ঐতিহাসিকদের মতে, ১০ম থেকে ১৭শ শতাব্দীর মধ্যে ইরানের দক্ষিণ উপকূলে ‘হরমুজ’ নামে একটি সমৃদ্ধশালী রাজ্য ও বন্দর ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে বণিকরা এখানে বাণিজ্য করতে আসত। ধীরে ধীরে ওই বন্দর ও রাজ্যের নামানুসারেই তৎসংলগ্ন জলপথটি ‘হরমুজ প্রণালী’ হিসেবে পরিচিত লাভ করে।
হরমুজ প্রণালীর দৈর্ঘ প্রায় ৯০ নটিকেল মাইল(১০৪ মাইল, ১৬৭ কিমি) আর প্রশস্থ প্রায় ৫২ নটিকেল মাইল(২৪ মাইল, ৯৭ কিমি)। তবে এর সর্বনিম্ন প্রশস্তা প্রায় ২১ মাইল। কিন্তু ২১ মাইল প্রশস্তা হলেও শিপিং লাইনের প্রশস্তা মাত্র ২ মাইল। এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর দুর্ঘটনা বা সংঘর্ষের ঝুঁকি কমাতে সব সময় একটি ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম অনুসরণ করে, চলাচলকালে আগত জাহাজগুলো এক লেন ব্যবহার করে ও নির্গত জাহাজগুলো অন্য লেন ব্যবহার করে। প্রতিটি লেন প্রায় ২ মাইল চওড়া। লেনগুলোকে দুই মাইল চওড়া একটি ‘মধ্যখন্ড’ দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। প্রণালীটি অতিক্রম করার সময় জাহাজগুলি জাতিসংঘের সমুদ্র আইন মেনে ইরান ও ওমানের জলসীমা দিয়ে অবাধে চলাচল করতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৯৫৯ সালে ইরান তার সীমানাসংলগ্ন জলভাগ ১২ নটিকেল মাইল(১৩.৬৭ মাইল, ২২কিমি) প্রসারিত করে এবং ১৯৭২ সালে ওমানও তার সীমানাসংলগ্ন জলভাগ ১২ নটিকেল মাইল(১৩.৬৭ মাইল,২২ কিমি) পর্যন্ত প্রসারিত করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে হরমুজ প্রণালীতে ১২ নটিকেল মাইলের আঞ্চলিক জলসীমা নির্ধারিত থাকলেও, এটি এমন একটি সংকীর্ণ জলপথ যেখানে দেশ দুটির জলসীমা একে অপরের সাথে মিশে গিয়েছে। সম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ওমানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, প্রণালীটি একান্তই তাদের যৌথ জলপথ এবং এখানে কোনো আন্তর্জাতিক জলসীমা নেই। তাই মধ্যপ্রচ্যের চলমান উত্তেজনার জেরে ইরান এই প্রণালীতে তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ওমানের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও টোল আদায়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে। তবে এই নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টাকে ব্যাহত বা বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল জোট আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু ইরান এই জলপথকে নিজেদের ‘স্থায়ী সম্পদ’ ও কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
মূলত, এই জলপথটি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার কথা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে ইরান থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট কিছু দেশের(যেমন চীন বা জাপানের) জাহাজগুলো তাদের শর্ত মেনে চলাচল করতে পারছে। তবে সাধারণভাবে এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য প্রায় বন্ধ বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ টি বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করে। কিন্তু সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও উত্তেজনার পর বৈশ্বিক এই জলপথটিতে নোৗ চলাচল মারাত্মকভাবে কমেছে। বর্তমানে দৈনিক গড়ে ১০ থেকে ১৫ টির মতো জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করছে।
বলাবহুল্য, বৈশ্বিক বাণিজ্যের সুবিধার্থে সুয়েজ বা পানামা খালের মতো কৃত্রিম জলপথ তৈরি করা সম্ভব হলেও পারস্য উপসাগরের উপদ্বীপগুলোর ক্ষেত্রে তা মোটেই সম্ভব নয়। পর্বত, পাথুরে উপকূল আর অগভীর পানির কারণে সমান্তরাল কোনো পথ বা খাল তৈরি করা অসম্ভব ও ব্যয়সাপেক্ষ। হনমুজ প্রণালী মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ নেয়ামত। এটি একটি প্রাকৃতিক পথ, এর কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর জন্য এই অসমতল ও অমসৃন ভূগোল জয় করা দুঃস্বপ্নের মতো ব্যাপার!! এই প্রণালী দখল করতে চাইলে যেকোনো আক্রমনকারী বাহিনীকে মোতায়েন করতে হবে ১০ থেকে ১২ লাখের মতো সৈন্য, বিশাল নৌবহর ও অতুলনীয় সরবরাহব্যবস্থা, যা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের জন্যও প্রায় অসম্ভব ও কাল্পনীক ব্যাপার!!
বস্তুত, হরমুজ প্রণালী শুধু জ্বালানি তেল নয়, বৈশ্বিক তরলীকৃত গ্যাস, ইউরিয়া সার ও খাদ্য সরবরাহেরও একক সংকট বিন্দু বা ক্রিটিক্যাল পয়েন্ট, যা ব্যবহার করে ইরান কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ছাড়াই বৈশ্বিক অর্থনীাততে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানের জন্য এই প্রণালীটি একটি অসমমিতিক অস্ত্র বা ‘অর্থনৈতিক পারমাণবিক বোমা’র মতো শক্তিশালী। তাই এর যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রাখা সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে ইরান দেখিয়েছে, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের সম্মিলিত শক্তি ছাড়াও হরমুজ প্রণালীর মতো একটি কৌশলগত সংকীর্ণ সমুদ্রপথের ওপর যথার্থ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশকে নাস্তানাবুদ করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যেতে পারে, হরমুজ প্রণালী পৃথিবীর সবচেয়ে কৌশলগত ও স্পর্শকাতর স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর প্রাকৃতিক ও ভূতাত্ত্বিক সৌন্দর্যও অনন্য। পারস্য ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে এর অবস্থান হওয়ার কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং নৈসর্গিক দৃশ্যের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। হরমুজ প্রণালী এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠিত একটি কঠিন ও অবিনশ্বর প্রতিরোধশক্তির ভূখন্ড। মহান সৃষ্টিকর্তার আর্শীবাদে পৃথিবীর কোনো সামরিক শক্তিই এই ভূখন্ডকে দখল করতে পারবে না। (সমাপ্ত)
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ: deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
