মধ্যপ্রাচ্য তথা উপসাগরীয় অঞ্চল ও এর আশপাশের দেশগুলোর খনিজ সস্পদ বিশেষ করে খনিজ তেলের বিশাল মজুত এই অঞ্চলকে প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করলেও বিপুল আয়ের উৎস এই খনিজ সম্পদই এই অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও বর্তমান সংকটের মূল কারণ।
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং এর আশপাশের দেশগুলোতে(ইরান ও ইরাকসহ) প্রায় ৬০০-৭০০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি প্রমাণিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে।
অপরদিকে বিশ্বের অন্যতম ‘তেল লুটেরা দেশ’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রমাণিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে প্রায় ৪৪-৪৬ বিলিয়ন ব্যারেল। এর মধ্যে কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের প্রায় ৪১১ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানিতেল মজুদ রয়েছে ট্রেক্সাস ও লুজিয়ানার ভূগর্ভস্থ গুহায়। তারপরও তার তেলের লিপ্সা যায় না-সে চায় বিশ্বের সব জ্বালানি তেল তার নিয়ন্ত্রণে থাকুক!
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহে শৃঙ্খল এবং দামের ওপর প্রভাব বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রায় সময়ই প্রভাব বিস্তার করে থাকে এবং এখনো তা অব্যাহত আছে! এসব আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী কাজ পৃথিবীর জন্য নিঃসন্দেহে অভিশাপ স্বরূপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এসব আধিপত্য বিস্তারের লড়াই প্রায়শই সশস্ত্র সংঘাত ও যুদ্ধের জন্ম দিচ্ছে ; একপর্যায়ে একটি রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দুর্বল করেদিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসব আগ্রাসী অভিযানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১৯৮৩ সালের ২৫ অক্টোবর ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র গ্রেনাডায় আক্রমন, ১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি মাদক চোরাচালান ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পানামার সাবেক সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়াগাকে অপহরন, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তান আক্রমন ও আল-কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা, ২০০৩ সালের ২০ মার্চ কতিথ গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংসের অজুহাতে ইরাক আক্রমন ও তৎকালীন দেশটির রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেনকে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে হত্যা, ২০১১ সালের ১৯ মার্চ লিবিয়ায় আক্রমন ও বিনা বিচারে দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যা, ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় অতর্কিত আক্রমন করে মাদক চোরচালানের অভিযোগে দেশটির রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেন্সকে আটক এবং বর্তমান সময়ে ইরানের সরকার পরিবর্তনের জন্য ইরানের ওপর আগ্রাসী আক্রমন। এসব লোমহর্ষক ও ভয়াবহ অভিযানগুলোর প্রায় সবকটিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্ররা সার্বিক সহযোগীতা করেছে।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেকদের মতে, ‘পৃথিবীজুড়ে তেলের ভান্ডার ও দুর্লভ খনিজসম্পদ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং ভিন্ন মতাদর্শের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভেঙ্গে তথায় নিজেদের পছন্দ মতো পুতুল সরকার বসানোই যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে থাকে এবং এই ধারাবাহিকতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে পরবর্তী টার্গেট মিসর, কিউবা, মেক্সিকো, গ্রিনল্যান্ড কিংবা তুরস্ক, যা ন্যাটোর পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা সাম্রাজ্যবাদ পতনের কারণ হয়ে যেতে পারে অথবা নতুন সাম্রজ্যবাদের জন্ম দিতে পারে’। অনেকে অনুমান করছেন, এই অবস্থার প্রেক্ষিতে সৌদি আরব-তুরস্ক-মিশর ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট তৈরি হতে পারে। পরবর্তীকালে এই জোটে যোগদান করতে পারে ইরান-ইরাকসহ আশপাশের অন্যান্য দেশ।
অভিযোগ রয়েছে, চলমান ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্ররোচনায় চলিত বছরের ২৯ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের বিখ্যাত তেল উত্তোলনকারী সংস্থা ‘ওপেক’ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই ঘোষণা বৈশ্বিক তেল বাজারে বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে এবং ওপেকের নেতৃত্বকারী সৌদি আরবের সাথে আমিরাতের নীতিগত দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উপসাগরীয় সহযোগীতা পরিষদ(GCC) এর ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারে। ইরান এই সিদ্ধান্তকে ‘নেতিবাচক বা প্রতিশোধমূলক’ হিসেবে উল্লেখ করে সমালোচনা করেছে, যা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। এমতাবস্থায় রাশিয়া ও সৌদি আরবের নেতৃত্বে ওপেক প্লাসের জন্য তেলের দামের ঊর্ধ্ব ও নিম্নসীমা বজায় রাখা কঠিন হয়ে যাবে।
ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওপেকের শক্তি খর্ব হওয়ায় ইসরাইলের জন্য ইতিবাচক। ইরান তেল রপ্তানির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। আমিরাত ওপেক ত্যাগের পর পর স্বাধীনভাবে প্রচুর তেল বাজারে ছাড়বে এবং এর ফলে তেলের বৈশ্বিক দাম কমে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। তবে তেলের দাম কমলে ইরান-সৌদি আরব-কুয়েত-ইরাক ও রাশিয়ার মতো তেলনির্ভর অর্থনীতিতে দেশগুলোর রাজস্ব আয় কমে যাবে, যা তাদের সামরিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করতে পারে।
অনেকের ধারণা, এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও আমিরাতের মতো ত্রি-জোটের বিপরীতে ইরান-সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যকার নতুন জোটের উত্থান হতে পারে। বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। অঞ্চলটি এমন এক অনিশ্চিত ভারসাম্যের দিকে যাচ্ছে, যেখানে কোনো পক্ষই পুরোপুরি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো প্রভাব আর আগের জায়গায় নেই। সাস্প্রতিক একটি ঘটনাই তার বড় প্রমাণ। উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা এবং আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে মুক্ত করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চলিত মাসের ৩ মে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেয়, কিন্তু সৌদি আরবের অসহযোগীতার কারণে দুই দিনের মাথায় এই অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করে ট্রাম্প। এটি ছিল মার্কিন-ইসরাইল জোটের বিপরীতে নতুন জোট উত্থানের রাজনৈতিক সর্তকসংকেত।
প্রসঙ্গত,২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান দখলের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ‘এপিক ফিউরি’ নামে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ইরানও মার্কিন-ইসরায়েল যৌথবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অপারেশ ট্রু প্রমিজ’ পরিচালনা করে। এই অভিযানের মাধ্যমে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি কার্যত অচল করে দেয়। এরপর ইরান হরমুজ প্রণালির বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এর প্রতিবাদে চলিত বছরের ১৩ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ বা হরমুজ প্রণালি অবরোধ শুরু করে। এইদিকে ১৮ এপ্রিল মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিতে ইরান পুনরায় এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধবিগ্রহের কারণে এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের প্রথম দিক থেকে এই জলপথটি চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং কার্যত বন্ধ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বর্তমানে অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং সেখানে মাঝেমধ্যেই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পছন্দ মতো কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পন্থায় সমাধান না হলে, তখন তারা সময়-সুযোগ বুঝে ও অধিক শক্তি সঞ্চয় করে যৌথভাবে এই জলপথটি দখলের দিকে অগ্রসর হতে থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে কেবলমাত্র ইসরাইল ও আরব আমিরাতই চাচ্ছে, আলোচনা নয়, যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের বর্তমান সরকারকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করতে। তবে একপর্যায়ে যদি মার্কিন-ইসরাইল যৌথ বাহিনী হরমুজ প্রণালি ও খার্গ দ্বীপ দখল করে ইরানের তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে করতে সক্ষম হয়, তাহলে একদিকে যেমন ইরানে তার মনোনীত পুতুল সরকার বসাতে চাইবে, অপরদিকে চীন-রাশিয়ার প্রকৃত এনার্জি সাপ্লাইয়ার হিসেবে চিহিৃত ইরানের তেল সরবরাহ কাজে বাধাগ্রস্ত করে চীন-রাশিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করবে।
তবে এমনটি হলে এর বিপরীতে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন প্রক্সি যোদ্ধারা যেমন, ইয়েমেনের হুথিরা বন্ধ করে দিতে পারে লোহিত সাগরের ‘বাব-আল মান্দেব প্রণালি’ এবং ফিলিস্তিনির হামাসরা বন্ধ করে দিতে পারে মিশরের ‘সুয়েজ খাল’। এই দুইটি নৌপথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও পণ্যসামগ্রী সরবরাহ হয়ে থাকে। এছাড়াও লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনির হামাসরা যৌথভাবে বন্ধ করে দিতে পারে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত ব্রিটিশ-গ্রিক মালিকানাধীন ‘কারিশ গ্যাস ক্ষেত্র’। এই গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ৫৪০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদিত হয়। এই গ্যাস ক্ষেত্র থেকে ইসরাইল, মিশর ও জর্ডানে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বিশ্লেষকদের অভিমত, এমন ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি হলে, রাশিয়া বা চীনের মতো পরাশক্তিগুলো ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, তখন এটি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিবে–বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
