স্নান ও মধ্যাহৃভোজ সম্পন্ন করে আমরা একটা লম্বা ঘুম দেই, কিন্তু মেঘের গর্জনে হঠাৎ আরামের ঘুম ভেঙ্গে যায়। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার-ঝুমঝুম শব্দে বৃষ্টি পড়ছে। গাছের পাতায় ও টিনের চালে অবিরাম বৃষ্টি পড়ে এক মধুময় সুর তৈরি করছে।
ওদিকে হেঁশেল ঘর থেকে আসছে তেলেভাজা পিয়াজু ও পুড়ির গন্ধ। নিপুণ রন্ধন শিল্পী মারিয়া গরম গরম পিয়াজু, ডালের পুড়ি, কড়মড়ে মুড়ি ও ধোয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় হাজির। আমরা দ্বিতল ঘরের সামনের বারান্দায় বসে পিয়াজু-পুড়ি ও মুড়ি খাচ্ছি আর মাঝে মাঝে গরম গরম চায়ের কাপে চুমুদিচ্ছি, কোলাহলমুক্ত পরিবেশে বৃষ্টি দেখছি আর মোবাইল ফোন থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ গানটি শুনছি-এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি!!
সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে যে ঘন কালো মেঘে পুরো আকাশ ছেয়ে গিয়েছিল তার অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। বৃষ্টির তেজও কমে গেছে। বিষন্ন আকাশ অঝোর ধারায় কেঁদে কেঁদে এখন যেন ক্লান্ত, পরিশান্ত। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে গেছে। আবার কর্মচঞ্চল হয়ে উঠলো মানুষ। রিকশার ঠুং ঠাং আওয়াজ, সিএনজি ও ট্রাকের হর্ণ শোনা যেত লাগলো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখী, রাজাপুরের রাস্তাগুলো কাদাজলে পিচ্ছিল হয়ে গেছে। এই অবস্থায়-ই আমার ছেলে আবিদ খান অর্ধভেজা হয়ে কর্মস্থল থেকে হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ফিরছে। বারান্দা ছেড়ে ঘরের ভেতর যাব- এমন সময় আকাশে তাকিয়ে দেখী, মেঘের ফাঁকে রূপার মতো বিশাল চাঁদ একটু দেখা দিয়েই আবার হারিয়ে গেছে মেঘের আড়ালে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আজ আষাঢ়ে পূর্ণিমা।

রাজাপুর বাজার
আমাদের বৌমা মারিয়া সুলতানা মিম লেখাপড়ায় যেমন মেধাবী, রান্নায়ও তেমন দক্ষ রাধুনী। তার মুখরোচক খাবার খেয়ে তো আমরা অভিভূত! সে আমাদের তুষ্টির জন্য একএক বেলা একএক ধরনের খাবার তৈরি করছে। তার পরিশ্রমের কোনো তুলনা-ই হয় না। তার মজাদার খাবার খেয়ে আমাদের বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে, বৃহত্তর নোয়াখালী তথা ফেনী জেলা সমুদ্র উপকূল অঞ্চল হওয়ার কারণে এ এলাকার লোকেরা সামুদ্রিক মাছ ও শুটকি, নরমভাত এবং ঝুলকম তরকারী খেতে পছন্দ করে। তবে ভাটি অঞ্চলের অধিবাসী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকেরা এর বিপরীত সব খাবার পছন্দ করে। তারপরও মারিয়া সর্বদা চেষ্টা করতো এই বৈপরীত্যের মধ্যে সমন্বয় করতে।
ফেনীর দাগনভূইয়া উপজেলার রাজাপুর বাজার ও এর আশপাশের এলাকায় বেশ কিছু গ্রাম রয়েছে। যেমন-যাদবপুর, গনিপুর, দিলপুর, মেহেদীপুর, রতনপুর, তেমনিবাজার,লতিফপুর, সিন্দুরপুর, কোরাইশ মুন্সী বাজার ও বিরলি বাজার। কোলাহলমুক্ত গ্রামগুলোর চারদিকে নিবিড় কালচে সবুজের সমারোহ। এখানকার আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, সবুজ ধানখেত, বিভিন্ন গাছগাছালি, জঙ্গল, পুকুর-খাল-ডোবা,পাখ-পাখালির কলরব ও এলাকার মানুষের সহজ-সরল জীবন গ্রামগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশকে আরো সমৃদ্ধ এবং বিকশিত করেছে। যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো এ দৃশ্য!

দাগনভূইয়া-রাজাপুর সড়ক
তবে ফেনী জেলার বেশির ভাগ লোক প্রবাসী হওয়ার কারণে কিছু কিছু গ্রামের চেহারা বদলে গেছে অনেকটাই। রাজাপুর ইউনিয়নের কিছু কিছু গ্রাম আজ এতটাই সমৃদ্ধ যে সেখানকার বাড়িঘর দেখলেই প্রাচুর্যের ছাপ চোখে পড়ে। বিশেষ করে গ্রামের যেসব এলাকায় প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি, সেখানে গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা। আবার গ্রামের অনেক মানুষ ব্যবসা বা চাকরির কারণে শহরে বসবাস করেন, কিন্তু নাড়ির টানে গ্রামে ফিরে অবসর কাটাতে চান। তারাও তৈরি করেছেন ছোট কিংবা মাঝারি আকারের দ্বিতীয় আবাস।
ফেনীর দাগনভূইয়া উপজেলার ২ নং রাজাপুর ইউনিয়নের অধীন রাজাপুর একটি আদর্শ গ্রাম। এই এলাকায় রয়েছে বেশ কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ডাকঘর, ইউনিয়ন অফিস, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংক। জনশ্রুতি আছে, ত্রয়োদশ শতকে গ্রামটি ভুলুয়া রাজ্যের শাসনাধীনে ছিল। ১৮৭৬ সালে বৃহত্তর নোয়াখালী এলাকা গঠিত হলে দাগনভূইয়া ও রাজাপুর অঞ্চল তার অংশ হয়। ১৯৬৫ সালে রাজাপুরে প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী রাজাপুর হাইস্কুলে একটি বড় সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করেছিল।
এই গ্রামে আমি ৩/৪ দিন অবস্থা করেছিলাম। ওই সময় প্রতিটি গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখেছি ও মানুষের সাথে মিশেছি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, গ্রামবাসীরা একে অপরের সুখে-দুখে দাঁড়ায়। আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো এখানে কোনো ধরনের গোষ্ঠীগত দাপট নেই। সবাই মিলেমিশে বসবাস করছেন। ছোটখাটো সমস্যাগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তারা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সমাধান করে নেন। নবাগতদের তারা যথেষ্ট আদর-সম্মান করেন। আমি রাজাপুর এলাকাবাসীর আচার-আচরণে মুগ্ধ।
প্রায় চার দিন রাজাপুর অবস্থান করার পর মারিয়াদের ফেনী শহরের বাসায় যাওয়ার জন্য দুপুর সাড়ে বারটার দিকে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ওঠি। আমাদের সঙ্গে ছিলেন ছেলে ও বৌমা। বাসা থেকে বের হওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে মুষলধারের বৃষ্টি হয়েছিল। সেই বৃষ্টিতে ধুয়ে-মুছে গাছপালা ও খেতের ধানগাছগুলো সতেজ হয়ে ওঠেছে। চারদিকে তাকিয়ে দেখছি, সবুজ আর সবুজ। শ্রাবন মাসের অতি বৃষ্টির পানিতে মাঠ-ঘাট, খাল-ডোবা-পুকুর ভরপুর। সেইপানিতে স্থানীয় কিশোরা জাল দিয়ে মাছ ধরছে, কেউ ডুব দিয়ে শালুক তুলছে, কেউ মানের আনন্দে লাই খেলা খেলছে আবার কেউ কলাগাছের ভেলায় বর্ষার জলে ভেসে আনন্দ করছে।

রাজাপুর আবাসিক এলাকা
গ্রামের এই আঁকাবাঁকা রাস্তার আনাচে-কানাচে ফুঁটে থাকা ভেজা কদম, কেয়া ও কামিনী ফুলের মিষ্টি সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এমন অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যদিয়ে আমাদের বহনকারী আটো রিকশাটি মহিপালের দিকে যাচ্ছে।
রাজাপুর বাজার থেকে মহিপালের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। মাত্র আদা ঘণ্টার মধ্যে বিরলী বাজার, এলাহিগঞ্জ বাজার, সেলামিয়া মোড় এবং বিপনী বাতিঘর পার হয়ে আমাদের বহনকারী অটোরিকশাটি মহিপাল ফ্রাইওভার ও বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছে।
অটোরিকশা থেকে নেমে আমরা নয়া কুটুমের জন্য কিছু ফলফলাদি ক্রয় করি। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় মিষ্টি কেনা নিয়ে। এখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সারিসারি মিষ্টির দোকান নেই। যদিও ফেনীর মানুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর মতো মিষ্টিপ্রিয় মানুষ। এখানে রয়েছে জালালিয়া, জয়গোপাল, হাজীর মিষ্টির ও মনীন্দ্র বাবুর মতো বনেদি মিষ্টির দোকান। কিন্তু এখানে তো এসব ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির কোনো দোকান খুঁজে পাচ্ছি না! আমার পেরেশানী দেখে আবুল কাশেম নামে এক ফলবিক্রেতা বললেন, আঙ্কেল এখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সারিবদ্ধ মিষ্টির দোকান পাবেন না; তবে বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদাভাবে মিষ্টির দোকান পাবেন। ছেলেটির কথায় আশ্বস্ত হলাম।
অনেক খোজাখুজির পর মহিপাল এলাকায় ফেনীর বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ‘জালালিয়া’ ও ‘জয়গোপাল’ এর সন্ধ্যান পাই এবং উক্ত দুটি দোকান থেকে পছন্দের ৪/৫ পদের মিষ্টি কিনে অটোরিকশায় চড়ে শহরের জহুর হোসেন চৌধুরী সড়কস্থ মারিয়াদের বাসায় পৌঁছি। তখন সময় দুপুর ২ টা।
ওখানে গিয়ে গোসল ও যোহরের নামাজ সম্পন্ন করে দুপুরের খাবারের জন্য ডাইনিং রুমে আসি। এসে দেখী, এলাহিকান্ড! আমাদের বেয়াইন সাহেবা হাসিনা বেগম বিভিন্ন পদের খাবার দিয়ে পুরো টেবিল সাজিয়ে রেখেছেন-খাবারের সুগন্ধে পুরো বাড়িটি মোহিত হয়ে আছে। বাসার সবাইকে নিয়ে খাবার টেবিলে বসি-খাবার ফাঁকে ফাঁকে চলে আমাদের জমজমাট আঁড্ডা। খাবার শেষ হওয়ার পর ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নেই এবং বিকাল ৫ টার দিকে ফেনী শহর দেখার জন্য মারিয়া,আবিদ, আবিদের মা সালমা আক্তার ও আমি বাসা থেকে বের হই। (চলবে)
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
