ফেনী একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক জনপদ। এর প্রায় হাজার বছরের পুরনো গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। প্রাচীনকালে এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সমতট অঞ্চলের অংশ এবং পরর্বতীতে বিভিন্ন রাজবংশ, ত্রিপুরা রাজ্য, সুলতানি ও মুঘল শাসনাধীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল।
ফেনী নদীর নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম রাখা হয়েছে ফেনী। দূর অতীতে এ অঞ্চল ছিল সাগরের অংশ, তবে উত্তর-পূর্ব দিক ছিল পাহাড়িয়া অঞ্চলের পাদদেশ। আর এই পাহাড়িয়া পাদদেশের ওমরাবাদ পরগণার ‘কচুয়া গ্রামে’ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ত্রিপুরার রৌশনাবাদ পরগণার কৃষক বিদ্রোহের নায়ক শমসের গাজী। জনশ্রুতি আছে, ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ভাটির বাঘ বলে অভিতিহ করা হতো। নবাব সিরাজুদ্দৌলার পর তিনিই উপনিবেশিক শক্তির হাতে নির্মমভাবে প্রথম শহীদ হন।
এছাড়াও ফেনী সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধের সময় বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এর মধ্যে শুভপুর ও বিলোনিয়ার যুদ্ধ অন্যতম। ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে যে সকল মহকুমাকে মানোন্নীত করে জেলায় রূপান্তর করা হয়েছিল ফেনী জেলা তার একটি। ১৯৮৪ সালের পূর্বে এটি নোয়াখালীর জেলার একটি মহকুমা ছিল।

জহিরিয়া মসজিদ
ব্যক্তিগত জীবনে আমার শৈশবকালের বেশ কয়েকজন বন্ধুর আবাসস্থল, আমার একমাত্র পুত্র আজিমুল আবিদ খানের কর্মস্থল ও তার শ্বশুরবাড়ি এই ফেনী জেলায়। সুতরাং ইতিহাস-ঐতিহ্য ও আত্মীয়তার বন্ধনের কারণে ফেনী আমার অতিপ্রিয় ও পছন্দের জনপদ। একদিন সুযোগ হয় সস্ত্রীক এই এলাকায় ভ্রমণ করার। দিনটি ছিল চলিত ২০২৬ সালের ৪ আগস্ট, রোজ মঙ্গলবার। ওই দিন আমরা সপ্তাহ খানেকের সময় নিয়ে ট্রেনযোগে ফেনী যাওয়ার জন্য বাসা থেকে রওয়ানা দেই এবং সকাল ১০টার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে পৌঁছি।
স্টেশনে মানুষের ব্যাপক ভিড় ও হকারদের নানা পণ্যের ডাক এক জমজমাট পরিবেশ তৈরি করেছিল। প্রায় ১০ দিন আগে ছেলে ও তার শ্বাশুর বাড়িতে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া টু ফেনীর দুটি টিকিট কেটে ছিলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক দেরীতে আমাদের কাঙ্ক্ষিত চট্টগ্রামগামী ‘মহানগর প্রভাতী এক্সপ্রেস’ ট্রেন বিকট শব্দে হর্ণ বাজিয়ে ১ নাম্বার প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে। আমরা হুড়োহুড়ি করে দ্রুত নিদির্ষ্ট কামরায় ওঠে জানালার পার্শ্বের সিটে বসি।
অতঃপর ট্রেন-পরিচালকের বাঁশির আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনটি ঝকঝক শব্দে চলা শুরু করল। এসময় জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখী, বর্ষার জলে ধানের জমিগুলো পরিপূর্ণ। চারদিকে জল থই থই করছে-দিগন্তবিস্তৃত ধানখেত বৃষ্টির পানিতে ভরে কূলহীন সাগরে পরিনত হয়েছে। বিশাল জলরাশির বুকে বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে ছোট ছোট দ্বীপের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে, কচুরিপানা হয়ে যেন পানিতে ভাসছে গ্রামগুলো। এভাবে গ্রাম বাংলার নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করছিলাম।

মহিপাল ফ্লাইওভার
ট্রেন চলাবস্থায় টিকিটচেকার যাত্রীদের টিকিট চেক করছেন। তবে যারা টিকিট কাটেননি তারা টিটিকে(টিকিটচেকার) নগদ সেলামি দিয়ে রেহাই পাচ্ছেন। এইদিকে কিছুক্ষণ পর পর হকাররা বাদাম, চিপস, চানাচুর, চটলেট, ঝালমুড়ি, ঠান্ডা পানি, চা,কফি,পেয়ারা, আমরা এবং বাচ্চাদের খেলানা সামগ্রী বিক্রি করার জন্য কামরায় আসা-যাওয়া করছিল। বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেন থামার সময় যাত্রীদের ওঠা-নামার ব্যস্ততা দেখতে বেশ ভালো লাগছিল। আমাদের সামনের সিটে বাসাছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী-তাদের সাথে গল্প করতে করতে কখন যে ট্রেনটি লাকসাম স্টেশনে পৌঁছাল, তা টেরই পেলাম না।
ট্রেনটি যখন গুনবতি স্টেশন পৌঁছায়, ঠিক তখনই আমাদের বৌমা মারিয়া সুলতানা মোবাইল ফোনে বলেদিচ্ছিলেন, কিভাবে তাদের রাজাপুরের বাসায় যেতে হবে। প্রায় দুপুর ২ টারদিকে আমাদের ট্রেনটি ফেনী স্টেশনে থামে। ফেনী রেলওয়ে স্টেশনটি ১৮৯২ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা রেলপথের একটি প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট, যেখান থেকে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ট্রেন চলাচল করে। এটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম পুরোনো ও ব্যস্ত রেলওয়ে স্টেশন। আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের তুলনায় এখানে যাত্রীদের ভিড় ও বিশৃঙ্খলা অনেক কম। ঠেলাঠেলি কম হওয়ার কারণে অতি সহজে ফুট-ওভারব্রিজ দিয়ে স্টেশন চত্বর পার হয়ে আমরা সিএনজি স্ট্যান্ডে পৌঁছি এবং বৌমার কথা মতো মহিপাল যাওয়া জন্য অটোরিকশায় ওঠি। ফেনী জেলাকারাগার, ফেনী পৌরসভা, দোয়েল চত্বর, জগন্মনাথ মন্দির কমপ্লেক্স, জহিরিয়া মসজিদের পাশ দিয়ে শহিদুল্লাহ কায়সার রোড হয়ে আমাদের বহনকারী অটোরিকশাটি মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে পৌঁছে। এলাকাটি খুব ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির দোকান, রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল, ফলের দোকান, আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালসহ আরো অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।

রাজাপুর বাজারের প্রবেশ মুখ
উল্লেখ্য, মহিপাল ফ্রাইওভার বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র সিক্স লেনের উড়াল সেতু। এটি ২০১৮ সালে চালু হয়েছিল। তবে মূল ছয় লেনের পাশাপাশি নিচে চারটি সার্ভিস লেন রয়েছে। মহিপাল ফ্লাইওভারটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট অনেক কমিয়েছে। ফ্লাইওভারটি চালুর হওয়ার আগে এখানে সব সময় যানজট লেগে থাকত। ফেনীর জনগণের সার্বিক উন্নয়নে এই উড়াল সেতুটি যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে।
অতঃপর আমরা পায়ে হেঁটে উড়াল সেতুর নিচ দিয়ে খুব সাবধানে ফেনী ট্রমাসেন্টারের সামনে যাই এবং রাজাপুরগামী সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ওঠি।
মসৃণ মাটির আকাঁবাকাঁ রাস্তা দিয়ে আমরা যাচ্ছি। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ, ধানক্ষেত, ছোট ছোট জঙ্গল, ডোবা-পুকুর-খাল পেরিয়ে যাচ্ছে আমাদের অটোরিকশা। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি দেখে মনটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। আজ শ্রাবন মাসের ২০ তারিখ-বর্ষা ঋতুর যৌবনকাল। অবিরাম বৃষ্টির কারণে গাছের পাতা ও ঘাস সতেজ ও উজ্জ্ব সবুজ বর্ণ ধারণ করেছে। আকাশে কালো মেঘের ভেলা ভাসছে-যেকোন সময় মুষলধারে বৃষ্টি হতে পারে। এমতাবস্থায় অটোর চালক অতি দক্ষতার সাথে দ্রুত গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
নদীর মতো একেঁবেকেঁ চলা এই রাস্তায় পেডেল রিকশা, বাইসাইকেল, অটোরিকশা বা পায়ে হেঁটে চলা মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। প্রায় ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে আমরা রাজাপুর বাজারে পৌঁছি। বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক শোন যাচ্ছে। বাজারটি একটি নদীর পার্শ্বে অবস্থিত। এটি স্থানীয় চাষিদের উৎপাদিত সব ফসল বিক্রির স্থান এবং আশপাশ মানুষের যোগাযোগের একটি চমৎকার মিলন মেলাও বটে। এই এলাকায় আমি নবাগত হলেও, ছেলের বাসা খোঁজে পেতে তেমন সমস্যা হয়নি। আমরা দুপুর ৩ টারদিকে ছেলের বাসায় পৌঁছি। (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
