সোমবার সন্ধ্যা ৬:৪০, ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ. ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

প্রাচীন যুগ মানেই অন্ধকার যুগ নয়

জান্নাতুল মাওয়া ড্রথি

সমস্যা হলো পৃথিবীজুড়ে ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সত্যকে দাবিয়ে দেওয়া, ধর্মকে ক্ষমতার ঢাল বানানো আর ধর্মের জ্ঞানগুলোকে মিথ হিসেবে প্রচার করা। পবিত্র কোরআনের মতো মহাজ্ঞান-সম্পন্ন বিষয়কে শুধু বিয়ে তালাক আর কোরবানিতে আমরা যতটা ব্যবহার করেছি, ততটা মানুষের জীবনের প্রকৃত জ্ঞান উন্নয়নে করিনি।

ভারতের বিজ্ঞানীরা নাকি আইনস্টাইনের তত্ত্ব অস্বীকার করেছে, অবশ্যই এটা তাদের মূর্খামির পরিচয় এবং ভুল সিদ্ধান্ত। কিন্তু যে ভিত্তিতে তারা অস্বীকার করেছে তার পুরোটা না হলেও কিছুটা অবশ্যই সত্যি। কারণ আমাদের একটা বড় ভুল ধারণা, প্রাচীন যুগ মানেই অন্ধকার যুগ, তখন কোনো বিজ্ঞান ছিল না। কিন্তু আসলেই কি তখন বিজ্ঞান ছিল না? দয়া করে অন্যভাবে কেউ নিবেন না, এটা শুধুই আমার নিজস্ব মতামত। প্রাচীন যুগে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাকে আমরা সত্যি বলেই মানি। অথবা কাল্পনিকই বলিনা কেন, এমনি এমনি তো যুগ যুগ ধরে মুখরোচক হয়নি। অবশ্যই কিছু একটা তো ছিল অথবা ঘটেছিল। যেমন পিরামিড বানানোর রহস্য অথবা কলাকৌশল আজও আবিষ্কার হয়নি অথবা ফেরাউন বা ফারাও দ্বিতীয় রামেসিস নীল নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা। হযরত সোলাইমান (আঃ) এর সিংহাসন আকাশে উড়তে পারা, রামায়ণ-এ বানরদের সেতু বানানো।

মহাভারতের যুদ্ধ যেটা হয়েছিল এই পৃথিবীতে, তা প্রমাণিত। সেখানে যেসব অস্ত্রের ব্যবহার বা যান চলাচলের কথা বলা আছে, সেটা না মানতে চাইলেও পুরোটা অস্বীকার করার উপায় নাই। প্রাচীন হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার পয় নিষ্কাষণ ব্যবস্থা দেখলে তো বোঝা যায়, তারা কত উন্নত চিন্তাধারার ছিল। ইবনে সিনা বিখ্যাত প্রাচীন চিকিৎসক। তার জ্ঞান আজও চিকিৎসা বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয়। টেস্টটিউব বেবির কথা আসলে মহাভারতের রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও রানী গান্ধারীর শুক্রাণু ও ডিম্বাণু দিয়ে মাটির টিউব বানিয়ে ১০০টা বাচ্চা জন্ম, এগুলো কি কিছুই ধারণা দেয়না? দাউদ (আঃ) এর পশু পাখি ও মাছদের ভাষা বুঝতে পারা, ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগান তৈরি, আবার সেই বাগানের পরিচর্যার জন্য তখনকার সমযয়ে পাইপ লাইন তৈরি করা, এটা কি জ্ঞানের অংশ নয়

আমাদের একটা বড় ভূল ধারণা, প্রাচীন যুগ মানেই অন্ধকার যুগ, তখন কোনো বিজ্ঞান ছিল না। কিন্তু আসলেই কি তখন বিজ্ঞান ছিল না? দয়া করে অন্যভাবে কেউ নিবেন না, এটা শুধুই আমার নিজস্ব মতামত। প্রাচীন যুগে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাকে আমরা সত্যি বলেই মানি। অথবা কাল্পনিকই বলিনা কেন, এমনি এমনি তো যুগ যুগ ধরে মুখরোচক হয়নি।

আজ থেকে ৪৫০০ বছর আগে মিশরের কৃতদাস টাইটার শরীরের অস্ত্রোপচার বিদ্যা, এগুলো তো মিথ্যা নয়। আবার সেই ঘটনা প্যাপিরাসে লিখে রেখে যাওয়া। সেই প্যাপিরাসগুলো আজও অক্ষত থাকা। আর আমরা সবাই জানি, প্যাপিরাস থেকেই পেপার শব্দ এসেছে। এগুলো তো আর মিথ্যা নয় বরং সময়ের দিকে খেয়াল করলে সব সমসাময়িক। তখন আকাশে উড়তে না পারুক, সমপর্যায়ের অবশ্যই কিছু ছিল। কারণ এগুলোর বিবরণ বা ব্যাখ্যা তো আজকের না। যদি বিমান আবিষ্কার না হতো তবে মিথ্যা বলা যেত। আইন নিয়ে হাম্বুরাবী কোড তো বোঝাই যায়, সে যুগের মানুষদের চিন্তা চেতনা বা কৌটিল্যে শাস্ত্র বা চার্বাক দর্শন। রামেসুম প্যাপাইরাস বা হুয়াংদি নেইজিং বা চরক সংহিতা- এগুলো তো সাক্ষ্য দেয় প্রাচীন চিকিৎসা বিজ্ঞানের।

আরো পড়ুন> সমালোচনায় জাতি শোষক পেয়েছে, শাসক নয়

এখন কথা হলো, সমস্যাটা তবে কোথায়? সমস্যা হলো, যখন সত্যি থেকে মিথের পরিমাণ বেড়ে যায়। সমস্যা হলো, সব কিছুতে দ্রাবিড়দের অস্বীকার করে বৈদিকরা নিজেদের আয়ত্বে নিতে চায়। সমস্যা হলো, মনুসংহিতার জয় হয়। সমস্যা হলো গরুর মুতে, উঠের মুতে বা ঝাড়-ফুঁকে, তাবিজ-কবজে চিকিৎসা খোঁজা। সমস্যা হলো ধর্মকে শুধুই জীবনের দর্শনে আটকে রাখা এবং ব্যক্তিস্বার্থের কুপন্থায় ব্যবহার করা। সমস্যা হলো টোটেমাভিত্তিক গোত্র-সমাজের দ্রাবিড়দের বানর, হনুমান, দানব, রাক্ষস আখ্যা দিয়ে ছোট করা ও তাদের অবদানগুলো অস্বীকার করা।

মহাভারতের যুদ্ধ যেটা হয়েছিল এই পৃথিবীতে, তা প্রমাণিত। সেখানে যেসব অস্ত্রের ব্যবহার বা যান চলাচলের কথা বলা আছে, সেটা না মানতে চাইলেও পুরোটা অস্বীকার করার উপায় নাই। প্রাচীন হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার পয় নিষ্কাষণ ব্যবস্থা দেখলে তো বোঝা যায়, তারা কত উন্নত চিন্তাধারার ছিল। ইবনে সিনা বিখ্যাত প্রাচীন চিকিৎসক।

সমস্যা হলো পৃথিবীজুড়ে ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সত্যকে দাবিয়ে দেওয়া, ধর্মকে ক্ষমতার ঢাল বানানো আর ধর্মের জ্ঞানগুলোকে মিথ হিসেবে প্রচার করা। পবিত্র কোরআনের মতো মহাজ্ঞান-সম্পন্ন বিষয়কে শুধু বিয়ে তালাক আর কোরবানিতে আমরা যতটা ব্যবহার করেছি, ততটা মানুষের জীবনের প্রকৃত জ্ঞান উন্নয়নে করিনি। বেদ ছেড়ে গীতায় খুঁজেছি রাঁধা কৃঞ্চের প্রেম। রামায়ণে কেঁদেছি সীতার সতিত্বের পরীক্ষায়। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। আমরা আমাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকে ঠাকুর মার ঝুলি শোনাতে শোনাতে তাঁরা বড় হয়ে অতীতের জ্ঞান-বিজ্ঞানগুলো কেউ ঠাকুর মার ঝুলি ভেবে বসে থাকে!

লেখকের সব লেখা

অন্যদিকে আমরা আজকের সময়কে বিজ্ঞানের যুগ বলি। অথচ এই বিজ্ঞানের সাফল্য একদিনে আসেনি। যুগে যুগে শত হাজার বছর ধরে মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করেছে, তারই ফলাফল আজকের বিজ্ঞান ও সভ্যতা। আজ আমরা যাদের সময়ের জ্ঞানকে অস্বীকার করছি অথবা অবাস্তব ভাবছি, একদিন হয়তো তাদের কাছে এই সময়টা ছিল স্বপ্ন। সৃষ্টির শুরুটাই তো এই পৃথিবীর প্রকৃত বিজ্ঞান। আমি মানুষ, যে নাকি আজকের সভ্যতাকে নিয়ে গর্ব করছি। সেই আমি বা আমরা কোথা থেকে এলাম? কত শত বছর, কত হাজার বা লক্ষ বছর আগে এলাম, কখনও ভেবেছি কি?

আজ এতো আধুনিক বিজ্ঞান থাকতেও আমাদের আত্মা অন্ধকারে। তাই নিজেদের মনের গভীরের বন্ধ দরজা খুলে না দিলে শত শত বিজ্ঞানের আলোও আমাদের সঠিক পথ দেখাতে পারবে না।

জান্নাতুল মাওয়া ড্রথি : কলামিস্ট

ক্যাটাগরি: ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞান,  প্রধান কলাম

ট্যাগ: জান্নাতুল মাওয়া ড্রথি

Leave a Reply