সোমবার সন্ধ্যা ৭:৪৮, ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ. ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

কিশোরদের সঠিক শিক্ষা ও বিকাশ জরুরি

জাকারিয়া জাকির

প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা কিশোর অপরাধের ভয়ানক রূপ দেখতে পাচ্ছি। যে বয়সে শিশুদের শিক্ষা অর্জন, চরিত্র গঠন ও ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত মজবুত করার কথা, সেই বয়সে দেশের শিশুরা বিপথগামী হচ্ছে। যে বয়সে শিশুরা সোনালি স্বপ্ন দেখে, সেই বয়সে তারা অপরাধী হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুসারে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত প্রত্যেক মানব সন্তান শিশু হিসেবে গণ্য। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ‘কিশোর’ বলতে ৭-১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বয়ঃসীমার শিশুদের ধরা হয়। ‘কিশোর অপরাধ’ হচ্ছে কিশোর বয়সে সংঘটিত সামাজিক মূল্যবোধ ও আইনবিরোধী কাজ। কিশোর অপরাধীরা সমাজকাঙ্ক্ষিত আচরণ প্রদর্শনে ব্যর্থ। তারা সমাজের কাছে অপরাধী ও বিরক্তির উৎস। কিশোর অপরাধ সমাজের প্রথা, রীতি-নীতি ও মূল্যবোধের ওপর চরম আঘাত। শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত দেশেও এ সমস্যা তীব্রতর। সাধারণত একক পরিবার, পরিবার ভাঙন, অসৎ সঙ্গ, অশ্নীল চলচ্চিত্র, নগরায়ণ, শিল্পায়ণ ইত্যাদি কারণে কিশোর বয়সীদের একটি বড় অংশ কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ সমাজব্যবস্থায় কিশোর অপরাধ বেশি হতো শহর, নগর ও শিল্পাঞ্চলে। সময়ের আবর্তে এবং স্থানভেদে কিশোর অপরাধের ধরন-প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে। গত শতাব্দীর কিশোর অপরাধের পরিসর ছিল তুলনামূলক ছোট। যেমন- মা-বাবার অবাধ্য, শিক্ষকের অবাধ্য, স্কুল পালানো, স্কুলগামী মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ, পরীক্ষায় নকল করা, সিগারেট খাওয়া, জুয়া খেলা ইত্যাদি। কিশোর অপরাধী ও অপরাধের শিকার ব্যক্তির মধ্যে কিশোর অপরাধ সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান দৃশ্যপট ভিন্ন। কিশোর অপরাধীরা সঙ্গবদ্ধ হয়ে অপরাধ করছে। রিফাজুল ইসলাম হৃদয়ের অষ্টম শ্রেণি শেষ না হতেই শিক্ষাজীবনের ইতি। মা-বাবার অবাধ্যতায় সে পরিবার থেকে বিতাড়িত। দালালচক্রের খপ্পরে সে কিছুদিন ভারতে অবস্থান নেয়। সম্প্রতি সে ‘টিকটক হিরো’ বানানোর উদ্দেশ্যে তরুণীদের প্রলুব্ধ করতে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে ভিন্ন ভিন্ন পার্কে দুটি পার্টির আয়োজন করে। লক্ষ্য- স্বল্প শিক্ষিত ও দরিদ্র তরুণীদের চাকরির প্রলোভনে ভিন্ন দেশে পাচার করা। কিছুদিন আগে ভারতের বেঙ্গালুরুতে এক বাংলাদেশি নারীকে বিবস্ত্র নির্যাতনের ভিডিও দু’দেশে ভাইরাল হয়। এর অন্যতম নেপথ্যে হৃদয় বাবু।

দেশে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও সংশোধনমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংখ্যা ৩টি। জানা গেল, কিশোর অপরাধের ভয়ানক চিত্র। কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে অবস্থানরত বেশিরভাগ শিশুনিবাসী হত্যা, ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন, মাদক পাচার, চুরি ও ছিনতাইমূলক অপরাধে জড়িত। কিশোর অপরাধীরা বেশিরভাগ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ সালে নানা কারণে ২৬৪ শিশু নিহত হয়েছে। ২০১৯ সালে নিহতের সংখ্যা ২২১ জন।

আমাদের কিশোররা নানা অপরাধে জড়িয়ে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পারস্পরিক ক্ষমতা প্রদর্শনের দ্বন্দ্বে তারা সঙ্গবদ্ধ হয়ে গঠন করছে এলাকাভিত্তিক গ্রুপ বা গ্যাং। পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, মাদক ব্যবসা ও প্রেম নিয়ে বিরোধের জের ধরে অহরহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে তরুণরা। অনেক সময় কোনো কোনো কিশোর গ্যাং অর্থের বিনিময়ে অর্থদাতার প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়ছে বিভিন্ন গ্যাংপ্রধান এবং গ্যাং সদস্যরা। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশের বড় বড় শহরে বিবিধ নামে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে।

দেশে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সাইবার অপরাধের ঘটনা। ইন্টারনেট ব্যবহার করার মাধ্যমে সাইবার অপরাধ সংঘটিত হয়। ইন্টারনেট অপব্যবহারের মাধ্যমে শিশু যৌন হয়রানি ও যৌন নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষত দেশের কিশোরী ও তরুণীরা ক্রমবর্ধমান হারে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিপথগামী কিশোর গ্যাং কোমলমতি তরুণীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। পর্নো ছবি ধারণ করে, সল্ফ্ভ্রমহানি ও ভাইরালের হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছে কিশোরীদের, যা বর্তমান কিশোর অপরাধের নগ্নরূপ। এ ধরনের অপরাধে কুলষিত হচ্ছে সমাজ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের সর্বাধিক সংখ্যক কিশোর অপরাধীর উদ্ভব নিম্নবিত্ত পরিবার। বিশেষত ডিভোর্সে ভাঙা পরিবার, নেশাগ্রস্ত পরিবার, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, বস্তি পরিবার ও বিবধা অরক্ষিত পরিবার। এসব পরিবারের শিশুরা আদর্শ নিয়ে বড় হয় না। অরক্ষিত পরিবারের শিশুরা সহজেই অপরাধমূলক তৎপরতায় লিপ্ত হয় এবং অপরাধী চক্রের লক্ষ্যবস্তু হয়। শিশুরা বিভিন্ন ধরনের গেম দেখে, সিনেমা দেখে, একাকিত্বে ভোগে এবং অপরাধী হয়ে ওঠে। সমাজ পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আধুনিক সমাজে পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার গঠন এবং জীবযাত্রা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন চর্চার বিষয়গুলো ভেঙে যাচ্ছে। শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা ও উন্নয়নের দায়িত্ব ব্যক্তি, সমাজ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। জ্ঞানসমৃদ্ধ ও আদর্শিক শিশু-কিশোর হোক ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের যোগ্য উত্তরাধিকার।

জাকারিয়া জাকির: সাংবাদিক, কলামিস্ট 

ক্যাটাগরি: মিনি কলাম

ট্যাগ:

Leave a Reply