি! তবে এরপর নতুন করে যুদ্ধ শুরু না হলেও, চারদিকে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এইদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনের হুতিরা যদি লোহিত সাগরে ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে হরমুজ আর বাব আল-মান্দেব মিলিয়ে পৃথিবীর প্রায় ৩০ শাতংশ তেল-গ্যাস ও রসদ রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে! হুতিরা ইতিমধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছে। হুতিরা যদি সত্যিই বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে পৃথিবী কি পারবে এই ধকল নিতে? (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized