ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলী হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধের দুই মাস পরেও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে, যার ফলে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ, বিশ্বের আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ সার সরবরাহ এবং অন্যান্য সম্পদ, যা সাধারণত এই নৌপথ দিয়ে চলাচল করে, তার প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল(আইএমএফ) ঘোষণা করেছে, এভাবে যদি ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ আর কয়েক সপ্তাহ চলে, তাহলে পুরো পৃথিবী অর্থনৈতিক মন্দায় প্রবেশ করবে। যেটা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে এবং আমেরিকার অর্থনীতিতেও এর ভয়ংকর প্রভাব ফেলবে।
এইদিকে এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক তাদের নিজস্ব প্রতিবেদনে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের জেরে বৈশ্বিক পণ্যবাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে আগামী বছর জ্বালানি পণ্যের দাম গড়ে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সর্তক করেছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে তেল, সার ও ধাতুর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ২০২৬ সালে সামগ্রিক জিনিসপত্রের দাম প্রায় ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ মরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সমদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ চলাচল করে। এ রুটে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় প্রাথমিকভাবে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দিনে প্রায় এক কোটি ব্যারেল কমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি দামে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বেসলাইন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ৮৬ ডলারে উঠতে পারে। চলিত বছরে এর গড় মূল্য ছিল ৬৯ ডলার। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দাম ১২০-২৫ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। আগামী বছরে সারের দাম গড়ে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইউরিয়ার মূল্য ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহিৃত করা হয়েছে। একই সময়ে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনসহ শিল্পধাতুর বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিতে পারে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ায় স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর দরও বাড়তে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোয় আগামী বছরে গড়ে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে তা ৫ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে এসব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এই বিষয়ে যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের’ পরিচালক স্যামুয়েল রামানি সর্তক করে বলেছেন, ‘ ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে, এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ঘটাবে। তিনি আরো বলেছেন, এটি কেবল রপ্তানি বা দামের বিষয় নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর বৈশ্বিক আর্থিক সংকট তৈরি করবে’।
বস্তুত, হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পার হয়। এই প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সিংহভাগ এশিয়ার দেশগুলো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করে থাকে। চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তানসহ বাংলাদেশ এই প্রণালি দিয়ে আসা মোট তেলের ৬৯ শতাংশ ব্যবহার করে থাকে।
মূলত, এই দেশগুলোর বিশাল শিল্পকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা এই জ্বালানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। সুতারং এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। আর জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের পকেট কাটবে।
জাতিসংঘের ‘এশীয় ও প্রশান্ত মহাসগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন'(এসকাপ)-এর নিজস্ব রির্পোট অনুযায়ী, ‘ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুধুমাত্র তৃতীয়বিশ্ব নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও একটি বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। এই যুদ্ধের কারণেই জ্বালানি তেল,গ্যাস ও সারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে আর এজন্যই পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে একটি ‘কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ’ বা উচ্চমূল্যের খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে’।
এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদনের ওপর একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আধুনিক কৃষিব্যবস্থা পুরোপুরি জ্বালানি ও রাসায়নিক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই প্রভাব হবে অত্যন্ত গভীর।
আধুনিক চাষাবাদে ট্রাক্টর, হারভেস্টার এবং সেচপাম্প চালানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে ডিজেল প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের মতো তৃতীয়বিশ্বের প্রতিটি দেশে আমন বা ইরি মৌসুমে সেচ পাম্পগুলো মূলত ডিজেল বা বিদ্যুৎচালিত। তাই তেলের দাম বাড়ায় বিঘাপ্রতি চাষের খরচও অনেক বেড়ে যাবে।
খাদ্য উৎপাদনের প্রভাব খাদ্য আমাদানিতেও পড়বে। অনেক দেশ তাদের নিজেদের মজুত ঠিক রাখতে গম, চিনি বা চাল রপ্তানি বন্ধ করে দিত পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। তাই আমদানির্ভর অনেক খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, খাদ্য উৎপাদন মানে শুধু ধান,গম, ডাল, পেয়াজ নয়–মাছ, দুধ, ডিম, মাংসও এর অন্তর্ভুক্ত। পোলট্রি ও মাছের খাবারের একটি বড় অংশ হলো ভুট্টা ও সয়াবিন। এগুলোর আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী ডিম, মুরগী ও মাছের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ার ফলে পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে একটি ‘কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
