একটি দুলর্ভ ছবি একটি নিদির্ষ্ট সময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতি বা ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে সবার সামনে তুলে ধরে। এছাড়াও একটি অতি পুরানো স্থিরচিত্র একটি মহূর্তকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখে, যা গল্প বলা, স্মৃতিচারণ এবং নথিভুক্তকরণের জন্য অপরিহার্য। আমাদের এই ছবিটিও ঠিক সেধরনেরই।
অনেক খোজাখুজির পর বিগত ২০২৫ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝিতে বন্ধুবর দেবব্রত বণীক পরিমলের নিকট এই দুলর্ভ ছবিটির সন্ধান পাই। অতঃপর ছবিটি নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার ও শোভা ফটো স্টুডিওর মালিক বন্ধুবর সৈয়দ মোহাম্মদ আজমের স্মরণাপন্ন হই; তিনি আমাকে বিনা পারিশ্রমিকে ছবিটি চকচকে করে দেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ছবির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সেই ৮০ ও ৯০ এর দশকের শিক্ষা ব্যবস্থা, ছাত্র--শিক্ষক সম্পর্ক, সহপাঠি হিসেবে ছাত্র–ছাত্রী সম্পর্ক, স্কুলের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতিসহ আরো অনেক কিছু!
প্রসঙ্গত, আধুনিক নকশায়, দৃষ্টিনন্দন ও শৈল্পিক নিমার্ণশৈলিতে অনন্য আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠটি ১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধের সময় বর্তমান স্থানে নিমার্ণ করা হয়েছিল। শুরুতেই স্কুলের লাগোয়া দক্ষিণ পাশে মাঝারি আকারের একটি পুকুর ছিল। পূর্ণিমারাতে চাঁদের উজ্জ্ব আলো যখন পুকুরের জলে সফেদ রঙের দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনটির প্রতিবিম্বব পড়তো, তখন এক অনন্য দৃশ্যের সৃষ্টি হতো; সবাইকে এই নয়নাভিরাম দৃশ্য বিমুগ্ধ করতো। কিন্তু হ্যায়! কালেরপরিক্রমায় স্মৃতিময় সেই পুকুরটির এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে স্কুলের চোখধাঁধানো অবকাঠামোগত অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের সময় এধরনের পরিবর্তন ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার।
চমকপ্রদ এই ছবিটি পেয়ে আমি ভীষণ স্মৃতিকাতর হয়ে পরি। আমি ফিরে যাই আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ১৯৮০ সালের দিকে। তখন আমরা এসএসসি পরীক্ষার পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছি। ওই সময় নভেম্বর ১ তারিখ থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফর্মফিলাপ শুরু হতো আর তা শেষ হতো ৩০ নভেম্বরের দিকে। তারপর ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতো কোচিং ক্লাস। কোচিং চলতো এক নাগাদ তিন মাস পর্যন্ত। ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে এসএসসি পরীক্ষার রুটিন দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশীত হতো। পরীক্ষা শুরু হতো ১ মার্চ থেকে এবং তা শেষ হতো এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে। পরীক্ষা চলাকালে বা পূর্বে এখনকার মতো তখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো না। পরীক্ষার ফলাফল তিন মাস পর দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হতো।
এই অসাধারণ ও দুস্প্রাপ্য স্থিরচিত্রটি তুলা হয়েছিল ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে সূর্যাস্তের ঠিক আগের মুহূর্তে ; তখন ছিল এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের দিন। ছবিটি তুলে ছিলেন তৎকালীন আখাউড়ার বিখ্যাত ফটোগ্রাফার হারাধন ফটো স্টুডিওর মালিক হারাধন সাহা। এসময় সাদা-কালো ছাড়া অন্য কোনো ধরনের ছবি ছিল না। সাদা-কালো ছবিতে শুধু আলো বা উজ্জ্বলতার ভিন্নতা ছিল। ওই সময় ক্যামেরা সবার কাছে ছিল না। তাই ইচ্ছা করলেই এখনকার মতো যখন-তখন ছবি তুলা যেতো না। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির ব্যস্ততার কারণে অনেক পরীক্ষার্থীই ওই দিন এই ফটোসেশনে অংশ নিতে পারেনি।
উল্লেখ্য, ৮০ ও ৯০ এর দশকে আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আখাউড়া’ থেকে প্রতি বছরই প্রায় ১২০ জনের মতো শিক্ষার্থী এসএসসি টেস্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতো। এর মধ্যে প্রায় ৩০ জনের মতো শিক্ষার্থী উক্ত পরীক্ষায় উত্তির্ণ হতে ব্যর্থ হতো। তখন তাদেরকে দশন শ্রেণিতেই নতুন ছাত্রদের সাথে ক্লাস করতে হতো। আর যারা নতুনদের সাথে ক্লাস করতো না, তাদেরকে ছাড়পত্র নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হতো। এমতাবস্থায় এদের মধ্য থেকে কিছু দুষ্ট প্রকৃতির ছেলেরা আমাদের স্কুলের তৎকালীন জাদরেল প্রধান শিক্ষক আবুল হাশেম স্যারের নামে অতিগোপনে পোস্টারিং করতো, স্যারের বাসায় রাতের বেলায় গোপনে ঢিল ছুড়তো, স্যারের বাগানের ফল চুরি করে নিয়ে যেতো। এতে হাশেম স্যার মোটেই বিচলিত হতেন না। স্যার তার সিদ্ধন্তেই অটল থাকতেন। প্রশাসক ও শিক্ষক হিসেবে হাশেম স্যার ছিলেন সাহসী ও স্পষ্টবাদী মানুষ। স্কুলের ছাত্র–শিক্ষক ও স্টাফরা সব সময়ই তার ভয়ে তটস্থ থাকতো। বর্তমানে এমন দৃঢ়চিত্তের প্রধান শিক্ষক খুবই কম দেখা যায়।
আমাদের সময় স্কুলের প্রতিটি ক্লাসে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীদের সংখ্যা অনেক কম ছিল। ওই সময় মেয়েদের দিকে তাকিয়ে কথা বলা বা বিনা প্রয়োজনে বাক্য বিনিময় ছিল একধরনের অশুভন আচরণ। ছাত্র-ছাত্রীরা বেশ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতো। এখনকার মতো ছেলে-মেয়ের মধ্যে অবাধ মেলামেশা ছিল না। এখনকার মতো ইভজিটিং বা যৌন হেনস্থা ছিল তখন অকল্পনীয় ব্যাপার।
সেই আশির দশকে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত আমাদের প্রাণের বিদ্যায়তনে সম্মানীত শিক্ষক মহোদয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০/৩৫ জন। সরকারি চাকরির কারণে বেশ কিছু শিক্ষক বদলী হয়ে অন্য স্কুলে চলে যেতেন–তদস্থলে আসতেন নতুন শিক্ষক। সত্যি কথা বলতে কি দীর্ঘ ৪৫ বছরের ব্যবধানে অনেক সহপাঠিদের নাম ভুলে গিয়েছি, কিন্তু সেই সময়কার গুণবান শিক্ষকদের নাম আজও ভুলিনি!!
শিক্ষার প্রতি নিবেদিত প্রাণ ওই সময়কার সব সম্মানীত শিক্ষকরাই ছিলেন–বিজ্ঞ, নিরহংকার, আমায়িক,নিষ্ঠাবান, ত্যাগী, সাহসী, আপোষহীন, নির্লোভ ও ছাত্র বান্ধব। শিক্ষার্থীদেরকে তারা নিজ সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। ছাত্র–ছাত্রীদের যেকোনো সমস্যা চটজলদি সমাধান করে দিতেন। কোনো শিক্ষার্থী ২/৩ দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে, তার বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নিতেন। এমনকি কোনো শিক্ষার্থী কোনো বিষয় বোঝার জন্য শিক্ষকদের বাড়িতে গেলে বিরক্ত না হয়ে খুশীমনে তা বুঝিয়ে দিতেন।

আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরকে খেলাধুলা, স্কাউট, বির্তক প্রতিযোগিতা, গানবাজনা, কবিতা আবৃত্তি,অভিনয় ইত্যাদির প্রতি বেশ উৎসাহ দিতেন। এসব ত্যাগী শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ছাত্রদের অবিরাম সাধনার বদৌলতে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আখাউড়া’ অত্র এলাকার মধ্যে অদ্বিতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়। জ্ঞান গরিমার দিক দিয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে আমাদের স্কুলের শিক্ষকরা ছিলেন সর্বোত্তম।
আমাদের সময় এখনকার মতো কোচিং বাণিজ্য ছিল না। শিক্ষকতা পেশার বাণিজ্য ব্যবহার ছিল অচিন্তনীয়। শিক্ষকতাকে তখনকার শিক্ষাদাতারা চাকরি নয়, ব্রত হিসেবে নিয়ে ছিলেন। তবে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বিশেষ অনুরোধে কিছু কিছু গুরুজন নিজ বাসায় প্রাইভেট পড়াতেন। এদের মধ্য থেকে গরীব ছাত্রদের কাছ থেকে কোনো টাকা নিতেন না এবং দুর্বল ছাত্রদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতেন।
এখনকার মতো তখন পরীক্ষা পাস করানোর নামে শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট পড়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। এধরনের নেতিবাচক আচরণ ছিল কল্পনার অতীত। এছাড়াও আমাদের সময় কোনো ছাত্র পড়া না পারলে, স্কুল ফাঁকি দিলে বা কোনো ধরনের ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করলে–এ জন্য শাস্তি ছিল অবধারিত। এখনকার মতো ছাত্রকে শাস্তি দেওয়ার কারণে তখন শিক্ষককে কোনো ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি বা হেনস্তার শিকার হতে হতো না।
সার্বিক বিবেচনায়, আমাদের সময়ে ছাত্র–শিক্ষক সম্পর্ক ছিল–স্নেহ, শ্রদ্ধা এবং শাসনের ওপর ভিত্তি করে, যা প্রায়ই একটি পরিবারের মতো ছিল। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষকের প্রতি ঐতিহ্যগত শ্রদ্ধাবোধ কিছুটা কমে গেছে।
সুতরাং সামগ্রিকভাবে প্রকৃত অর্থেই আমি একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি যে, সেই আশির দশকে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়,’ আখাউড়া–এর এসব গুণবান শিক্ষকদের ছাত্র ছিলাম। মানুষ গড়ার কারিগর এসব গুণী শিক্ষকদের মধ্যে যারা ইহলোকত্যাগ করেছেন তাদের জান্নাত কামনা করছি আর যারা বেঁচে আছেন তাদের দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবন প্রত্যাশা করছি।
(ছবিতে সামনে বসা বাম দিক থেকে যথাক্রমে–যজ্ঞেশ্বর বণীক স্যার, আরফান আলী স্যার, তোফায়েল আহমেদ হেডক্লাক, তোফাজ্জল স্যার, অরুণ স্যার, মুজিবুল হক স্যার, শামসুল হক স্যার, আব্দুল ওয়াজেদ স্যার, আব্দুল মান্নান স্যার, অমল দত্ত স্যার(গানের স্যার), রফিকুল ইসলাম স্যার, সর্দার আব্দুল রশিদ স্যার, দিলীপ ভৌমিক স্যার ও ফয়জুল কবীর স্যার।)
খায়রুল আকরাম খান
এসএসসি ব্যাচ–১৯৮০
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
