মঙ্গলবার সকাল ৭:০৯, ২১শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ. ৫ই জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
Advertisement

বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ বিতর্ক বিশ্লেষণ

জাকির মাহদিন

আমাদের লেখা, বক্তব্য-বিবৃতি ইত্যাদিগুলোয় আত্মসমালোচনা নেই। আত্মবিশ্লেষণ নেই। সমালোচনার আহ্বান নেই। সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা নেই। নিজেদের দায়-দায়িত্ব ও ভুল-ত্রুটির চুলচেরা বিশ্লেষণ নেই। ঠেকায় পড়ে বা স্বার্থে আঘাত পেয়ে নিজ-শ্রেণির সমালোচনা করলেও নিজের গভীর সমালোচনা নেই।

পথিকের মত-অমত-৫

‘বুদ্ধিজীবী’ ও ‘সুশীল সমাজ’ শ্রেণি দুটো দিন দিন চরমভাবে বিতর্কিত হচ্ছে। এমনকি এ দুটো শব্দ ও শ্রেণি নিয়ে স্বয়ং এদের মাঝেই তর্ক-বিতর্ক বহুদিনের পুরনো। কেউ কেউ এরইমধ্যে নিজেদের ‘বংশগত বিবর্তন’ নিয়েও মাথা ঘামিয়েছেন এবং ক্রমাগত ঘামিয়েই যাচ্ছেন, যা নোবেল প্রাইজের যোগ্য। যদিও সেই বিবর্তনের কোনো কূল-কিনারা করতে পারছেন না। ইদানিং সমাজ-রাষ্ট্র বহুমুখী সংকটে নিপতিত হওয়া সত্ত্বেও এ বিতর্ক না কমে বরং বাড়ছে। সুতরাং বলা যায়- নিত্য-নতুন সংকটের প্রতি মৌসুমেই এনাদের ঘিরে নতুন করে বিতর্ক ঘনীভূত হয়। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অবশ্য এ ‘কূল-কিনারাহীন’ বিতর্ক ও প্যাক-প্যাকগুলো যদি সুনির্দিষ্ট দুয়েকটি পয়েন্টে ঘনায়িত করা যায়, তবে অন্তত প্রাথমিক স্তরের একপ্রকার সমাধান আশা করা যাবে বলে আমার বিশ্বাস। শেষ কথাটি আবারও বলছি, সীমাহীন বিতর্কগুলো সুনির্দিষ্ট দুয়েকটি পয়েন্টে কেন্দ্রীভূত করতে হবে। সব বিষয় ও সব ইস্যু নিয়েই বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পাতলা পাতলা বিতর্ক কাম্য নয়, যদি সামান্যতম সমাধানও আমরা চাই। বরং সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ও সুনির্দিষ্ট বক্তব্যের যত গভীরে পৌঁছা যায় ততই ভালো। অবশ্য তার পরেও আরেকখানা মৌলিক শর্ত থাকে জনাব গোলাম হোসেন। সেটা হচ্ছে, সেই সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে বিতর্কগুলো হতে হবে দলীয় ও শ্রেণিগত অন্ধতামুক্ত। সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ এবং পারিবারিক স্বার্থমুক্ত।

আমাদের সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও সুশীলসমাজ তাদের ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ক্যাটাগরিতে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের আলোকে নিজেদের বিভিন্ন শ্রেণি-গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দায় এড়াতে চাইলেও সাধারণ মানুষের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। থাকার কথাও নয়। তাই যখন তাদের একশ্রেণি আরেক শ্রেণিকে, এক মতবাদী আরেক মতবাদীকে, এক দলের বুদ্ধিজীবী অন্য দলের বুদ্ধিজীবী বা সুশীলসমাজকে সহিংস সমালোচনা করেন, কাঠগড়ায় দাঁড় করান, তখন ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের সবার মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা সমানভাবে কমে, যা জাতীয় চিন্তার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী সংকট ও শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। তাই আমি মনে করি, এভাবে দলীয় সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে আক্রমণাত্মক ও সহিংস সমালোচনার আশ্রয় না নিয়ে বরং সামগ্রিক ও সমন্বয়ধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আরো গঠনমূলক ও যৌক্তিক আত্মসমালোচনা ও আত্মবিশ্লেষণে মনোনিবেশ করা উচিত।

বহুদিন আগে পড়েছিলাম- একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাতের লেখা ‘সুশীলসমাজের উদ্দেশ্যে একটি খোলাচিঠি’ এবং অন্য একটি দৈনিকে প্রকাশিত আওয়ামী-সমর্থিত বুদ্ধিজীবী মোনায়েম সরকারের লেখা ‘বাংলাদেশের সুশীলসমাজ ও বিদ্যুৎ বিতর্ক’ শিরোনামে দুটো ‘মহাগুরুত্বপূর্ণ’ কলাম। এ দুটো কলামই সরকার-সমর্থিত ও সরকারের সুবিধাভোগী দুজন বুদ্ধিজীবী কর্তৃক লেখা। সচেতন পাঠকমাত্রই জানবেন, কেন ও কী উদ্দেশ্যে, কাদের টার্গেট করে কী ধরনের সহিংস আক্রমণাত্মক ভাষা এনারা প্রয়োগ ও ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। এক্ষেত্রে এনারা এনাদের বিপরীত মতবাদ ও চিন্তাধারার বাইরের সবাইকে একসারিতে ফেলেই তুলোধূনো করে থাকেন। এটাই এনাদের চিরাচরিত অভ্যেস। যদিও বিরুদ্ধবাদী মতবাদের সবাইকে এক সারিতে ফেলে বিচারের কোনো যৌক্তিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা নেই। আবার সরকারি নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনামাত্রই অগ্রহণযোগ্য, অযৌক্তিক- এমনটাও ভাবার কোনো কারণ নেই।

অন্যদিকে কথিত সুশীলসমাজের মূল চিন্তা-দর্শন এবং অতীত ভূমিকা ও সময়ে সময়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র নিয়ে লেখা এ সমালোচনাগুলো একেবারেই যে ফেলনা তা কিন্তু নয়। যদিও তা সরকার-সমর্থিত কেউ করেন। সরকার-সমর্থিতদের বাইরের প্রচুর সচেতন মানুষও আমাদের ‘মহান বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী’ ও সুশীলসমাজের কঠোর সমালোচনা করেন। ঠিক এভাবে না হলেও অন্যভাবে। এদিকে ২০০৭ সালে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবীদের কড়া সমালোচনা করে লেখা একটি বই ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’। লিখেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান আবুল কাসেম ফজলুল হক। এতে তিনি কথিত বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের মুখোশ কিছুটা উন্মোচনের প্রয়াস পেয়েছেন।

‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’ নামক বইয়ের ১২নং পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, “আমাদের জীবনের, সমাজের, জাতির ও রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সমস্যাগুলোর আলোচনাই এ বইয়ের প্রবন্ধগুলোতে আছে। যদিও তা খুবই অপর্যাপ্ত এবং বিভিন্ন প্রবন্ধে বিক্ষিপ্ত। সহজ করে সুন্দর করে লিখতে পারি না। তার চেষ্টাও করি না। আমার লেখার উদ্দেশ্য কাজের প্রয়োজনে চিন্তা ও মত প্রকাশ করা, আনন্দ দেওয়া নয়।”

আসলে কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তাই দেখা যাচ্ছে, প্রতিপক্ষের তো অবশ্যই, এমনকি নিজ-শ্রেণির সমালোচনাও অনেকেই করেন, করছেন। হ্যাঁ, সমালোচনা হচ্ছে কমবেশি প্রায় সবাইকে নিয়ে, সব শ্রেণি-গোষ্ঠীকে নিয়ে। কিন্তু বাঙালির ভেতর দীর্ঘকাল ধরে বহমান প্রধান যে সমস্যা সেটি নিয়েই কোনো ‘বাতচিত’ নেই। কোনো আওয়াজ কিংবা ওয়াজ নেই। আমাদের লেখা, বক্তব্য-বিবৃতি ইত্যাদিগুলোয় আত্মসমালোচনা নেই। আত্মবিশ্লেষণ নেই। সমালোচনার আহ্বান নেই। সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা নেই। নিজেদের দায়-দায়িত্ব ও ভুল-ত্রুটির চুলচেরা বিশ্লেষণ নেই। ঠেকায় পড়ে বা স্বার্থে আঘাত পেয়ে নিজ-শ্রেণির সমালোচনা করলেও নিজের গভীর সমালোচনা নেই। কিংবা অন্যদের কেন্দ্র করে করা সমালোচনাগুলোয় নিজের সরব বা নীরব উপস্থিতি নেই।

মোটকথা, অন্য সবাই দোষী; ‘আমি’ এবং ক্ষেত্রবিশেষে ‘আমরা’ ছাড়া। হ্যাঁ, তা তো বটেই! আমি এবং আমরা দোষী, এই-এই ক্ষেত্রে এই-এই ভাবে দোষী- এটা উপলব্ধি ও স্বীকার করা সম্ভব হলে তো সংশোধনই হয়ে যেতাম এবং মহাভারত ‘শুদ্ধ’ই হয়ে যেতো! যুগ যুগ ধরে অশুদ্ধতার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হতো না। বাঙালির পক্ষে এটা কি সম্ভব? ঐতিহ্য বলে একটা কথা আছে না!

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের লেখা অনেকটাই ভদ্রজনোচিত ও  মার্জিত। অনেকটা রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত। যদিও আমি মনে করি, ব্যক্তিগতভাবে তিনিও প্রতিক্রিয়ামুক্ত নন। যা হোক, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’ নামক বইয়ের ১২নং পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, “আমাদের জীবনের, সমাজের, জাতির ও রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সমস্যাগুলোর আলোচনাই এ বইয়ের প্রবন্ধগুলোতে আছে। যদিও তা খুবই অপর্যাপ্ত এবং বিভিন্ন প্রবন্ধে বিক্ষিপ্ত। সহজ করে সুন্দর করে লিখতে পারি না। তার চেষ্টাও করি না। আমার লেখার উদ্দেশ্য কাজের প্রয়োজনে চিন্তা ও মত প্রকাশ করা, আনন্দ দেওয়া নয়।” লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে অপরিহার্য ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু কথা এবং গাইডলাইন উক্ত বইয়ের এ সামান্য কয়েক বাক্যেই আমরা পাই।

তিনি আমাকে একদিন বলেছিলেন জাতীয় দৈনিকে কলাম লিখতে। বর্তমান দৈনিকগুলোর ব্যবসায়িক ও সাম্প্রদায়িক নীতি এবং ‘শ্রেণি-চরিত্র’ আমরা সবাই জানি। তিনি নিজেও এর শিকার। তাছাড়া জাতীয় দৈনিকের কলাম প্রকৃতপক্ষে ক’জন পড়ে? পড়ার ও চিন্তা করার সময় এবং মানসিকতাই-বা ক’জনের আছে? মানুষ দৈনিক পত্রিকা কিনে খবর পড়তে, কলাম নয়। সাপ্তাহিকসহ বর্তমানের অন্যান্য কাগজগুলোও একই চরিত্রের। আর এখন তো অনলাইনের যুগ। শুধু হই-হুল্লুড় আর হা-হুতাশের যুগ। সে জন্যই গতানুতিক ও ‘মার্কামারা’ বিতর্ক-বিশ্লেষণে আমি জড়াতে চাই না। মূল সমস্যা বা জীবনের, সমাজের, জাতির ও রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সমস্যা নিয়েই পড়ে থাকতে চাই জীবনভর। নিজের সঙ্গে নিজের একটা গভীর সংযোগ পেতে চাই। গতানুগতিক সমালোচনা-বিতর্কে জড়ানো যতটা সহজ, বের হওয়া ততটাই কঠিন। চূড়ান্ত বিচারে এতে কোনো লাভও নেই।

ড. আবুল বারাকাত ও মোনায়েম সরকার যা লিখেছেন তা খুবই প্রাসঙ্গিক এবং ‘শ্রেণিবিশেষে’ মূল্যবান হলেও আমার দৃষ্টিতে তা কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় নয়। পত্র-পত্রিকায় আরও যেসব লেখা ও কলাম প্রতিদিন আসছে, ছাপা হচ্ছে, তা নিয়ে কড়া প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ আছে। সম্ভবত এই প্রশ্নগুলো না তুলে কেন্দ্রীয় আলোচনায় যাওয়া কঠিন। আবার এ জাতীয় প্রশ্ন তোলাও আমার মতো কারো জন্য যতটুকু না কঠিন, তারচেয়ে বেশি বেয়াদবী ও অহমিকার প্রকাশ।

আমরা দিনের পর দিন কার সমালোচনা করছি, কাদের উপদেশ দিচ্ছি? তারা কি আমাদের কথা আদৌ শোনেন? আমরা কি বেহায়া-বেলাজা নই? আমরা কি ‘আমার’ এবং ‘আমাদের’ সমালোচনা কিছুটা হলেও করতে পারি না? দেশ ও সমাজের আজকের এই বহুমুখী সংকটে দল-মত নির্বিশেষে সবার উপকারার্থে, যথার্থ ঐক্য, শান্তি ও সমঝোতার আহ্বান নিয়ে দেশের সমস্ত শিক্ষক-অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ, লেখক, শিল্পী-সাহিত্যিকের এক টেবিলে বসার প্রস্তাব বা প্রয়াস কি প্রলাপমাত্র?

আমি মনে করি, নোংরা রাজনীতির মতো এর কোনো পূর্ব ঘোষণা বা আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই। সময় ও ইস্যু নির্ধারণেরও প্রয়োজন নেই। জরুরি মুহূর্তে এসবের বালাই নেই। খাঁটি আন্তরিকতা নিয়ে আহ্বান এবং দলীয় স্বার্থমুক্ত যথার্থ পদ্ধতি অনুসরণ করলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবেই। সুতরাং একটি দেশের, একটি জাতির, একটি সমাজের পরস্পরবিরোধী মতবাদীদের সবার একসঙ্গে বসার কোনো বিকল্প নেই। বিতর্ক নয় বরং শ্রদ্ধার সঙ্গে খোলামনে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এ লেখাটি সাপ্তাহিক ‘সময়ের বিচিন্তা’র ৫ম সংখ্যায় (২৬ মার্চ ২০২২) ‘পথিকের মত-অমত’ নামের নিয়মিত কলামে প্রকাশিত হয়েছে।

জাকির মাহদিন: সাংবাদিক, কলামিস্ট

সম্পাদক: দেশ দর্শন

ক্যাটাগরি: ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞান,  প্রধান কলাম,  সম্পাদকীয়,  সম্পাদকের কলাম

ট্যাগ: জাকির মাহদিন,  পথিকের মত-অমত

Leave a Reply