ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও যুক্তরষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবরোধ চলছে। ইসলামাবাদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা এখনো অব্যাহত আছে, কিন্তু কোনো সুফল বয়ে আনবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। বরং যেকোনো সময় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হতে পারে এবং ভেঙ্গে যেতে পারে অনির্দিষ্ট সময়ের যুদ্ধবিরতি।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ অনেকটা থমকে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন খাতে অতিমুনাফা ও মজুতদারির প্রবণতা। সংকটকে পুঁজি করার এমন অনৈতিকতা বিশ্বের খুব দেশেই দেখা যায়।
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা–সব ক্ষেত্রেই একটি ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা উৎপাদন খরচজনিত মূল্যস্ফীতি তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই যুদ্ধ তাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
ইতিমধ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার খুচরা জ্বালানি তেল ও গ্যাস(এলপি গ্যাস) এর দাম ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস(এলএনজি)-র দাম বাড়ার পর বাসের ভাড়া, সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ও ভোগ্য পণ্যের দাম বেশ বেড়েছে। এতে মানুষের জীবন আস্তে আস্তে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
চাহিদা অনুযায়ী উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনতে গিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানি আমদানির বিল মেটাতে সরকার ইতিমধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার জরুরি ঋণ চেয়েছে। চলিত বছরের জুনে আইএমএফের ঋণের কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার ছাড় পাওয়ার কথা থাকলেও তা সহসা পাওয়ার সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়াও আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক ঋণের শর্ত হিসেবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর জন্য তাগাদা দিয়ে আসছে। জ্বালানির দাম বাড়ানোর কারণে ভর্তুকি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আরো বেশি দামে তেল ও এলএনজি কিনতে হতে পারে, ফলে ভর্তুকির পরিমাণও আরো বাড়তে থাকবে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস–সব মিলিয়ে একটি বড় সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধকে কেন্দ্র দেশের অর্থনীতি যে চাপের মুখে পড়েছে, তাতে সরকারের জনতুষ্টিবাদী কর্মসূচীগুলো খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ও কৃষিপণ্যের দাম যেভাবে বাড়বে, তাতে কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে সরকারের জনপ্রিয়তা কতটা বাড়বে বা বর্তমান পরিস্থিতির মোকাবিলা কতটুকু করতে পারবে–তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে এটা ঠিক যে, সরকারের একার পক্ষে এই সংকটকাল মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
অববাক হওয়ার বিষয়, বৈশ্বিক এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে জাতিয় সংসদে তেমন কোনো আলোচনাই হয়নি! অথচ, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশেগুলোতে এই জটিল পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয়ভাবে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে এই সংকট নিয়ে কোনো জাতিয় সংলাপ হচ্ছে না, এমনকি সাধারণ মানুষকেও জানানো হচ্ছে না, এই যুদ্ধে তাদের কি প্রভাব ফেলতে পারে। আজকের দুনিয়ায় কোনো দেশ একা নয়, এক দেশের সংকট বা যুদ্ধের প্রভাব অন্য দেশের ওপরও পড়ে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া ‘কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ বা উচ্চমূল্যের খাদ্যসংকট’ এড়াতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের মূলভূমিকা হওয়া উচিৎ কূটনৈতিক নিরপেক্ষতা ও নিজেদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা এবং দেশের খাদ্য উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন নিশ্চিতকরণের জন্য বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করা ও জ্বালানির ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়া। এছাড়াও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও সাধারণ মানুষের কষ্টের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত তৈরিতে সোচ্চার হওয়া। (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
