বিশ্বকাপ ফুটবল সাধারণত ৪ বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩০ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে শুধুমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে এই প্রতিযোগিতাটি স্থগিত ছিল, অন্যথায় এই চার বছরের চক্রেই তা মেনে চলা হচ্ছে।
বলাবাহুল্য, ফুটবল বিশ্বকাপের মতো একটি বিশাল আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করতে প্রতিটি দলের বাছাইপর্ব এবং আয়োজক দেশগুলোর লজিস্টিক প্রস্তুতির( যেমন: স্টেডিয়াম নিমার্ণ, নিরাপত্তা ও আতিথেয়তা) জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়।
বর্তমান বিশ্বকাপ ফুটবল হলো এই প্রতিযোগিতার ২৩তম আসর। এই প্রতিযোগিতায় ৪৮টি দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগের আসরগুলোর ৩৮টি দল থেকে প্রসারিত করা হয়েছে। চলিত বছরের ১১ জুন রাত ১টায় মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে ফুটবল লড়াইয়ের মাধ্যমে ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬ শুরু হয়েছে এবং ১৯ জুলাই রাত ১টায় ফাইনাল খেলার মাধ্যমে এই আয়োজনের আপাতত পরিসমাপ্তি ঘটবে।
বলবার অপেক্ষা রাখে না যে, ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই মেতে ওঠে বিশ্বের প্রতিটি সীমান্ত। বাংলাদেশের মতো ৬৪ হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট দেশটিও এর ব্যতিক্রম নয়, বিশ্বকাপের হাওয়া লাগামাত্রই বদলে যায় দেশের অলিগলি। শহরের অলিগলি, গ্রামাঞ্চলের চায়ের দোকান, স্কুল-কলেজের আড্ডা–এমনকি অফিসের বিরতিতেও ঢুকে পড়ে একটাই আলোচনা–চলমান বিশ্বকাপ ফুটবল। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল-ফ্রান্স ও জামার্নীকে ঘিরে যে উম্মাদনা তৈরি হয়, তা অনেক সময় বিশ্বকাপের মাঠের উত্তাপকেও ছাড়িয়ে যায়। এটা শুধু খেলা দেখার বিষয় নয়, বরং একটি সামাজিক পরিচয়, আবেগের প্রকাশ এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বকাপের সময় পুরো দেশ-বিশেষকরে গ্রামাঞ্চল ও শহরের অলিগলি প্রিয় দলগুলোর(যেমন: ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স- জামার্নী) পতাকার রঙে ছেয়ে যায়। এমনকি অনেকে বাড়ির ছাদ বা পুরো বাড়িই প্রিয় দলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে ফেলেন। ভক্তরা নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতে প্রিয় দলের পোশাক পরিধান করে প্রিয় দলের শত শত ফুট দীর্ঘ পতাকা বানিয়ে র্যালি করেন।
এসময় প্রতিটি পাড়া-মহল্লা, ক্লাব-স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে বড় প্রজেক্টর বা জায়ান্ট স্ক্রিনে ম্যাচ দেখার আয়োজন করা হয়। গভীর রাতে খেলা দেখার জন্য ভক্তরা চা-কফি ও ফাস্টফুডের দোকানে দলবেধেঁ আড্ডা জমায়। খেলা শেষে ভক্তদের আনন্দ মিছিল ও বিজয় উৎসব পুরো রাত ধরে চলতে থাকে। সব মিলিয়ে বরাবরের মতো এবারও বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ফিফার সর্বশেষ র্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশ ফুটবল দলের অবস্থান বর্তমানে ১৮১তম, কিন্তু আবেগ-উম্মাদনার ক্ষেত্রে পৃথিবীর মধ্যে সবার শীর্ষে। যেখানে নিজের দেশ খেলছে না–সেখানে এমন পাগলামী বিশ্বের খুব কম দেশেই এমন দৃশ্য দেখা যায়। বিশ্বের অন্যান্য ফুটবল পাগল দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, ইতালি, স্পেন বা ইংল্যান্ড অন্যতম। তবে তাদের উম্মাদনা তাদের নিজস্ব জাতীয় দল বা স্থানীয় ক্লাবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো কোনো নিদির্ষ্ট অ-অংশগ্রহণকারী দেশের পক্ষে পুরো জাতি এমন বিভক্ত হয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে মেতে ওঠে না। ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া এবং ভারতেও ফুটবলের বিপুল দর্শক রয়েছে; তবে ফ্যান-কালচার ও উৎসবের মাত্রায় বাংলাদেশের রূপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানে কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়, এটি একটি সামাজিক উৎসব
একটি পরিচয়ের প্রকাশ এবং একটি দীর্ঘদিনের আবেগের ধারাবাহিকতা। আর্জেন্টিা-ব্রাজিল-ফ্রান্স বা স্পেন–যেই দলই হোক, বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের মানুষ একসঙ্গে হাসে, কাঁদে, তর্ক করে এবং উদযাপনে মেতে ওঠে। আর সেই মিলিত আবেগই ফুটবলকে এখানে শুধু খেলায় সীমাবদ্ধ রাখে না, এটা হয়ে ওঠে জীবনেরই অংশ।
১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা রঙিন টেলিভিশনে সর্বপ্রথম বাংলাদেশর দর্শকরা দেখতে পায়। বিশ্বখ্যাত খেলোয়ারদের নান্দনিক খেলা বাংলাদেশী ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে এক নব উদ্দীপনা ও নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করে। তবে এই প্রবল আবেগ ও উম্মাদনার ব্যাপকতা পায় ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে। কথিত আছে, ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফুটবল টুনার্মেন্ট ছিল ফিফার ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি তারকা সমুদ্ধ ও কিংবদন্তিতুল্য আসর। ওই আসরে ব্রাজিলের জিকো-সক্রেটিস-ফ্যালকাও, আর্জেন্টিনার দিয়াগো ম্যারাডোনা-জর্জ বুরুচাগা-সার্জিও বাতিস্তা, ফ্রান্সের মিশেল প্লাটিনি-অ্যামুরোস-জেন টিগানা, পূর্ব জামার্নীর লোথার ম্যাথোউস- কার্ল হেইঞ্জ রুমেনিগে-পিটার মুলার, ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার-পিটার শিল্টন-ব্রায়ান রবসন, বেলাজিয়ামের এনজো সিফো, ইতালির জানলুকা ভিয়ালি-পাওলো রসি-ওয়াল্টার জেঙ্গা, পোল্যান্ডের বনিয়েক, উরুগুয়ের ফ্রান্সেসকোলি, প্যারাগুয়ের হোসে লুইস চিলার্ভাট, স্পেনের এমিলিও বুত্রাগেনিয়ো, ডেনমার্কের মাইকেল লাউড্রপ, মেক্সিকোর হুগো সানচেজ, বুলগেরিয়ার জর্জি দিমিত্রভ, হাঙ্গেরীর মার্টন এস্তেরহাজি, সোভিয়েত ইউনিয়নের আনাতোলি ডেমিয়ানেনকো, মরক্কোর মোহাম্মদ তিমুমি, ক্যামেরুনের কানা বায়িক-রজার মিলাসহ বিভিন্ন ফুটবলারদের অসাধারণ নৈপূণ্য ও রূপকথার মতো ফুটবল খেলা বাংলাদেশী দশর্করদের মনে গভীর দাগ কাটে। এসব কিংবদন্তি ফুটবলারদের মতো এমন ছন্দময় খেলা এর আগে বাংলাদেশের জনগণ কখনো দেখেনি। আর তখন থেকেই মূলত ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স ও জার্মান দলের সমর্থনের এই তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও উম্মাদনা স্থায়ীরূপ নেয়। তবে আমাদের দেশে বর্তমানে অন্যান্য দলের চেয়ে উত্তর আমেরিকার দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দলের supporter সবচেয়ে বেশি এবং তাদের ফুটবল উম্মাদনাও বেশি। অবাক হওয়ার বিষয়, আমাদের দেশে বিশ্বকাপে প্রিয়দলের প্রতি আবেগ ও উত্তেজনা দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসলে বিশ্বকাপে নিজস্ব জাতীয় দল না থাকায় বিশাল শূন্যতা পূরণ করতে গিয়েই আমাদের দেশের মানুষ ভিনদেশের ফুটবলকে নিজেদের আবেগে পরিণত করেছে।
এখন প্রশ্ন আসে–বাংলাদেশী দর্শকরা আর কতকাল বিশ্বকাপে ভিনদেশী দলের সমর্থক হয়ে থাকবেন? এখন সময় এসেছে ফুটবলের এই জোয়ারকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।
তবে একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশীদের এই আবেগ ও উম্মাদনা ফুটবলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু ইতিবাচক দিক হওয়া সত্ত্বেও, দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়নের জন্য শুধু এই আবেগই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি দেশের ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়ন, ঘরোয়া লীগের মান বৃদ্ধি, যুগোপযোগী ফুটবল অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা, বয়স ভিত্তিক দীর্ঘ মেয়াদী আন্তর্জাতিক মানের শক্তিশালী কঠোর প্রশিক্ষণ এবং ফুটবল উন্নয়নের জন্য আর্থিক ও স্পন্সারশিপের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। অভিজ্ঞমহলের অভিমত, যদি এসব পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ফুটবল দল একদিন না একদিন মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে অংশগ্রহণ করতে পারবে। আর তখনই বাংলাদেশী ফুটবলপ্রেমীদের এই প্রবল আবেগ ও উম্মাদনা সফল ও সার্থক হবে।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
