প্রণালী হলো প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জলের একটি সংকীর্ণ পথ, যা দুটি বড় জলভাগকে যুক্ত করে এবং দুটি বৃহৎ স্থলভাগকে পৃথক করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচলে সময় এবং দূরত্ব কমাতে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পৃথিবীতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় শতাধিক প্রণালী রয়েছে। এই গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিখ্যাত ‘হরমুজ প্রণালী’। এই প্রণালীটি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে এবং ইরান ও আরব আমিরাতকে পৃথক করেছে।
হরমুজ প্রণালী এমন একটি সংকীর্ণ জলপথ, যার ওপর বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি সরাসরি নির্ভরশীল। এটি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম এই প্রণালী দিয়ে সরবরাহ করা হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক,কাতার ও ইরানের মতো প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান পথ এটি। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার বড় বড় অর্থনৈতিক শক্তির জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশ এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।
হরমুজ প্রণালী শুধু একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার প্রাণকেন্দ্র। এটি মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। এই প্রণালীটি শুধু একটি ভৌগলিক অবস্থান নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনি।
তাই হরমুজ প্রণালীতে যে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা ভূ-রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষনিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজরে জ্বালানি তেলের দাম বহুগুণ বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় ঘটে। কৌশলগত এই অবস্থানের কারণে ইরান প্রায়ই প্রণালীটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে থাকে।
হরমুজ প্রণালী কেবল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথই নয়, এটি ভূ-প্রাকৃতিক ও সৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অদ্ভূত মিলনমেলা। এর সৌন্দর্য রুক্ষ অথচ রাজসিক। প্রণালীটির উত্তর দিকে রয়েছে ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালার রুক্ষ, এবড়ো-থেবড়ো ও ধূসর পাহাড়। আর দক্ষিণ দিকে রয়েছে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ, যার খাড়া ও কালো পাথরের পাহাড়গুলো সমুদ্রের দিকে তীক্ষ্ণ ছুুরির মতো এগিয়ে গেছে।
এই প্রণালীর নীল জলরাশির বুক চিড়ে ছোট-বড় বেশ কিছু দ্বীপ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর চারপাশের খাঁজকাটা উপকূলরেখা এবং জলের নীচে ডুবে থাকা উপত্যকাগুলোর দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় যখন পার্শ্বের দন্ডায়মান রুক্ষ পাহাড়গুলোর ওপর সোনালী আলো আছড়ে পড়ে, তখন জলের প্রতিফলে এক জাদুকরী আভা তৈরি হয়। রাতের বেলায় দিগন্তজোড়া কালো জলের মাঝে বড় বড় তেল ট্যাঙ্কারের বাতিগুলো এক চলমান শহরের মতো আলো ছড়ায়। এটি পৃথিবীর এমন একটি বিরল স্থান, যেখানে ইউরেশিয়ান ও আরবীয় প্লেটের সংঘর্ষের স্পষ্ট প্রমাণ দৃশ্যমান! (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
