আজ আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে আমাদের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু হলো ভূমিকম্প আর ভাইরাসের মতো অদৃশ্য শক্তি। অথচ দৃশ্যমান শত্রুদের বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে যুদ্ধ করেই আমরা নষ্ট করছি মূল্যবান সময়, যাবতীয় অর্থ, সম্পদ ও শক্তি। এগুলো বলার কারণ, শুধু বাংলাদেশই নয়, পৃথিবীজুড়েই ভূমিকম্পের প্রকোপ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ভূমিকম্পসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কা শুধু একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। এটি বুঝতে আমাদের বড় দেরি হয়ে যাচ্ছে।
বস্তুত, ভূমিকম্প হচ্ছে ভূমির কম্পন। ভূ-অভ্যন্তরে যখন একটি শিলা অন্য একটি শিলার উপরে উঠে আসে বা সংষর্ষ হয় তখন ভূমির কম্পন হয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠের অংশবিশেষের হঠাৎ পরিবর্তন বা আন্দোলনই ভূমিকম্প।
ভূপৃষ্ঠ থেকে সাধারণত ৫–৭০০ কিলোমিটার গভীরতায় ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়। তবে ১৫ থেকে ৬৫ কিলোমিটার গভীরতায় ভূমিকম্পের কেন্দ্র অবস্থান করলে তার তীব্রতা সবথেকে বেশি হয়।
সাধারণত তিন ধরনের ভূমিকম্প হয়ে থাকে–প্রচন্ড, মাঝারি ও মৃদু। ভূমিকম্প মূলত কয়েক সেকেন্ড থেকে ১/২ মিনিট স্থায়ী হয়। মাঝে মাঝে কম্পন এত দুর্বল হয় যে, তা অনুভবও করা যায় না। পৃথিবীতে প্রতি বছরে গড়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ বার ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে ভূকম্পন তরঙ্গ আকারে পুকুরের ঢেউয়ের মতো স্থিতিস্থাপক ভূত্বকের মধ্য দিয়ে ভূপৃষ্ঠে এসে পৌঁছে। ভূমিকম্পের তরঙ্গ পৃথিবীর মধ্য দিয়ে চলার সময় পৃথিবীকে কাঁপায়
বৃহৎ শিলাখন্ডের ঘর্ষণ বা স্থানান্তর, আগ্নেগিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম বিস্ফোরণ–এই তিন কারণে ভূমিকম্প সংগটিত হয়। ভূমিকম্পের ফলে ভবন ও অবকাঠামো ধ্বংস, মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়া এবং ভূমিধস ও সুনামির সৃষ্টি হয়।
রিখটাল স্কেল নামক যন্ত্রের সাহায্যে ভূমিকরম্পর মাত্রা নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। রিখটাল স্কেলে মাত্রা ৫–এর বেশি হওয়া মানেই ভয়াবহ দুযোর্গের আশঙ্কা। ভূমিকস্প এক ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে এর মাত্রা ১০ থেকে ৩২ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। সাধারণত রিখটাল স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ৪–.৯৯ হলে মৃদু, ৫–.৯৯ হলে মাঝারি, ৬–৬.৯৯ হলে তীব্র, ৭.৯৯ হলে ভয়াবহ এবং ৮–এর উপরে হলে অত্যন্ত ভয়াবহ হিসেবে ধরা হয়।
আমাদের এই পৃথিবীর তিনটি স্তর রয়েছে–ভূত্বক, ম্যান্টেল এবং কোর। এই স্তরগুলোকে আরও কয়েকটি উপ–স্তরে ভাগ করা যায়। ভূত্বক হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের কঠিন স্তর, যার নিচে রয়েছে পুরো ম্যান্টেল এবং কেন্দ্রে রেয়েছে গলিত ও কঠিন পদার্থে গঠিত কোর।
পৃথিবীর উপরের স্তর বা ভূত্বক কয়েকটি বড় বড় প্লেট বা বৃহৎ শিলাখন্ডে বিভক্ত, যা ভূগর্ভের তরল পদার্থের ওপর ভাসমান ও ক্রামাগত চলাচল করছে। প্লেটগুলোকে ‘টেকটোনিক’ প্লেট বলা হয়। টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংযোগস্থলকে ‘ফল্ট লাইন’ বলা হয়। যখন এই প্লেটগুলো একে অপরের কাছাকাছি আসে বা ধাক্কা খায় বা একটি অপরটির নীচে চলে যায়, তখন ফল্ট লাইনগুলিতে প্রচন্ড চাপ ও শক্তি জমা হয়। এই সঞ্চিত শক্তি যখন শিলাগুলির সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন শিলাগুলি হঠাৎ ভেঙ্গে যায় এবং এই শক্তি একটি কম্পন তরঙ্গের মাধ্যমে নির্গত হয়, যা আমরা ভূমিকম্প হিসেবে অনুভব করি।
টেকটোনিক প্লেটগুলোর মধ্যে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ হচ্ছে না, তবে তারা প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার বেগে ক্রমাগত নড়াচড়া করছে এবং নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে একে অপরের সাথে সংঘর্ষ হচ্ছে। এসব প্লেটের কিনারাকে বলা হয় প্লেট বাউন্ডারি। প্লেট বাউন্ডারি অনেকগুলি ফল্ট(চ্যুতি) নিয়ে গঠিত। বিশ্বের বেশিরভাগ ভূমিকম্প এই চ্যুতিতেই ঘটে। বিশ্বে প্রধানত তিন ধরণের প্লেট বাউন্ডারি রয়েছে–অভিসারী, অপসারী এবং রূপান্তরিত। সাধারণত এসব বৃহৎ শিলাখন্ডগুলোর কিনারা রুক্ষ হয়, তাই এগুলি নড়াচড়া কালে অনেক সময় কিনারা পরস্পরের সঙ্গে আটকে যায়।
মূলত টেকটোনিক প্লেটগুলো ধীরে ধীরে একে অপরের সাপেক্ষে স্থান পরিবর্তন করে। যখন দুটি প্লেট একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে, তখন সংঘর্ষ হয়। তবে তারা পাশাপাশি সরে যেতে পারে অথবা একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যেতে পারে। প্লেটগুলো যখন একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়, তখন চাপ সৃষ্টি হয়।
যখন টেকটোনিক প্লেটগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করে, তখন তাদের পৃষ্ঠে ঘর্ষণ বল কাজ করে। এই ঘর্ষণ বল যদি শিলাখন্ডের ওপর প্রযুক্ত চাপকে প্রতিরোধ করতে না পারে, তবে শিলাখন্ড ভেঙ্গে যায় এবং একটি ফাটল বা ফল্ট তৈরি হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত চাপ ঘর্ষণ বলের চেয়ে কম থাকে, ততক্ষণ শিলাখন্ড একে অপরের সাথে লেগে থাকে এবং চাপ জমা হতে থাকে।
টেকটোনিক প্লেটগুলি মূলত কঠিন শিলার বিশালাকার স্ল্যাব যা, মহাদেশীয় ও মহাসগরীয় ‘লিথোস্ফিয়ার’ দিয়ে তৈরি। এর মধ্যে মহাদেশীয় লিথোস্ফিয়ারটি ‘সিয়াল’ এবং মহাসাগরীয় লিথোস্ফিয়ারটি ‘সিমা’ দিয়ে গঠিত। এই দুটি উপাদানের সংমিশ্রনে তৈরি হওয়া এই প্লেটগুলি পৃথিবীর উষ্ণ এবং পরিবর্তনশীল গুরুমন্ডলের উপর ভাসমান অবস্থায় থাকে। এই দুটি খনিজ উপাদান তুলনামূলকভাবে হালকা ও ঘন হয়।
উল্লেখ্য, মহাদেশীয় প্লেটগুলি প্রায় ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত মোটা হয় আর মহাসাগরীয় প্লেটগুলির পুরুত্ব হয় ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ভাসমান প্লেটগুলি মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় উভয় অংশেই ধারণ করে। এদের আকার কয়েকশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। পৃথিবীতে মোট সাতটি প্রধান টেকটোনিক প্লেট রয়েছে। এই প্লেটগুলো হলো–প্রশান্ত মহাসাগরীয়, উত্তর আমেরিকান, ইউরোপীয়, আফ্রিকান, অ্যান্টাকটিক, ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান এবং দক্ষিণ আমেরিকান প্লেট। এছাড়াও আরও অনেক ছোট ছোট প্লেট রয়েছে, যা প্রধান প্লেটগুলির তুলনায় অনেক ছোট। (চলবে)।
খায়রুল আকরাম খান
ব্যুরো চীফ : deshdorshon.com
Some text
ক্যাটাগরি: Uncategorized
